মানুষ কেন আত্মহত্যার চিন্তা করে, কাদের ঝুঁকি বেশি

সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা সচেতনতা মাস। আজ ১০ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘চেঞ্জিং দ্য ন্যারেটিভ অন সুইসাইড’ (আত্মহত্যার বিষয়ে বয়ান পরিবর্তন)।

নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো চরম একটা সিদ্ধান্ত কেউ কোন পর্যায়ে নেন, সেটা বোঝাটা জরুরি
ছবি: পেক্সেলস

নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো চরম একটা সিদ্ধান্ত কেউ কোন পর্যায়ে নেন, সেটা বোঝাটা জরুরি। চলুন সেটা বোঝার জন্য আগে দুটি ঘটনা শোনা যাক।

ঘটনা ১

রাত্রি (ছদ্মনাম) তখন সদ্য মা হয়েছেন। যমজ সন্তান। দুই সন্তানের দেখভালের ঝক্কি সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন। সারা রাত নির্ঘুম। এক ফোঁটা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও যেন ছিল না।

কিছুই ভালো লাগত না। সারা দিন মনমরা হয়ে থাকতেন। অনেকেই বলতেন, এত ফুটফুটে দুটি সন্তান, তোমার কিসের কষ্ট? কষ্টটা কাউকে বোঝাতে পারতেন না। রাত্রির বারবার মনে হতো মরে গেলেই সব সমস্যার সমাধান। তখনই আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি।

তবে সিদ্ধান্তটা কাজে পরিণত করার আগে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়েছিলেন। সেখানেই জানতে পারলেন, পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশনে ভুগছেন তিনি। সন্তান জন্মের পর অনেক মা-ই এই সমস্যার ভেতর দিয়ে যান।

রাত্রির ক্ষেত্রে সমস্যাটি তীব্র আকার ধারণ করেছিল। বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়ে এখন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। সন্তানেরাও বেশ বড় হয়ে গেছে।

এ তো গেল নতুন মায়ের ডিপ্রেশনের কথা। অনেক সময় ছোট কোনো কথা বা কাজের কারণেও কেউ কেউ জীবন শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ঘটনা ২

১৯ বছরের সুমন রাগ হলে প্রায়ই নিজেকে আঘাত করেন, হাত কাটেন। মায়ের সঙ্গে রাগারাগি করে অনেকবার তিনি অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছেন, হাসপাতালে নিতে হয়েছে।

সুমনকে নিয়ে তাঁর পরিবার খুব বিরক্ত, তাঁরা মনে করেন, সুমন সবাইকে যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য এ রকম করেন। সবাই তাঁকে ‘অ্যাটেশন সিকার’ ডাকেন, হাসাহাসি করেন।

একপর্যায়ে সুমন ঠিক করেন, পরেরবার এমন কিছু করবেন যেন আর ফিরে আসতে না হয়। আসলে সুমনের ‘পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার’ আছে। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি এমনটা করেন।

কাউন্সেলিং, ওষুধ ও পরিবারের সহায়তায় সুমন এখন অনেকটা ভালো।

আরও পড়ুন

এটি কোনো ‘দুর্বলতা’ নয়

অনেকেই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন। তাঁদের কেউ হয়তো সম্পর্কের জটিলতায় ভুগছিলেন, কেউ–বা ছিলেন আর্থিক সংকটে। কেউ হয়তো সামাজিকভাবে চরম অপমানিত হয়েছিলেন মুহূর্তের কোনো ভুলে।

ভয়াবহ মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা মানুষটাকে কিন্তু মানসিকভাবে ‘দুর্বল’ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। চাপের মুখে একেক মানুষের প্রতিক্রিয়া একেক রকম হবে, এটাই স্বাভাবিক। পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব হলো মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাওয়া যেকোনো মানুষের পাশে থাকা।

চাই সচেতনতা, সহমর্মিতা

বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার কিছু ঘটনা নিয়ে হয়তো বেশ কিছুদিন আলোচনা হয়। পরে সবাই ভুলে যান, ওই মানুষটার অভাব কেবল তাঁর আপনজনেরাই অনুভব করেন।

তবে এ দেশে মানসিক স্বাস্থ্য চরম অবহেলিত একটি বিষয়। অনেকে খোঁজই রাখেন না, তাঁর আপনজন আদতে ভালো আছেন কি না। আশঙ্কাজনক লক্ষণ দেখা গেলেও মানসিক সংকটে থাকা মানুষটার খেয়াল রাখেন না। অথচ সহমর্মিতা, যত্ন আর সঠিক চিকিৎসা পেলে বহু জীবন বেঁচে যায়, সংকটে ভোগা মানুষটাও ভালো থাকেন।

কাদের ঝুঁকি বেশি

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। যাঁদের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের কারও কারও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে। কারও কারও পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাসও থাকে।

যেসব ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকি থাকতে পারে

  • তীব্র মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি ও ব্যক্তিত্বের সমস্যা আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

  • মানসিক, শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়াও আত্মহত্যার কারণ হতে পারে।

  • সদ্য মা হয়েছেন, এমন নারীদের মধ্যেও তীব্র বিষণ্নতা থেকে সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করার প্রবণতা দেখা যায় (এক্সটেন্ডেড সুইসাইড)।

  • প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল না পাওয়া, মা-বাবার বকাঝকার কারণে কমবয়সীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

  • কাঙ্ক্ষিত বস্তু (যেমন আইফোন বা মোটরসাইকেল) না পাওয়ার কারণেও আসতে পারে আত্মহত্যার চিন্তা।

এসব বিষয়ও খেয়াল রাখুন

যাঁরা আত্মহত্যা করেন, তাঁদের সবাই যে পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করেন, তা কিন্তু নয়। কেউ কেউ হুট করে ঝোঁকের মাথায় আত্মহত্যা করেন। বাংলাদেশে ঝোঁকের মাথায় আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি।

আত্মহত্যার চিন্তা কিছু আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।

  • নিজেকে বোঝা মনে করা কিংবা জীবন নিয়ে তীব্র হতাশা, ‘বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পাচ্ছি না’ জাতীয় কথাকে অবহেলা করবেন না।

  • কেউ কেউ সরাসরি আত্মহত্যার কথা বলেন। কেউ বলেন, ‘আমি আর পারছি না’, কেউ বলেন, ‘আমি না থাকলেই সবাই ভালো থাকত’।

  • কেউ অতিরিক্ত অপরাধবোধ প্রকাশ করেন, কেউ বলেন, তিনি নিজেকে ঘৃণা করেন।

  • বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও প্রিয় কাজ থেকে হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, প্রিয় জিনিস অন্যদের দিয়ে দেওয়া বা শেষবিদায়ের মতো বার্তা দেওয়া, ইন্টারনেটে ব্যথাহীন মৃত্যুর উপায় খোঁজাও আত্মহত্যার লক্ষণ হতে পারে।

  • মনমেজাজ বা আবেগের হুটহাট পরিবর্তন (মুড সুইং), ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে হঠাৎ বড় পরিবর্তন কিংবা বেপরোয়া আচরণও মানসিক অস্থিতিশীলতার লক্ষণ হতে পারে।

  • দীর্ঘদিনের মানসিক অশান্তির পর হঠাৎ অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যাওয়াটাও হতে পারে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত।

  • আগে আত্মহত্যার চেষ্টা কিংবা নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা (যেমন হাত কাটা, অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়া) থাকলে, সেটিকে ‘মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা’ ধরে নেওয়া যাবে না। অবহেলা করলে বিপদ হতে পারে।

আরও পড়ুন

করণীয়

  • ব্যক্তিগত জীবনে যাঁর যা কমতি, তা নিয়ে তাঁকে কথা শোনানোর প্রবণতা বর্জন করতে হবে।

  • আবেগপ্রবণ ব্যক্তি বা উঠতি বয়সীদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় সতর্ক থাকুন, যাতে তাঁদের মনে আঘাত না লাগে।

  • যে কারও মধ্যে আত্মহত্যার লক্ষণ বা নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা দেখা দিলে তাঁর সঙ্গে সহমর্মী আচরণ করুন। তাঁর কথা শুনুন।

  • মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন। নির্দেশনা অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও ওষুধের ব্যবস্থা করুন।

  • চিকিৎসক পরামর্শ দিলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি করা না গেলে বাসায় ২৪ ঘণ্টা নিবিড় নজরদারিতে রাখতে হবে।

  • ধারালো বস্তু, ওষুধ বা রাসায়নিক দ্রব্য সরিয়ে ফেলতে হবে এবং ঘর ও বাথরুমের লক অকেজো করে দিতে হবে।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য হেল্পলাইনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। সাহায্যের নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম বাড়ানো প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা একটি অপরাধ। বিষয়টাকে ‘ডিক্রিমিনালাইজ’ (অপরাধের তালিকার বাইরে) করা প্রয়োজন।

তবে এগুলো সবই রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পরিসরের কাজ। জীবন বাঁচাতে মূল কাজটা পরিবারকেই করতে হবে। শৈশব থেকেই জীবনের অনন্যতা, জীবনের মর্ম সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। বোঝাতে হবে, কোনো একটা ব্যর্থতা বা না পাওয়ার চেয়ে জীবন অনেক বড়। সমাজের তথাকথিত সাফল্য বা মর্যাদার দৌড়ে সন্তানকে ঠেলে দেবেন না।

এমন মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যাতে পরিবার বা সমাজে অসম্মানিত হওয়ার ভয়ে কেউ আত্মহত্যার পথে পা না বাড়ান।

(অনুলিখিত)

ডা. সিফাত ই সাইদ, সহকারী অধ্যাপক, মনোরোগ বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন