বিষণ্নতা ও উদ্বেগে ওষুধের মতোই কার্যকর হতে পারে ব্যায়াম, নতুন গবেষণায় প্রমাণ
ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিনে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শরীরচর্চা অনেক ক্ষেত্রে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে ওষুধ বা থেরাপির মতোই কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে দলগতভাবে এবং প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করা ব্যায়ামে উপকার সবচেয়ে বেশি।
বিষণ্নতা ও উদ্বেগ—এ দুই মানসিক সমস্যায় বিশ্বজুড়ে ভুগছেন কোটি কোটি মানুষ। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা, কর্মব্যস্ত জীবন, সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেকের মধ্যেই হতাশা ও দুশ্চিন্তা স্থায়ী রূপ নিচ্ছে।
চিকিৎসায় সাধারণত ওষুধ ও কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপির পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব কার্যকর হলেও সবার জন্য সহজলভ্য নয়। অনেকের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বেশি, কোথাও আবার দক্ষ থেরাপিস্টের দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয়ও অনেককে পিছিয়ে দেয়।
এ পরিস্থিতিতে আশার খবর হলো, নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত শরীরচর্চা অনেক ক্ষেত্রে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে ওষুধ বা থেরাপির মতোই কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে দলগতভাবে এবং প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করা ব্যায়ামে উপকার সবচেয়ে বেশি।
আগে যা জানা ছিল
অনেক দিন ধরেই বলা হয়, ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কে ‘ফিল গুড’ রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং চাপ কমায়। কিন্তু ঠিক কতটা ব্যায়াম দরকার, কোন ধরনের ব্যায়াম বেশি উপকারী, কার জন্য সবচেয়ে কার্যকর—এসব প্রশ্নে এত দিন স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল না।
গত দুই দশকে এ বিষয়ে অনেক গবেষণা ও পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়েছে। তবে সেসবের ফলাফল ছিল বিভিন্ন রকমের এবং কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর।
কী করা হয়েছে এই নতুন গবেষণায়
এই বিভ্রান্তি দূর করতে গবেষকেরা করেছেন এক বিশেষ ধরনের বিশ্লেষণ, যাকে বলা হয় মেটা-মেটা অ্যানালাইসিস। অর্থাৎ আগের সব বড় গবেষণার ফলাফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই বিশ্লেষণে যুক্ত হয়েছে—
৮১টি গবেষণা পর্যালোচনা
১ হাজারের বেশি আলাদা গবেষণা
প্রায় ৮০ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য
গবেষকেরা দেখেছেন—
বয়সভেদে ব্যায়ামের প্রভাব
কোন ধরনের ব্যায়াম বেশি কার্যকর
একা নাকি দলগত ব্যায়াম
প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধান আছে কি না
ব্যায়ামের সময় ও তীব্রতা
সব মিলিয়ে ব্যায়ামের প্রকৃত প্রভাব কতটা, তা নির্ভুলভাবে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
১. ব্যায়াম বিষণ্নতা ও উদ্বেগ—দুটিই কমায়
নিয়মিত ব্যায়ামে—
বিষণ্নতা কমে উল্লেখযোগ্য হারে
উদ্বেগ কমে মাঝারি মাত্রায়
অনেক ক্ষেত্রে এই সুফল ওষুধ ও থেরাপির সমান বা তার চেয়েও ভালো ফল দিয়েছে
২. কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হন
দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে ব্যায়ামের সুফল সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে—
১৮–৩০ বছর বয়সী তরুণ–তরুণী
সন্তান জন্ম দেওয়া পরবর্তী সময়ে নারীরা
বিশেষ করে নতুন মায়েদের ক্ষেত্রে সময়ের অভাব, ক্লান্তি, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ও উপযুক্ত সুযোগ না থাকার কারণে ব্যায়াম করা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ এ সময় মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
গবেষণাটি বলছে, এই নারীদের জন্য সহজলভ্য ও নিরাপদ ব্যায়াম কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে মানসিক স্বাস্থ্যের বড় উন্নতি সম্ভব।
কী ধরনের ব্যায়াম সবচেয়ে কার্যকর
অ্যারোবিক ব্যায়াম সবচেয়ে ভালো ফল দেয়
যেমন—
হাঁটা
দৌড়ানো
সাইকেল চালানো
সাঁতার
তবে এর মানে এই নয় যে অন্য ব্যায়াম উপকার করে না।
অন্যান্য উপকারী ব্যায়াম
ওয়েট লিফটিং বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম
যোগব্যায়াম ও ধ্যান
সব ধরনের ব্যায়ামই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখে
দলগত ও তত্ত্বাবধানে ব্যায়ামের গুরুত্ব
বিষণ্নতা কমাতে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া গেছে দলগত ব্যায়াম এবং প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ব্যায়ামে। যেমন—
জিম ক্লাস
দলগত হাঁটা বা দৌড়ানোর গ্রুপ
ইয়োগা বা ফিটনেস ক্লাব
দলগত পরিবেশ ও নির্দিষ্ট সময়সূচি মানুষকে নিয়মিত থাকতে উৎসাহ দেয়, একঘেয়েমি কমায় এবং মানসিকভাবে সংযুক্ত থাকার অনুভূতি তৈরি করে।
কত দিন ও কতবার ব্যায়াম করলে উপকার
বিষণ্নতার ক্ষেত্রে
সপ্তাহে এক–দুই দিন ব্যায়াম করলেও ভালো ফল পাওয়া গেছে
খুব বেশি সময় বা অতিরিক্ত কষ্টকর ব্যায়াম দরকার নেই
উদ্বেগের ক্ষেত্রে
সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া গেছে যখন টানা আট সপ্তাহ ব্যায়াম করা হয়েছে
হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা হয়েছে, যেমন ধীরে হাঁটা বা হালকা সাঁতার
তাহলে কি শুধু ব্যায়ামই যথেষ্ট
গবেষকেরা বলছেন, শুধু ‘আরও ব্যায়াম করুন’ বলা যথেষ্ট নয়। কারণ, বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগা মানুষদের অনেকেরই অনুপ্রেরণা ও মানসিক শক্তি কম থাকে। তাই প্রয়োজন কারও তত্ত্বাবধানে পরিকল্পিত দলগত এবং সহজে করা যায়, এমন ব্যায়াম।
চিকিৎসকেরাও যেন রোগীদের নির্দিষ্ট প্রোগ্রামে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন, শুধু সাধারণ উপদেশ নয়, এমনটাই গবেষণার সুপারিশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কী করা যেতে পারে
পাড়াভিত্তিক হাঁটাহাঁটির গ্রুপ
কমিউনিটি সেন্টারে যোগব্যায়াম ক্লাস
ছাদে বা পার্কে গ্রুপ ফিটনেস সেশন
নতুন মায়েদের জন্য বিশেষ ব্যায়াম কর্মসূচি
এসব উদ্যোগ মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে
শেষ কথা
যাঁরা ওষুধ নিতে চান না বা থেরাপি নিতে পারছেন না, তাঁদের জন্য নিয়ন্ত্রিত ও দলগত ব্যায়াম হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি।
তবে মনে রাখতে হবে—
মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে জরুরি। ব্যায়াম অনেক সময় চিকিৎসার অংশ হতে পারে, একমাত্র সমাধান নয়।
আপনার বা কাছের কারও মধ্যে দীর্ঘদিনের মন খারাপ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ঘুমের সমস্যা, আগ্রহ হারিয়ে ফেলা—এ ধরনের লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: দ্য কনভারসেশন