খেলা দেখলে মন ভালো হয়ে যায় কেন?
খেলাধুলা দেখা মানুষকে নানা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণে সুখী করতে পারে। মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। স্ট্রোক ও আলঝেইমার্স ডিজিজের ঝুঁকি কমাতে পারে; কতটা কমাতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চলমান। চলুন দেখে নেওয়া যাক, কেন খেলা দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২২ সালের কথা। ইংল্যান্ডের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট হেলেন কিয়েস তখন রাস্তায়। ফুটবল বিশ্বকাপের দর্শকের ভিড়ে জায়গাটা তখন রীতিমতো জনসমুদ্র। ওই ভিড়ের মধ্যে হেলেন এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সঙ্গে ফুটবলপ্রেমী বাবা ও ভাই।
হেলেন তখন তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এই খেলা বা এই আসরের মধ্যে এমন কী আছে, যা তোমাদের এত ভালো লাগে? খেলার উত্তেজনা? নাকি অন্য সমর্থকদের সঙ্গে থাকার অনুভূতি? নাকি একাত্মতার বোধ?’
তাঁর বাবা ও ভাই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একটু থমকে যান। তাঁরা বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা আগে কখনো ভেবে দেখেননি। ‘টাইম ম্যাগাজিন’কে হেলেন বলেন, ‘তখন ভাবলাম, বিষয়টি নিয়ে আমি সত্যিই গভীরভাবে ভাবতে চাই।’
সেই থেকে হেলেন খুঁজতে লাগলেন কিছু প্রশ্নের উত্তর। মানুষ খেলাধুলা দেখে আদতে কী পায়? আর তারপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ক্রীড়ামোদি হওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?
কিয়েস ও অন্যান্য গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে, মাঠে উপস্থিত থেকে বা টেলিভিশন ও পর্দায়—যেকোনোভাবে খেলাধুলা দেখা মানুষের সুস্থতা ও মানসিক কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এমনকি প্রিয় দল হারলেও সমর্থকেরা দলকে অনুসরণ করার সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে কিছু না কিছু ইতিবাচক উপকার পায়।
অর্থাৎ খেলাধুলা দেখার আনন্দ শুধু জয়-পরাজয়ের ওপর নির্ভর করে না। আবার খেলা দেখা নিছক আনন্দের বিষয় নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিজের শারীরিক ও মনসিক সুস্থতা, স্থিতিশীলতা, সামাজিক বন্ধন, একাত্মতার অনুভূতি এবং একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার অভিজ্ঞতা।
খেলাধুলা দেখা মানুষকে নানা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণে সুখী করতে পারে। মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। স্ট্রোক ও আলঝেইমারের ঝুঁকি কমাতে পারে, কতটা কমাতে পারে তা নিয়ে গবেষণা চলমান। চলুন দেখে নেওয়া যাক, কেন খেলা দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
১. অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি
আপনি যখন কোনো দলকে সমর্থন করেন, তখন একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে ওঠেন। দলের জয় উদ্যাপন করা বা পরাজয়ের হতাশা অন্য সমর্থকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া সামাজিক সংযোগ তৈরি করে; যা সুখের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
২. আবেগঘন উত্তেজনা
খেলাধুলার ফলাফল অনিশ্চিত। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, নাটকীয় প্রত্যাবর্তন কিংবা শেষ মুহূর্তের গোল দর্শকের মধ্যে উত্তেজনা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করে। এর ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যা আনন্দ ও পুরস্কারের অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক।
৩. অভিন্ন পরিচয়ের অনুভূতি
একজন সমর্থক তাঁদের প্রিয় দলকে নিজেরই একটি সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে দেখে। দল সফল হলে সমর্থকও আত্মমর্যাদা ও গর্বের অনুভূতি পায়।
৪. মানসিক চাপ থেকে মুক্তি ও সাময়িক অবকাশ
খেলাধুলা দৈনন্দিন উদ্বেগ ও চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। কয়েক ঘণ্টার জন্য মানুষের মনোযোগ কাজ, পড়াশোনা বা ব্যক্তিগত সমস্যার পরিবর্তে খেলার দিকে চলে যায়, যা শিথিল হতে এবং নতুন উদ্যমে জীবনের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে সাহায্য করে।
৫. অনুপ্রেরণা
ক্রীড়াবিদেরা প্রায়ই অধ্যবসায়, দলগত কাজ, শৃঙ্খলা এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার যে ক্ষমতা, তার উদাহরণ স্থাপন করেন। তাঁদের সংগ্রাম ও সাফল্য দেখা দর্শকের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। এতে মানসিকভাবে উজ্জীবিত থাকা সহজ হয়।
৬. সামাজিক বন্ধন
পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখা পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে। একসঙ্গে গোল উদ্যাপন করা কিংবা খেলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করার মতো অভিজ্ঞতাগুলো দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরি করে।
৭. গল্পের আনন্দ
খেলাধুলা নানা গল্পে ভরপুর—অপ্রত্যাশিত সাফল্যের কাহিনি, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এবং ঐতিহাসিক অর্জন। মানুষ স্বভাবতই গল্প ভালোবাসে। আর খেলাধুলা সেই গল্পগুলোর বাস্তব সংস্করণ উপহার দেয়।
শেষ কথা
গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার প্রিয় দলের জয় মস্তিষ্কের পুরস্কার-সংশ্লিষ্ট অংশগুলোকে সক্রিয় করতে পারে। মেজাজ ভালো করতে সাহায্য করে। অন্যদিকে পরাজয়ের বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে, তবে তা ক্ষতিকর নয়। এটাই জীবনের অংশ।
সূত্র: টাইম ম্যাগাজিন