আপনার অজান্তে রক্তচাপ বাড়ছে না তো

দিব্যি ঘুরছেন-ফিরছেন, কাজকর্মে কোনো অসুবিধা নেই, মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরাও নেই—এক কথায় সবই তো ঠিক আছে! অথচ রক্তচাপ হয়তো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি তা জানেনই না। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ঢাকার জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শরদিন্দু শেখর রায়

উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম বৈশিষ্ট্য—অনেক সময় এটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই বছরের পর বছর থাকতে পারে। রক্তচাপ বেড়ে গেলেই মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দেবে—এমন ধারণা ঠিক না।

অনেক সময় বাড়তি চাপের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয় শরীর। ফলে মানুষ নিজেকে সুস্থ মনে করলেও ভেতরে-ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়তে থাকে। দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর ক্রমাগত চাপ পড়ে।

সময়ের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও চোখের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বেড়ে যেতে পারে হৃদ্‌রোগ, হার্ট অ্যাটাক, মস্তিষ্কের স্ট্রোক ও কিডনির রোগের ঝুঁকি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ ছাড়াই এসব ক্ষতি শুরু হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা মস্তিষ্কের স্ট্রোক হওয়ার পর পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো ধরা পড়ে উচ্চ রক্তচাপ।

ঝুঁকিতে কারা বেশি

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে, তবে আজকাল তরুণ বয়সেও এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। যাদের পরিবারে উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস আছে, যারা অতিরিক্ত লবণ খান, শরীরচর্চা করেন না, ধূমপান করেন বা অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন—তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অতিরিক্ত ওজন এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও বাড়াতে পারে ঝুঁকি।

জানার উপায় একটাই—রক্তচাপ মাপা

নিয়মিত রক্তচাপ মাপাই শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ উপায়
মডেল: আককাস মাহমুদ। ছবি: প্রথম আলো

যেহেতু উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকে, তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপাই শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ উপায়। বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত।

বিশেষ করে ৩০ বছরের ওপরের ব্যক্তিদের এ বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাড়িতে সঠিক মানের ডিজিটাল রক্তচাপ মাপার যন্ত্র থাকলে নিয়মিত পরিমাপের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য যন্ত্র ব্যবহার এবং সঠিক পদ্ধতিতে রক্তচাপ মাপা জরুরি। একবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সঠিক পদ্ধতিতে আবার মাপতে হবে।

প্রয়োজন হলে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার পরিমাপ করতে হবে। রক্তচাপের মাত্রা ও ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করবেন।

নিয়ন্ত্রণে করণীয়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে
মডেল: আককাস মাহমুদ। ছবি: প্রথম আলো

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ফল ও শাকসবজি বেশি খাওয়া, ধূমপান পরিহার এবং পর্যাপ্ত ঘুম—এসব অভ্যাস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও খাবারে অতিরিক্ত লবণ পরিহার রক্তচাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাদের ওষুধ প্রয়োজন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এসেছে মনে হলেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। আমরা সাধারণত শরীর খারাপ হলেই চিকিৎসকের কথা ভাবি। কিন্তু কিছু সমস্যা কোনো অস্বস্তি ছাড়াই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে পারে। তাই রক্তচাপ বেশি কি না, তা নিশ্চিত হতে শুধু ‘আমি ভালো আছি’—এ কথা বললেই হবে না।

নিয়মিত রক্তচাপ মেপে দেখতে হবে। কারণ, উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অনুভূতি নয়, পরিমাপের অঙ্কটাই সত্য। তাই নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে—চুপচাপ রক্তচাপ বাড়ছে না তো? উত্তরটি জানতে খুব বেশি কিছু লাগে না। শুধু একটু সময় করে নিজের রক্তচাপটা মেপে দেখুন।

আরও পড়ুন