শিশুদের কি স্ট্রোক হতে পারে
রক্তপ্রবাহের সমস্যা ও অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। একেই বলে স্ট্রোক। মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহের এই সমস্যা দুইভাবে হতে পারে—রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়া অথবা রক্তনালি ছিঁড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তপাত হওয়া। স্ট্রোককে সাধারণত বড়দের রোগ বলে ধরা হয়। তবে শিশুরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রতি এক লাখ শিশুর মধ্যে প্রায় পাঁচজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হতে পারে। পেরিন্যাটাল পিরিয়ডেও শিশুর স্ট্রোক হতে পারে, যা কিনা হেমিপ্লেজিক সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ।
বড়দের তুলনায় শিশুদের স্ট্রোকের লক্ষণগুলো একটু আলাদা ও বৈচিত্র্যময়। এটি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তাই অনেক ক্ষেত্রেই শিশুটি যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছে, তা বুঝতে দেরি হয়ে যায়। তবে কিছু কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন—
একদিকে খিঁচুনি।
দুর্বলতা।
খেতে অসুবিধা।
শ্বাস আটকে যাওয়া।
কোনো এক পাশের হাত বেশি নাড়ানো, অন্য পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া।
শিশুর বিকাশে দেরি হওয়া।
মৃগী রোগ।
দেখতে সমস্যা।
বুদ্ধিগত সমস্যা।
ভাষাগত সমস্যা।
স্ট্রোকের কারণ
মোটাদাগে শিশুদের স্ট্রোক তিন কারণে হতে পারে—রক্তনালিতে সমস্যা, হৃৎপিণ্ডে সমস্যা অথবা রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা।
রক্তনালির সমস্যা: মস্তিষ্কের রক্তনালিতে জন্মগত ত্রুটি থাকলে শিশুরা স্ট্রোক করতে পারে। মস্তিষ্কের রক্তনালির সমস্যা জন্মগত হতে পারে, আবার পরেও তৈরি হতে পারে। যেমন রক্তনালি অস্বাভাবিক ফুলে গিয়ে অ্যানিউরিজম ছিঁড়ে যাওয়া, বিভিন্ন রক্তনালি অস্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া। ময়া ময়া রোগ থেকেও (মস্তিষ্কের রক্তনালি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাওয়া) শিশুর স্ট্রোক হতে পারে।
হৃৎপিণ্ডে সমস্যা: হৃৎপিণ্ডে জন্মগতভাবে ছিদ্র থাকলে বা ভাল্ভের সমস্যা থাকলে শিশুদের স্ট্রোক হতে পারে। হৃৎপিণ্ডে ত্রুটি থাকলে সেখান থেকে জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে গিয়ে রক্তনালি আটকে দেয়, যা স্ট্রোকের অন্যতম কারণ।
রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা: রক্ত জমাট বাঁধার জন্মগত সমস্যা থাকলে শিশুদের স্ট্রোক হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রক্তের ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার উপাদানের জন্মগত অভাব থাকলে রক্তপাত হয়েও স্ট্রোক হতে পারে, যেমন হিমোফিলিয়া রোগে এমনটা হয়।
শিশুদের স্ট্রোকের আরও বেশ কিছু কারণের মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ (মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস), বিভিন্ন নিউরোমেটাবলিক রোগ (হোমোসিস্টিনিউরিয়া, অর্গানিক অ্যাসিডেমিয়া, মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিজিজ) ও জেনেটিক বিভিন্ন কারণ।
শিশুর মধ্যে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাথার সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করাতে হবে। হৃৎপিণ্ডের যেকোনো জন্মগত ছিদ্র বা ভাল্ভের সমস্যা নির্ণয়ের জন্য ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম ও বুকের এক্স–রে পরীক্ষা করা যেতে পারে। রক্ত জমাট বাঁধার বিভিন্ন উপাদানের পরিমাণ পরীক্ষা করা, মেটাবলিক পরীক্ষা, মস্তিষ্কের এনজিওগ্রাম, এমনকি জেনেটিক পরীক্ষাও করা লাগতে পারে।
স্ট্রোকের চিকিৎসায় শুধু লক্ষণগুলো কমিয়ে আনা নয়; বরং ভবিষ্যতে যেন স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে, সেদিকেও নজর রাখা হয়। লক্ষণগুলো কমার জন্য ওষুধের পাশাপাশি ব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশনও লাগতে পারে। এ ছাড়া স্ট্রোক হয়ে গেলে এর কারণ খুঁজে বের করে চিকিৎসা করা জরুরি।