প্রকৌশলীরা এমবিএ করেন কেন
লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক খালেদ মাহমুদ। তিনি নিজেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের স্নাতক।
শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই প্রকৌশলীদের মধ্যে এমবিএ (মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) করার প্রবণতা বেড়েছে। প্রকৌশলগত জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবসায়িক দক্ষতার সমন্বয়—করপোরেট দুনিয়ায় এর একটা আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। একজন প্রকৌশলী সাধারণত কারিগরি দিকে দক্ষ হন। কিন্তু পেশাজীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে তাঁকে ‘প্রজেক্ট লিড’ বা ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতে হয়। এমবিএ করার মাধ্যমে একজন প্রকৌশলী দল পরিচালনা ও নেতৃত্বের কলাকৌশল রপ্ত করেন। এই ডিগ্রি তাঁকে একজন ‘সমস্যা সমাধানকারী’ থেকে ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী’ হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
কারিগরি ও ব্যবসায়িক জ্ঞানের সেতুবন্ধ
এমবিএ কিন্তু বিশেষায়িত কোনো জ্ঞান নয়। মাস্টার অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিগ্রিতে ব্যবসায় ও ব্যবস্থাপনার নানা বিষয় শেখানো হয়। প্রকৌশলীরা জানেন, একটি পণ্য কীভাবে তৈরি করতে হয় আর এমবিএ তাঁদের শেখায় সেই পণ্যটি কীভাবে লাভজনকভাবে বিক্রি করতে হয়। এই ডিগ্রি তাঁদের সাপ্লাই চেইন, পরিচালন ও ‘প্রজেক্ট ইকোনমিকস’ বুঝতে সাহায্য করে, যা পণ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে সহজ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ করার সুযোগ আছে। প্রকৌশলীরা সেখানে তাঁদের মেজর (মূল বিষয়) হিসেবে ফিন্যান্স, অপারেশনস, মার্কেটিংসহ নানা কিছু বেছে নিতে পারেন।
পেশা পরিবর্তন
অনেক প্রকৌশলী কয়েক বছর ল্যাব বা সাইটে কাজ করার পর সরাসরি ব্যবস্থাপনা, কনসালটিং ফার্ম (পরামর্শক প্রতিষ্ঠান) বা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো খাতে যেতে চান। এমবিএ ডিগ্রি তাঁদের এই পেশা পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করে দেয়। বড় বড় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকৌশলী-এমবিএ ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়। কারণ, ধরে নেওয়া হয় তাঁদের বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা বেশি।
প্রকৌশলবিদ্যা সাধারণত নির্দিষ্ট গাণিতিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চলে। কিন্তু ব্যবসায়িক পরিবেশ সব সময় অনিশ্চিত। এমবিএ প্রকৌশলীদের শেখায় কীভাবে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বড় ঝুঁকি নেওয়া যায় এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশল প্রণয়ন করা যায়।
নেটওয়ার্কিংয়ের বিশাল সুযোগ
একটি ভালো বিজনেস স্কুলে পড়তে আসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসেন। সেখানে ডাক্তার, আইনি বিশেষজ্ঞ বা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ ঘটে। এই বৈচিত্র্যময় নেটওয়ার্ক প্রকৌশলীদের এমন সব পেশাদার সুযোগ এনে দেয়, যা শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং কমিউনিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে পাওয়া সম্ভব নয়।
এখন কিন্তু বড় বড় প্রকৌশল–প্রকল্প মানেই কোটি টাকার বাজেট। এমবিএ পাঠ্যক্রমে ফিন্যান্স এবং অ্যাকাউন্টিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে প্রকৌশলীরা ক্যাশ ফ্লো, আরওআই (রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট) বা বাজেটিংয়ের মারপ্যাঁচ সহজে বুঝতে পারেন।
উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা
অনেক প্রকৌশলী নতুন কোনো উদ্ভাবন নিয়ে নিজস্ব স্টার্টআপ শুরু করতে চান। একটি পণ্য উদ্ভাবন করাই শেষ কথা নয়, সেটি বাজারজাত করা, বিনিয়োগকারী খুঁজে বের করা এবং কোম্পানি পরিচালনার জন্য ব্যবসায়িক জ্ঞান অপরিহার্য। এমবিএ তাঁদের একজন সফল উদ্যোক্তা হতে প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস জোগায়। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এমবিএ করার পর প্রকৌশলীদের বেতন বাড়ে। বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর বা চিফ টেকনোলজি অফিসার পদের জন্য প্রকৌশলগত দক্ষতার পাশাপাশি এমবিএ ডিগ্রি থাকা ভালো। বর্তমান যুগ হলো এআই, বিগ ডাটা ও অ্যানালিটিকসের। প্রকৌশলীরা সাধারণত গাণিতিক বিশ্লেষণে দক্ষ হন। এমবিএ করার মাধ্যমে তাঁরা এই দক্ষতাকে ব্যবসায়িক উপাত্তের (ডেটা) সঙ্গে যুক্ত করতে শেখেন।
যোগাযোগ দক্ষতা
প্রকৌশলীদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জটিল প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের বা বিনিয়োগকারীদের কাছে সহজভাবে উপস্থাপন করা। এমবিএ প্রোগ্রামে প্রেজেন্টেশন, নেগোসিয়েশন (দেনদরবার) এবং পারসুয়েসিভ রাইটিংয়ের (কাউকে রাজি করানো বা কারও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলার মতো করে লেখা) ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়। যখন একজন প্রকৌশলী প্রকৌশলের খটমট ভাষা ব্যবহার না করে ব্যবসার লাভ-ক্ষতির ভাষায় কথা বলতে শেখেন, তখন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। আধুনিক প্রকৌশল–প্রকল্পগুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন প্রকৌশলীকে হয়তো জার্মানির প্রযুক্তিতে, চীনের কাঁচামাল ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রকল্প পরিচালনা করতে হয়। এমবিএ পাঠ্যক্রমে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ‘ক্রস-কালচারাল ম্যানেজমেন্ট’ (ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে ব্যবস্থাপনা) পড়ানো হয়। এটি প্রকৌশলীদের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করার এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেয়।
প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন যেখানে
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের নবীন কর্মীদের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত প্রণেতা হিসেবে তৈরি করতে এমবিএর মতো ডিগ্রিকে গুরুত্ব দেয়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নবীন কর্মীদের এমবিএর জন্য বিশেষ বৃত্তি বা সুযোগেরও ব্যবস্থা করে।