সঞ্চয়পত্র নাকি ডাবল বেনিফিট স্কিম, কোনটা আপনার জন্য ভালো?
সঞ্চয় মানে শুধু টাকা জমানো নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা গড়ে তোলা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে লাভ বেশি? সঞ্চয়পত্র নাকি ডাবল বেনিফিট স্কিম? হিসাবটা একটু জটিল বটে। তবে সহজভাবে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক, যেন আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কোনটা আপনার জন্য ভালো।
ডাবল বেনিফিট স্কিম: কাগজে-কলমে আকর্ষণীয়
বিভিন্ন ব্যাংক বিভিন্ন মেয়াদে ডাবল বেনিফিট স্কিম করে। ধরা যাক, আপনার টিন সার্টিফিকেট নেই। আপনি ৫ লাখ টাকার ডাবল বেনিফিট স্কিম করবেন ৭ বছর ১১ মাসের জন্য। অর্থাৎ মেয়াদ শেষে আপনার টাকা দ্বিগুণ হয়ে ১০ লাখ টাকা হবে।
শুনতে বেশ লাভজনক মনে হচ্ছে, তাই না?
কিন্তু বাস্তব হিসাব একটু ভিন্ন। মেয়াদ শেষে আপনি যখন টাকা তুলতে যাবেন, তখন সোর্স ট্যাক্স ও এক্সাইজ ডিউটি বাবদ ৭৫ থেকে ৮০ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হবে। ফলে আপনার হাতে আসবে আনুমানিক ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ—
মোট প্রাপ্তি = ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা
প্রকৃত লাভ = ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা
এখন যদি এই অঙ্ককে ৫ বছরের হিসাবে রূপান্তর করা হয়, তাহলে তা আনুমানিক ৭ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে দাঁড়ায়। ৫ বছরে হিসাব করার কারণ হলো, এখানে সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৫ বছরে কত পার্থক্য দাঁড়ায়?
এখানে ৭ বছর ১১ মাস শেষে ট্যাক্স কাটার পর আপনার মোট প্রাপ্তি হবে প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। ব্যাংক আপনাকে যে হারে ডাবল বেনিফিট স্কিম দেবে, সেই একই সুদের হার ধরে ৫ বছরে হবে মূলধনসহ হবে প্রায় ৭ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। সেখান থেকে ট্যাক্স কাটার পর হাতে পাবেন প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
সঞ্চয়পত্র: নির্ভরযোগ্য মুনাফা ও নির্দিষ্ট রিটার্ন
সঞ্চয়পত্র সাধারণত চার ধরনের হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র একটি জনপ্রিয় ধরন, যার প্রকৃতি অনেকটা এফডিআরের মতো। অর্থাৎ এককালীন একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বিনিয়োগ করবেন এবং পাঁচ বছর শেষে মূলধনসহ মুনাফা পাবেন একসঙ্গে।
ধরা যাক, ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হলো। তাহলে ৫ বছর শেষে মোট প্রাপ্তি দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
তুলনা করলে দেখা যায়, ডাবল বেনিফিট স্কিমকে ৫ বছরের হিসাবে রূপান্তর করলে যে অঙ্ক পাওয়া যায়, তারচেয়ে সঞ্চয়পত্রে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেশি পাওয়া যেতে পারে।
তাহলে কোনটি বেছে নেবেন?
বিষয়টা এত সরল নয়। ডাবল বেনিফিট স্কিমের বড় সুবিধা হলো— যেকোনো সময় এটা নগদে রূপান্তর করে ফেলা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এর বিপরীতে ঋণ নেওয়া যায়।
অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে এসব সুবিধা সাধারণত পাওয়া যায় না। সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নিয়মকানুন তুলনামূলক কঠোর। সময়ের আগে ভাঙলে আর্থিক লাভ কম হয়।
অর্থাৎ, একটিতে বেশি রিটার্নের সম্ভাবনা, অন্যটিতে বেশি তারল্য।
সহজ ভাষায় বললে, একটি বিনিয়োগে লাভের হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে, কিন্তু টাকা নির্দিষ্ট সময়ের আগে তোলা কঠিন। অন্য বিনিয়োগে লাভ কম হলেও প্রয়োজন হলে দ্রুত নগদে রূপান্তর বা উত্তোলনের সুবিধা বেশি থাকে।
শেষ কথা
সঞ্চয়পত্র ভালো, নাকি ডাবল বেনিফিট স্কিম—এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। দুটিরই নিজস্ব সুবিধা আছে, আবার কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। আপনার প্রয়োজনটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ বিনিয়োগ চান, নাকি মাঝপথে টাকা তোলার সুবিধা আপনার কাছে বেশি জরুরি?
ঋণসুবিধা দরকার, নাকি সর্বোচ্চ রিটার্নই আপনার মূল লক্ষ্য? সবদিক বিবেচনা করে নিজের আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, বিনিয়োগ মানে শুধু লাভের অঙ্ক নয়, এটা আপনার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পরিকল্পনার অংশ।
সূত্র: অভ্যন্তরীণ সম্পদ অধিদপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়; জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর, ঢাকা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক