সুকুমার বড়ুয়া, তুমি চির অম্লান

সুকুমার বড়ুয়াকে ডাকা হতো ‘ছড়াসম্রাট’। ২ জানুয়ারি সকালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন চট্টগ্রামের রাউজানের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। ৮৮ বছরের জীবনে লিখেছেন হাজারো ছড়া। ছন্দ, বিষয় ও উপস্থাপনায় তাঁর অনেক ছড়াই অনন্য। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, একুশে পদক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য সম্মাননা, আলাওল শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ অনেক পদক আর মানুষের ভালোবাসা। তাঁর ১৮টি বইয়ের মধ্যে পাগলা ঘোড়া, ভিজে বেড়াল, চন্দনা রঞ্জনার ছড়া, এলোপাতাড়ি, নানা রঙের দিন, সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়াচিচিং ফাঁক উল্লেখযোগ্য। আজ ৫ জানুয়ারি সুকুমার বড়ুয়ার জন্মদিন, তাঁকে নিয়ে লিখেছেন প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন

সুকুমার বড়ুয়া (৫ জানুয়ারি ১৯৩৮—২ জানুয়ারি ২০২৬)
ছবি: সৌরভ দাশ

নতুন বছরের দ্বিতীয় দিনেই পেলাম বুকচেরা দুঃসংবাদটি—আমাদের শিশুসাহিত্যের শিরোমণি সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। চট্টগ্রামের রাউজানে তাঁর দেশের বাড়ির এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। খবরটা শোনার পর স্তব্ধ হয়ে যাই। চোখ দিয়ে অবিরাম পানি ঝরতে থাকে।

সেই ১৯৬৬ সালের মধ্যভাগ থেকে আমাদের পরিচয়; দৈনিক আজাদ পত্রিকার অফিসে। তখন ওই পত্রিকার ছোটদের আসর পরিচালনা করতেন কবি হাবীবুর রহমান, যিনি শিশুসাহিত্যিকদের কাছে ‘ভাইয়া’ নামেই পরিচিত ছিলেন।

সেই ভাইয়ার হাত দিয়েই দৈনিক সংবাদ-এর ‘খেলাঘর’ পাতায় সুকুমারের প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়। এর পর থেকে তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। প্রতিটি পত্রিকার ছোটদের আসরের পরিচালকেরা তাঁর লেখা ছেপেছেন। একসঙ্গে তাঁর পাঁচ-ছয়টি ছড়াও তাঁরা ছাপতেন। এতটাই মনোহর ছিল সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া।

তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাক–এর ‘কচি-কাঁচার আসর’ পাতার পরিচালক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই।

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার, সুকুমার বড়ুয়ার প্রথম বই পাগলা ঘোড়া যখন প্রকাশিত হয় (১৯৭০), তখন সমসাময়িক বেশির ভাগ শিশুসাহিত্যিকেরই কোনো বই প্রকাশিত হয়নি।

১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ছড়ার বই ভিজে বেড়াল। আর ওই দুটি বইয়ের জন্যই তিনি ১৯৭৭ সালে অর্জন করেন ‘বাংলা একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার’।

আমাদের দুজনের বয়সের ব্যবধান ছিল ৭ বছরের। তবু আমরা দুজন দুজনকে ‘তুমি’ বলেই সম্বোধন করতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগে চাকরি করতেন সুকুমার। অবসর নেন স্টোরকিপার পদে চাকরিজীবন শেষে। স্বল্প বেতনের চাকরি করলেও ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছেন উপযুক্ত বাবার মতোই। তাঁরা প্রত্যেকেই এখন উচ্চপদে চাকরি করেন।

যে কঠোর জীবনসংগ্রামের ভেতর দিয়ে সুকুমার বড়ুয়া সম্মানজনক আসনে আসীন হয়েছেন, তা গল্প-উপন্যাসের কাহিনির মতোই। কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে তাঁকে আক্ষেপ করতে শুনিনি কোনো দিন।

এক কথায় বলতে হবে, সদা হাস্যময় ছিলেন সুকুমার। সুযোগ পেলে নিজে যেমন হাসতেন, অন্যকেও হাসাতেন। তাঁর বেশির ভাগ লেখায় সেই ছাপ আছে বলেই তিনি সুকুমার বড়ুয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের অমর কারুশিল্পীদের একজন।

সুকুমার, দোস্ত, তুমি অনন্তলোকে পাড়ি জমালেও আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে কোথাও যেতে পারবে না। তুমি চির অম্লান। তুমি আমাদের কাছে মৃত্যুহীন।

আরও পড়ুন