জেন–জির নতুন জীবনদর্শন সফট লিভিং কী

বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মাহমুদ আলম (ছদ্মনাম)। কাজ সেরে বাড়ি ফেরেন অফিস ছুটির পরপরই। তবে কয়েক মাস আগেও রাত নয়টার আগে বাড়ি ফিরতেন না। আজকাল অফিসের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি। তাঁর মতে চিরাচরিত ‘হাসল কালচার’ বাদ দিয়ে বর্তমানকেও উপভোগ করতে হবে। অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি বা মানসিকতাকে পেছনে ফেলে চুপিসারেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে নতুন এক জীবনদর্শন ‘সফট লাইফ’ বা ‘সফট লিভিং’।

অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি বা মানসিকতাকে পেছনে ফেলে চুপিসারেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে নতুন এক জীবনদর্শন ‘সফট লাইফ’ বা ‘সফট লিভিং’ছবি: প্রথম আলো

এই প্রবণতা কোনো বিলাসী ট্রেন্ড নয়; বরং আধুনিক জীবনের দীর্ঘস্থায়ী চাপ, ক্লান্তি ও পারফরম্যান্স-নির্ভর সংস্কৃতির প্রতি এক সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া। জেন–জি এই জীবনধারাকে বেছে নিচ্ছে সচেতনভাবে, অনেকটা প্রয়োজনের তাগিদেই।

প্রজন্মগত দূরত্ব

অফিসের বাইরে ব্যক্তিগত জীবনকেই প্রাধান্য দিচ্ছে জেন–জি প্রজন্ম
ছবি: প্রথম আলো

জেন–জির পূর্ববর্তী প্রজন্মের জীবনযাপনে অতিরিক্ত কাজ, দীর্ঘ সময় অফিসে থাকা এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিসর্জন প্রায় স্বাভাবিক। আমরা সবাই আমাদের মা–বাবাকে দেখেছি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতির বিনিময়ে পেশাজীবনকে পরিবারের চেয়েও বেশি প্রাধান্য দিতে। এই চর্চা দীর্ঘদিন গ্রহণযোগ্যও ছিল। কিন্তু জেন–জি সেই বাস্তবতাকে দেখছে ভিন্ন চোখে। এই প্রজন্মের কাছে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততা মানেই মানসিক অবসাদ ও ব্যক্তিগত জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া।

সাফল্যের সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন

জেন–জি বিশ্রামকে দেখছে বরং উৎপাদনশীলতার পূর্বশর্ত হিসেবে
ছবি : সুমন ইউসুফ

‘সফট লাইফ’ ধারণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাফল্যের পুনর্নির্ধারণ। বাহ্যিক চাকচিক্য বা অর্জনের দেখনদারির বদলে মানসিক সুস্থতা, নিজের মতো সময় কাটানো এবং ব্যক্তিগত পরিসর—এসব উপাদান ক্রমেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সফট লাইফ শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; এর মধ্যে আছে এক সামাজিক বার্তাও।

বিশ্রামকে অলসতার সমার্থক ভাবার যে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি, সফট লাইফের ধারণা সেটিকে প্রত্যাখ্যান করছে। জেন–জি বিশ্রামকে দেখছে বরং উৎপাদনশীলতার পূর্বশর্ত হিসেবে।
বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ছুটি, ধীরগতির একটি দিন এবং কর্মোদ্যম পুনরুদ্ধারের জন্য কাটানো একান্ত ব্যাক্তিগত সময়—এসব এখন পরিকল্পিত জীবনেরই অংশ। এতে যে কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে, এমন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে কাজে টিকে থাকার সম্ভাবনাই বাড়ছে।

আরও পড়ুন

হাসল কালচারের অবসান

ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিজীবনের প্রকাশ যেন প্রায় বাধ্যতামূলক; কিন্তু সফট লাইফের ধারণায় সেই বাধ্যবাধকতা এখন আর নেই। জেন–জি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম দৃশ্যমানতায় গুরুত্ব দিচ্ছে।
সবকিছু দেখানোর প্রয়োজন নেই—এই উপলব্ধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আচরণেও পরিবর্তন আনছে। অতিরিক্ত কাজের বদলে কাজ করার উদ্দেশ্য, দৃশ্যমানতার বদলে ভারসাম্য গুরুত্ব পাচ্ছে।

সম্পর্কের কাঠামোয় নতুন মাত্রা

সফট লাইফ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে
মডেল: অরিত্র আহসান ও তোড়া বিশ্বাস। ছবি: কবির হোসেন

সফট লাইফ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। নাটকীয়তা বা ইমোশনাল অস্থিরতাকে আর আকর্ষণীয় মনে করা হচ্ছে না; বরং স্পষ্ট যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সম্মান—এসবই সম্পর্কে কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তন পরিবার, প্রেম, বন্ধুত্ব কিংবা পেশাগত সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে সম্পর্কগুলো আগের চেয়ে সহজ হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

শেষ কথা

সফট লাইফ মূলত একধরনের মানসিক পুনর্বিন্যাস, যেখানে জীবনকে শুধু টিকিয়ে রাখার লড়াই হিসেবে না দেখে বসবাসযোগ্য, মানবিক ও আরামদায়ক করে তোলার চেষ্টা করা হয়। আর জেন–জি এই অভ্যাস ভালোই রপ্ত করছে।
এই প্রবণতা স্থায়ী হবে কি না, তা হয়তো এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে এটি স্পষ্ট যে জেন–জি এমন এক জীবনধারায় অভ্যস্ত হচ্ছে, যা কেবল কাজ ও কাজের ফলই নয়, বয়ে আনবে মানসিক শান্তি ও বেঁচে থাকার আনন্দও।


সূত্র: মিডিয়াম

আরও পড়ুন