‘মেসির সঙ্গে ছবি? নাহ, তুলব না’

স্পেনের ১০ নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামেন দানি অলমো। পড়ুন প্লেয়ারস ট্রিবিউনে প্রকাশিত তাঁর একটি লেখার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।

স্পেনের ১০ নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামেন দানি অলমোছবি: এএফপি

একদম ছোটবেলার স্মৃতি যতখানি মনে পড়ে, সবটাই ফুটবল ঘিরে। ফুটবল যেন আমার পায়ের সঙ্গে লেগেই থাকত, আঠার মতো! সারাক্ষণ খেলতে চাইতাম। এমনকি বল কোলে নিয়েই ঘুমাতাম। বারান্দায় ছোট ছোট দুটি গোলপোস্ট বসিয়ে দিয়েছিলেন মা-বাবা। সেখানে আমি আর আমার ভাই কার্লোস খেলতাম। বয়স তখন দুই কি আড়াই। আমাকে দুই পোস্টের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে ধুমাধুম বলে লাথি মারত কার্লোস!

আমার কাছে খেলার চেয়ে বড় আর কিছু ছিল না। জানি সব ফুটবলারই এই কথা বলে। কিন্তু আমার বেলায় কথাটা কতখানি সত্য, একটা উদাহরণ দিই। লা মাসিয়াতে (বার্সেলোনার ইয়ুথ একাডেমি) যোগ দেওয়ার আগের কথা। কাস্তেলদাফেলসের একটা ম্যাচে বাবা ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছিলেন, আমি তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলাম। বয়স তখন ৮। মনের আনন্দে একটা বল নিয়ে খেলছিলাম। হঠাৎ বাবার এক বন্ধু এসে বললেন, ‘দানি, জলদি এসো! কী ঘটতে যাচ্ছে, তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না! লিওনেল মেসির সঙ্গে তোমার ছবি তোলা হবে!’

ভাবতে পারেন! মেসি! তা-ও কাস্তেলদাফেলসের মতো জায়গায়! ছবি তুলতে কে না চাইবে!

আরও পড়ুন

কিন্তু আমার প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘মেসির সঙ্গে ছবি? নাহ, তুলব না। দেখছ না, আমি খেলছি।’

ইচ্ছের বিরুদ্ধেই আমাকে মেসির পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল। মেসিকে একটা কথাও বলিনি। শুধু ক্যামেরার ‘ক্লিক’ শব্দটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। শব্দটা হতেই একছুটে চলে গিয়েছি বলের কাছে। ভাবটা এমন, যেন আমিই মেসির বিরাট উপকার করলাম!

সেই ছবি আজও আমার বাড়িতে ফ্রেমে বাঁধাই করা আছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, আমার খেলার মহামূল্যবান সময় কেউ এসে নষ্ট না করুক, হোক সে কোনো মহাতারকা। বুঝতেই পারছেন, ফুটবলকে কতটা ভালোবাসতাম! এমনকি মেসিও আমার মনোযোগ সরাতে পারেনি। দুঃখিত, লিও!

দানি ওলমো
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

শুধু খেলতে চাইতাম

মেসির সঙ্গে দেখা করে আপ্লুত হইনি। হয়েছি সেদিন, যেদিন লা মাসিয়ায় যোগ দিলাম। কেঁদেই ফেলেছিলাম।

লা মাসিয়ার দিনগুলো নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। ক্লাবটা সব সময়ই হৃদয়ে একটা বিশেষ জায়গা জুড়ে থাকবে। পুরো ফুটবল–বিশ্বের কাছেই লা মাসিয়া অনুকরণীয়। কত কিংবদন্তি এই ক্লাব থেকে বেরিয়েছেন, ফুটবল বিদ্যা রপ্ত করেছেন।

তবে চাপও ছিল। সত্যিকারের চাপ। কেননা আপনি জানেন, সব সময় কেউ না কেউ আপনার ওপর নজর রাখছে। প্রতিদিন ভাবতাম, যেকোনো দিনই এখানে আমার শেষ দিন হতে পারে।

বার্সেলোনায় দারুণ কিছু টুর্নামেন্টে খেলেছি। অসাধারণ কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেক কিছু শিখেছি। এমনকি একবার ক্যাম্প ন্যুতেও একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই মাঠ, যে মাঠ আমাদের কাছে একটা পবিত্র ভূমি, একটা স্বপ্ন!

তাহলে সাতটি বছর কাটানোর পর কেন আমি এই অবিশ্বাস্য জায়গাটা ছেড়ে চলে গেলাম? সত্যি বলতে আমার একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা প্রজেক্টের প্রয়োজন ছিল। আমি মানুষটাই এমন—শুধু খেলতে চাইতাম। আমার চাওয়া ছিল ওই বলটা।

প্রথম দিকে বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ বিশ্বাসই করতে পারেনি যে সত্যি সত্যি আমি চলে যাচ্ছি। বার্সেলোনা ছেড়ে কেউ ক্রোয়েশিয়ায় যায় না। কেউই না। কিন্তু আমি গিয়েছিলাম। বাবা যখন আমাকে প্রস্তাবটার কথা জানালেন, সঙ্গে সঙ্গেই বললাম, ‘যাব।’ ব্যস, এইটুকুই। সহজ হিসাব।

আরও পড়ুন

আহা, ফুটবল

ক্রোয়েশিয়া সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তবে এটুকু বুঝতাম, বার্সায় থাকলে হয়তো সিস্টেমের মারপ্যাঁচে আমি হারিয়েই যাব; আর দশজন সাধারণ খেলোয়াড়ের মতো হয়ে থাকব, যেখানে মূল দলে পা রাখার কোনো পরিষ্কার রাস্তা নেই। বার্সার মূল দলে জায়গা করে নেওয়াটা আদতেই বড্ড কঠিন।

আমার কাছে সবচেয়ে আলাদা হয়ে থাকবে ডার্বির (ক্রোয়েশিয়ার একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ) একটি ম্যাচ। তখন বয়স মাত্র ১৯। চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরেছি, তাই দলে নিয়মিত খেলা হচ্ছিল না। কখনো সুযোগ পাচ্ছিলাম, কখনো বাদ পড়ছিলাম।

ওই সপ্তাহের মাঝামাঝি আমাদের একটা ইউরোপীয় ম্যাচ ছিল। কোচ আমাকে ফর্মে ফেরার একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি নেমেই লাল কার্ড খেয়ে বসলাম! স্বাভাবিকভাবেই, ডার্বি ম্যাচের দিন শুরুতে আমাকে আবার সাইড বেঞ্চে বসতে হলো। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের ফলাফল যখন আমাদের পক্ষে, ১-০, বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে আমাকে মাঠে নামালেন কোচ।

এটাই ছিল আমার সুযোগ।

চারপাশ উত্তাল। মাঠে যখন পা রাখলাম, মনে হলো চোখের সামনে পুরো জীবন এক পলকে ভেসে উঠল! মাঠে নামার কয়েক মিনিটের মাথায় প্রতিপক্ষ গোল করে সমতা ফিরিয়ে আনল। ফলাফল তখন ১-১। মনে আবেগের ঝড় বইছিল। এত বড় ম্যাচে কোচ আমার ওপর ভরসা করেছেন, এই ভরসার প্রতিদান আমাকে দিতেই হবে।

আমার তখন শুধু পায়ে বলটা দরকার। ৭৮তম মিনিটে সেই মুহূর্তটা এল। আমাদের চিলিয়ান উইঙ্গার জুনিয়র ফার্নান্দেজ ওয়ান-টু পাসে খেলবে বলে এগোচ্ছিল, কিন্তু ডি-বক্সের ঠিক বাইরে ডিফেন্ডাররা তাঁকে আটকে দিল। তখনই বলটা এল আমার কাছে, ফাঁকা জায়গায়, গোলপোস্ট থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে।

একদম জোরালো আর মাটিঘেঁষা একটা শট মারলাম। গোলরক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু পোস্টের একদম কোনা দিয়ে যাওয়া বলটার ধারেকাছে পৌঁছানোর সাধ্য তাঁর ছিল না। নিখুঁত শট, ভীষণ সুন্দর! পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ল। আমিও। সতীর্থরা যখন আমাকে ঘিরে উদ্‌যাপন করছে, বারবার শুধু একটা কথাই বলছিলাম, ‘কে এরমোসো এস এল ফুতবল!’

ফুটবল কতই না সুন্দর!