কমেডি দিয়ে নিজের কষ্ট বা ভয়কে আড়াল করা আমার ছোটবেলার অভ্যাস
মার্কিন অভিনেত্রী ডাকোটা জনসনকে এ বছর বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ মানুষের একজনের স্বীকৃতি দিয়েছে টাইম সাময়িকী। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সব সময়ই তিনি সরব। ২০২৩ সালে বিষণ্নতা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য ডাকোটাকে ‘হোপ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়েছিল হোপ ফর ডিপ্রেশন রিসার্চ ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানে এক বক্তৃতায় মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলেছিলেন এই অভিনেত্রী। পড়ুন তাঁর বক্তৃতার নির্বাচিত অংশ।
বাহ! ‘সেরা বিষণ্ন ব্যক্তি’ হিসেবে এই পুরস্কার পেয়ে সত্যিই সম্মানিত বোধ করছি। ওহ, এটা সেই পুরস্কার নয়? যাক বাবা, বাঁচা গেল! (হাসি)
‘ডিপ্রেশন টাস্কফোর্সের’ বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ। আমার মনে হয় এটা দারুণ একটা উদ্যোগ। বিষণ্নতা দূর করার জন্য একটা ‘টাস্কফোর্স’ আছে, এটা জেনেই তো অনেকে একটু হালকা বোধ করবে। অন্তত আমি তো করবই। খারাপ দিনগুলোতে হয়তো এটা ভাবতে ভালো লাগবে যে আমি একটা বোতাম চাপব, আর সাদা ‘কেইপ’ পরা একদল বিজ্ঞানী জাদুর মতো নিরাময়ক্ষমতা নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াবেন।
বিষণ্নতা সম্পর্কে আমি সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি পেয়েছি, তা হলো সবকিছুর তাৎক্ষণিক সমাধান বা নিরাময় নেই। এই সত্যটা মেনে নিয়েই জীবনে একধরনের মাধুর্য খুঁজে নিতে হয়।
যখন জানলাম যে এই ফাউন্ডেশন আমাকে পুরস্কার দিতে চায়, দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম, আমি যে বিষণ্নতায় ভুগছি, সেটা ওরা জানল কী করে! এরপর ভাবলাম, বিষণ্নতা নিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজটা কি আমি পারব? আমাকে কি বক্তৃতা দিতে হবে? এসব চিন্তা করতে করতেই একসময় টের পেলাম খুব ঘাম হচ্ছে, দম নিতে পারছি না…এই হলো অবস্থা!
আমি তখন ফাউন্ডেশনকে পাগলের মতো ই–মেইল করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী নিয়ে কথা বলব?’ তারা আমাকে আমারই নানা কথা জোগাড় করে পাঠাল, যেগুলো ২০১৫ সাল থেকে বলে আসছি। চোখ বুলিয়ে দেখলাম, বাহ, আমি তো মানসিক স্বাস্থ্যের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছি আরও আগে থেকেই। আমার বলা ছোট কোনো আশার কথা কিংবা আমার সঙ্গে অভিজ্ঞতার মিল যদি অন্য কাউকে একটু ভালো বোধ করতে সাহায্য করে বা কেউ যদি একটু কম একাকী বোধ করে, তাহলে খুব আগ্রহ নিয়েই এই দায়িত্ব পালন করব।
বুঝতেই পারছেন, বেশির ভাগ সময় বিষণ্নতা বা উদ্বেগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমি নিজেকে নিয়ে মজা করি। হয়তো কমেডির মুখোশ পরলে বিষয়টা সামাল দেওয়া আমার জন্য সহজ হয়। কমেডি দিয়ে নিজের কষ্ট বা ভয়কে আড়াল করা আমার ছোটবেলার অভ্যাস। আমি মনে করি না এটা খারাপ কিছু। অন্তত আমাকে এটা বেশ সাহায্য করে।
খুব ছোটবেলায়ই আমার থেরাপির অভিজ্ঞতা হয়েছিল। মা-বাবা দুজনই বেশ বিখ্যাত ছিলেন। আমি যখন ছোট, তখন তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। তাঁরা বেশ বুদ্ধিমানের মতো বুঝতে পেরেছিলেন যে বাইরের কেউ হয়তো আমার পারিবারিক জীবনের জটিলতাগুলো বুঝতে আমাকে সাহায্য করতে পারবে। বড় হওয়ার পথে নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। নিজেকে ও অন্যকে গভীরভাবে বোঝার প্রতি আমার একধরনের ঝোঁক ও কৌতূহল তৈরি হয়েছিল।
বিনোদনজগতে কোনো কিছুই ব্যক্তিগত থাকে না। কিন্তু আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনকে খুব পবিত্র মনে করি। আমার ভয় হচ্ছে যে এই বক্তৃতাটা ইন্টারনেটে চলে যাবে। খবরের শিরোনাম হবে—‘ডাকোটা জনসন বিষণ্নতা নিয়ে মুখ খুললেন’ কিংবা ‘নীরবতা ভাঙলেন’। যদি এমনটা হয়, আমি মেনে নেব। শুধু আশা করব, আমার পরের কথাগুলো প্রচারেও তারা যেন আমাকে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কিছু কিছু অভ্যাস আমাকে সাহায্য করে। হয়তো এটা কারও না কারও কাজে আসতে পারে—
ধ্যান: আমি প্রতিদিন ধ্যান করি, এটা বারবার আমার জীবন বদলে দেয়।
থেরাপি: আমি ভাগ্যবান যে এমন একজন থেরাপিস্ট পেয়েছি, জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো যিনি আমাকে দিয়েছেন। সম্ভব হলে আমি তাঁর নাম শরীরে ট্যাটু করে রাখতাম (হাসি)।
বই পড়া: যেমন দ্য বডি কিপস দ্য স্কোর।
লেখালেখি: মনের মতো করে লেখালেখি করা এবং আধ্যাত্মিকতার মাঝে সময় কাটানো।
প্রকৃতি: প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা, পৃথিবীর অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা।
উদ্বেগ বা বিষণ্নতাকে কলঙ্ক মনে করার প্রবণতা দূর করা জরুরি। মানুষ হিসেবে আমরা এখন অনেক সংকটে আছি। একে অপরকে আলাদা করে রাখার সময় এখন নয়। আমরা যে মস্তিষ্ক বা মনের গঠন নিয়ে জন্মেছি বা জীবনে যেসব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছি—সব মিলিয়ে বিশ্বের বর্তমান অবস্থায় প্রতিদিন সকালে মনে হয় বুকটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। খুব অসহায় লাগে। আমরা যে একে অপরকে ধ্বংস করছি, সেটা কি এখনো বুঝতে পারছি না? ইতিহাসজুড়ে যে ঘৃণা আর ধ্বংস দেখি, সেটা কি যথেষ্ট নয়?
আমরা যদি একে অপরকে বোঝাতে পারি যে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া অপরিহার্য, তাহলেই হয়তো নিজেকে ভালোবাসা বা নিজের প্রতি দয়া দেখানো জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। আর সেই ভালোবাসা ও মমতা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। তখন এই পৃথিবীটাও আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।