বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যে ৩ পরামর্শ দিয়েছেন অ্যাপলের হবু সিইও

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জন টার্নাস। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের (পেন ইঞ্জিনিয়ারিং) সমাবর্তনে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি। পড়ুন নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।

অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জন টার্নাসছবি: এএফপি

সিনিয়র থাকাকালীন আমি পেনের প্রথম ও সে সময়ের একমাত্র সিএনসি মিলিং মেশিনটা প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিলাম। তারপরও যে আমাকে আবার আপনারা ক্যাম্পাসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। পুরো গল্পটা আজ আর বলছি না। শুধু এটুকু বলি, সেই বছরের বাকিটা সময় সবাই আমাকে ‘ক্র্যাশ’ বলে ডাকত।

স্নাতকেরা, অভিনন্দন। আজ একটা অসাধারণ দিন। এই দিনটি আরও বিশেষ, কারণ একটা অভাবনীয় পথ পাড়ি দিয়ে তোমরা এখানে পৌঁছেছ। কয়েক বছর আগের কথা ভাবো, মহামারির কারণে সারা বিশ্ব ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। একজন হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েট হিসেবে তোমরা জানতে না, তোমাদের কলেজজীবন কেমন হবে। আর এখন ভাবো, সেই সময়ের পর থেকে তোমরা কী কী অর্জন করেছ। আজ তোমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের গ্র্যাজুয়েট। তোমরা পেরেছ বলেই তোমরা আজ এখানে! সামনের পথটা আরও রোমাঞ্চকর, কারণ এবার তোমরা বাইরে বেরোবে, নিজের পরিচয় গড়বে। ভবিষ্যৎকে নিজের মতো করে সাজাবে। এই যাত্রায় তোমাদের সাহায্য করার জন্য আমার কিছু পরামর্শ আছে।

প্রথম পরামর্শ

প্রথমত, নিজের কাজের পেছনে তুমি কতখানি যত্নবান, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপলে আমার প্রথম প্রজেক্ট ছিল ‘সিনেমা ডিসপ্লে’। সহজ করে বললে—একটা বড় ডেস্কটপ মনিটর। এর ওপরে স্ক্রু দিয়ে একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আবরণ লাগানো ছিল। স্টেইনলেস স্টিলের স্ক্রুগুলোর মাথায় এমনভাবে খাঁজ কাটা যে আলো পড়লে সেগুলো সিডির মতো ঝলমল করত (যদি কেউ সিডি না চিনে থাকো, পরে মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিয়ো)।

আরও পড়ুন

চাকরির প্রথম বছরে একবার এক সরবরাহকারীর কারখানায় গিয়েছিলাম। জায়গাটা আমার বাড়ি থেকে অনেক দূর। তখন প্রায় মধ্যরাত। আতশকাচ দিয়ে স্ক্রুর মাথার খাঁজগুলো গুনছিলাম। মনে করিয়ে দিই, স্ক্রুগুলো মনিটরের পেছনে থাকে। আমি সরবরাহকারীর সঙ্গে তর্ক করছিলাম, কারণ তারা ৩৫টি খাঁজ দিয়েছিল, যেখানে থাকার কথা ২৫টি। সেই মাঝরাতে মুহূর্তের জন্য আমার মাথায় এল, আমি আসলে করছি কী! এটা কি স্বাভাবিক? একসময় বুঝলাম এটা হয়তো স্বাভাবিক নয়, কিন্তু এটাই সঠিক। কারণ, আমি এই পণ্যটির পেছনে কয়েক মাস সময় ব্যয় করেছি। আর যদি কোনো কিছুর পেছনে এত সময় আপনি দেন, তবে সেখানে আপনার সেরাটাই দেওয়া উচিত।

হয়তো কোনো গ্রাহক এটা খেয়াল করবেন, হয়তো করবেন না। কিন্তু যখনই আমি কারও ডেস্কে ওই মনিটরগুলো দেখতাম, আমার মনে হতো যে আমি ও আমার দল এর প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে ভেবেছি। আমাদের সেরাটা দিয়েছি। কাজের পেছনে নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দেওয়া কঠিন। মনের ওপর চাপ পড়ে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। কিন্তু এটা সার্থক। কারণ, আমাদের সময় সীমিত। তোমরা হয়তো জীবনে শত শত প্রজেক্ট করবে। কেউ হয়তো মাত্র একটি বা দুটি বড় প্রজেক্ট করবে। কিন্তু যখন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার সময় আসবে, তখন ফেলে আসা এই দিনগুলোর দিকে তাকিয়েই তোমার সবচেয়ে বেশি গর্ব হবে।

দ্বিতীয় পরামর্শ

সব সময় মনে করবে তুমি ঘরের বাকি সবার মতোই বুদ্ধিমান। কিন্তু কখনো এটা মনে আনবে না যে তুমি তাঁদের চেয়ে বেশি জানো। এই মানসিকতা তোমাকে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস দেবে, আবার প্রশ্ন করার ও শেখার নম্রতাও দেবে।

অ্যাপল ছিল আমার দ্বিতীয় চাকরি। প্রথম যখন সেখানে পা রাখি, বেশ ভয় পাচ্ছিলাম। নিশ্চিত ছিলাম না যে আমি ঠিক যোগ্য কি না। কারণ, ওখানকার সবাইকে ভীষণ বুদ্ধিমান, আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হতো। ভাগ্যিস, আর যা-ই হোক, সাহায্য চাইতে কখনো ভয় পাইনি। তাঁরাও গভীর মমতার সঙ্গে শুধু যে আমার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন তা নয়, লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথও দেখিয়েছেন।

শিক্ষাজীবন শেষেই শেখা থেমে যায় না। আগে যেমনটা বলেছিলাম, শুরুতে আমি প্লাস্টিক নিয়ে কাজ করে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর পর আমাদের ডিজাইন টিম অ্যালুমিনিয়াম পছন্দ করতে শুরু করল। এরপর আর কখনো প্লাস্টিক নিয়ে কাজ করিনি। আমি কি সেই দক্ষতা অর্জনের জন্য আফসোস করি? একদম না। কারণ, প্রতিটি অভিজ্ঞতা সমস্যাকে ভিন্ন কোণ থেকে দেখতে শেখায়, জীবনে নতুন কিছু করার আত্মবিশ্বাস দেয়।

আরও পড়ুন

তৃতীয় পরামর্শ

এমন কিছু তৈরি করো, যা তোমাকে আগ্রহী করে, যা তোমাকে আনন্দ দেয়। তবে সবচেয়ে বড় কথা, সেটি যেন তোমার মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। অ্যাপলে আমরা আমাদের মূল্যবোধ বজায় রেখে কাজ করার চেষ্টা করি। আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো পরিবেশ রক্ষা। ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা আমাদের পুরো সাপ্লাই চেইনকে ‘কার্বন নিউট্রাল’ করার লক্ষ্য নিয়েছি। এটা হতে যাচ্ছে আমাদের ক্যারিয়ারের অন্যতম কঠিন ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ।

ক্যারিয়ারে যা-ই করো না কেন, এমন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করো, যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। এমন প্রকৌশলী হও যেন দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসার পথ খুলে যায়। এমন প্রযুক্তি তৈরি করো, যা বিশ্বের প্রতিটি কোনায় বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে যায়। এমন এআই মডেল বানাও, যা আমাদের সবাইকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।

প্রকৌশলী হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তোমরা তোমাদের চারপাশের পৃথিবীকে বদলে দিতে পারো। মানুষের হাতে এমন সব সমাধান পৌঁছে দিতে পারো, যা আগে কখনো ছিল না। তোমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়বে। এটি যেমন একটা বড় সুযোগ, তেমনি বিশাল দায়িত্বও। স্টিভ জবস যেমনটা বলেছিলেন, ‘মহাবিশ্বে তোমার একটা দাগ রেখে যেয়ো।’