শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অমিল আছে

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে তিনটি বিষয়—শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি, জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জন এবং কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী ভাবছেন? তাঁদের দৃষ্টিতে কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত?

শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সামঞ্জস্য তৈরি করা দরকারছবি: প্রথম আলো

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না

তুরজাউন ইমামীম
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

তুরজাউন ইমামীম, প্রথম বর্ষ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আমাকে হতাশ করে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষা ও শিক্ষা প্রশাসনে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আমি মনে করি, তিনটি বিষয়ে এখনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষা প্রশাসন ও ক্যাম্পাস সংস্কৃতি নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে ছাত্র সংসদ—সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। একটি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে জ্ঞানচর্চা ও রাজনীতি হওয়া উচিত মুক্ত ও নিরপেক্ষ; কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। স্বাধীন চিন্তার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। অযোগ্য ব্যক্তিরা যখন রাজনৈতিক প্রভাবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক কিংবা উচ্চশিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব পান, তখন নতুন প্রজন্মের মেধাবিকাশও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি। একটি দেশের জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশে এই বরাদ্দ সাধারণত ২ শতাংশের কম। গবেষণা খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ইউরোপের অনেক দেশ যেখানে জিডিপির ২-৩ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করে, সেখানে বাংলাদেশে সংখ্যাটা দশমিক ৩ শতাংশের কাছাকাছি। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে আধুনিক ল্যাব, গবেষণা সরঞ্জাম ও উদ্ভাবনী পরিবেশ গড়ে ওঠে না। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে মেধা পাচারের ঝুঁকি তৈরি করছে।

তৃতীয়ত, শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সামঞ্জস্য তৈরি করা। বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের অমিল আছে। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে ‘স্কিল গ্যাপ’ তৈরি হচ্ছে। করপোরেট খাতে কাজের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সে অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। ইন্টার্নশিপ, প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষা, সফট স্কিল উন্নয়নের ওপর পাঠ্যক্রমে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন।

শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় অসমতা আছে

আসেফ আব্দুল্লাহ
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আসেফ আব্দুল্লাহ, ডিপার্টমেন্ট অব জাপানিজ স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছি। আমার স্নাতক সমাজবিজ্ঞানে। সহজ কথায় বললে, বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানের পুরো পড়াশোনাই মুখস্থনির্ভর। এই মুখস্থনির্ভর গতানুগতিক পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে আরও চিন্তাভিত্তিক শিক্ষায় প্রবেশ করা দরকার। সে ক্ষেত্রে প্রথমত আমি মনে করি, শিক্ষাকে দক্ষতা ও চিন্তাভিত্তিক করতে হবে। গ্রুপ ওয়ার্ক, প্রজেক্ট স্টাডি, ফিল্ড ট্রিপ এবং বাস্তব জীবনসম্মত কোর্স ডিজাইন করলে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো রিসার্চ বা গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনা। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য মোটামুটি ব্যয় করা হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় একদমই পিছিয়ে। স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনার কিছুটা সুযোগ থাকলেও স্নাতক পর্যন্ত তা নেই বললেই চলে। গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ সহজ করে। কেননা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কারিকুলামগুলো প্রায় সবই গবেষণাধর্মী।

শিক্ষাক্ষেত্রে আরেকটি বড় রকম অসুবিধা হলো অসমতা। ২০২৬ সালে এসেও শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের অসমতা বা বৈষম্য রয়েছে। ঢাকার ধানমন্ডিতে বসে একজন শিক্ষার্থী এমন এক পরিবেশে পড়ালেখা করে, যেখানে আছে দ্রুতগতির ইন্টারনেট। হাতের কাছেই সে হয়তো সব বই পেয়ে যাচ্ছে। আছে ডিজিটাল লার্নিংয়ের সুবিধা, ভালো শিক্ষক। অথচ গ্রামে বসে একজন শিক্ষার্থী ভালো লাইব্রেরি তো দূরের কথা, উন্নত ইন্টারনেটও পাচ্ছে না। শিক্ষকদের দক্ষ করে গড়ে তোলার মতো কোনো প্রশিক্ষণব্যবস্থা নেই। এসব বৈষম্য দূর করতে হবে।

আরও পড়ুন