প্রলোভনের কথাটা শুনে কিঞ্চিৎ খটকা লেগেছিল। হেঁয়ালি স্পষ্ট করেছিলেন সামছুর ভাই। সন্ধ্যা হব হব। আর একটু পরই জোয়ারের পানি নামবে সরসর করে। শুরু হবে দক্ষিণ থেকে উত্তরপানে সরলরেখায় ইলিশের দৌড়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে জাল টেনে–গুটিয়ে নৌকায় তোলার সময়ও তখন। সেই জালের ফাঁসে আটকে থাকে ইলিশ। এরা সেই জাত, অহংকার ও দেমাগ যাদের নমনীয় হতে শেখায়নি। অন্যদের মতো এঁকেবেঁকে জলকেলি করতে করতে চলা এদের ধাতে নেই। অনমনীয় ও টান টান বলে সোজাসুজি সাঁতরায়। তিরবেগে। কথায় আছে, ‘ঝড়ের চেয়েও বেগবতী, ডিমভরা ইলিশের গতি।’ একবগ্গা সেই দৌড়ই তাদের কাল হয়। জালের প্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে মুণ্ডু আটকে পড়ে থাকে।

default-image

তীক্ষ্ণ চোখে টলটলে সুগন্ধার জল মাপতে মাপতে আধো আঁধারে সামছুর মিয়া বলেছিলেন, আর কোনো মাছের জন্য এত কসরত করতে হয় না। এত প্রতীক্ষাও নয়। আর বলেছিলেন, ইলিশই একমাত্র মাছ, যার নোলা নেই। নেই বলেই তার জন্য চারের টোপ দরকার পড়ে না।

ইলিশ নিয়ে বাঙালির এই বিহ্বলতা কত কালের, কে জানে। এত কাব্যিও আর কোনো মাছ নিয়ে হয়েছে কি না, সন্দেহ। কিংবা এত আকচা–আকছি। এত গবেষণা, ইলিশের বংশ ও কুল রক্ষার এমন প্রাণান্ত প্রচেষ্টাও পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কোনো মাছের জন্য হয়তো হয়নি। টুনা নিয়ে জাপানের গর্ব যতটা, দুশ্চিন্তাও ততই। তবু তা ম্লান লাগে ইলিশ নিয়ে বাঙালির আবেগের কাছে। যেন ইলিশের থাকা না থাকার ওপর নির্ভর করে রয়েছে বাঙালিত্বের টিকে থাকার প্রশ্ন।

যদিও সেখানেও ভাগাভাগি। কিন্তু সে কাহিনিতে ঢোকার আগে কীর্তনখোলার নাসিমুলের আরজিটুকু না শোনালে নিজেকে অপরাধী মনে করব।

default-image

আমি হলফ করে বলতে পারি, সরকারের ফরমান অমান্য করে নিষিদ্ধ সময়ে ধন–মান–প্রাণের ঝুঁকি এবং আট বছরের ছেলেকে নিয়ে কীর্তনখোলায় ইলশে নাওয়ে যিনি ঘাপটি মেরে পড়ে ছিলেন, তাঁর আসল নাম অবশ্যই নাসিমুল ছিল না। পটু হাতে তিনি জাল গোটাচ্ছিলেন, অপটু হাত দিয়ে জাল থেকে ইলিশ ছাড়িয়ে ডিঙির গর্ভে রাখছিল তাঁর ছেলে। এমন একটা সময় আচমকা আমাদের উদয়, যখন জাল ও ডিঙি ছেড়ে পালানোর জো তাঁদের ছিল না। জেরার মুখে নিজেকে নাসিমুল বলে পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। খানিক পর যখন বুঝলেন পুলিশ বা রাজনৈতিক মাতবর, কোনোটাই নই, তখন একটু ধাতস্থ হয়ে নাসিমুল তাঁর আরজিটুকু পেশ করেছিলেন। বলেছিলেন, ইলিশ ধরার হ্যাপা অনেক। সরকারের বিধিনিষেধও বিস্তর। নিষেধাজ্ঞার মাসগুলোয় সরকার শুধু চাল দেয়। তা দিয়ে সংসার চালানো বড় দায়। সরকার যদি চালের সঙ্গে মাসে হাজার দুয়েক টাকা দেয়, তাহলে আল্লাহর কসম করে বলতে পারি, অসময়ে এমন অপকম্ম করতে ডিঙি ভাসাবেন না ইলিশ ধরা কোনো জেলে।

নাসিমুলের চোখমুখে ক্লান্তি আর বিষণ্নতা। কে জানে কেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন, দুটি তাজা ইলিশ কিনতে চাই কি না। দুপাশে ঘাড় নাড়া দেখে চোখ নিচু করে নিজের মনেই বলেছিলেন, কে আর সাধ করে ঝুঁকি নিতে চায় বলেন তো? পুলিশের হাতে ধরা পড়লে সব শেষ। পুলিশের গারদেও থাকতে হতে পারে। পেটের দায় বড় দায়।

নাসিমুল সম্ভবত বোঝেননি আমি ভিনদেশি বাঙালি। কিংবা কথার টানে বুঝতে পারলেও আমাকে বুঝতে দেননি। সেই কোনকালে ইলিশের প্রেমে পড়ে এখনো নাকানিচোবানি খেয়ে চলেছি, সে সত্য তাঁর জানার কথাও নয়। তবু তাঁর সরল বিশ্বাসের অমর্যাদা আমি হতে দিইনি। বরিশাল ঘুরে ঢাকায় ফিরে বসুন্ধরা খুঁজে খুঁজে হাজির হয়েছি বাংলাদেশে ইলিশ বিপ্লবের অন্যতম হোতা অধ্যাপক আবদুল ওয়াহাবের গৃহে। তাঁদের তৈরি পরিকল্পনা মেনে বাংলাদেশ আজ ইলিশ উৎপাদনে পৃথিবীকে টেক্কা দিয়েছে। বছরে অন্তত সাড়ে পাঁচ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন করে পড়শি দেশের বাঙালিদের লজ্জায় অধোবদন করে রেখেছে। ইলিশের জন্য আজ আমরা আক্ষরিক অর্থে বাংলাদেশের কৃপাপ্রার্থী। দুর্গাপূজার আগে কবে সরকারিভাবে ইলিশ রপ্তানির কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করবেন, সেই আশায় ফি বছর আমরা দিন গুনি। অধ্যাপক ওয়াহাবদের গর্ব আমাদের লজ্জা।

তাঁর বাসায় বসে অধ্যাপক ওয়াহাবকে বলেছিলাম, আপনাদের বিজ্ঞানভিত্তিক চেতনা, নিবিড় গবেষণা, দৃঢ়সংকল্প, নীতি রূপায়ণে কঠোরতা এবং সরকারি ভাবনাকে গণ–আন্দোলনের রূপ দেওয়ার ফল আমরা ওপারের বাঙালিরাও ভোগ করছি। বলেছি, ইলিশকে আপনারা ভালোবেসেছেন বলেই আজ এত সফল। ওই ভালোবাসা আমরা এখনো দিতে শিখিনি। তাই ব্যর্থ। ইলিশ নিয়ে আপনারা যত গর্বিত, তত গর্ববোধ আমরা করতে পারিনি। আপনাদের মতো ইলিশপ্রেমীও এখনো হতে পারিনি। তাই প্রতিবছর বর্ষায় পুবপানে আপনাদের দিকে তাকিয়ে তীর্থের কাকের মতো আমরা হাপিত্যেশ বসে থাকি। আপনাদের দাক্ষিণ্যভোগী হয়ে রয়েছি আমরা। আমাদেরই দোষে।

default-image

সেদিন চলে আসার আগে আবদুল ওয়াহাবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁদের ইলিশ সংরক্ষণ নীতি কতখানি সফল? খানিক চুপ থেকে উনি বলেছিলেন, খুব বেশি হলে ৬৫–৭০ শতাংশ। নাসিমুলের আরজিটুকু তখনই পেশ করি। বলেছিলাম, ইলিশ ধরা জেলেদের চাহিদা, সরকার চালের সঙ্গে কিঞ্চিৎ আর্থিক প্রণোদনার বন্দোবস্ত করুক। তাহলে সাফল্যের হার আরও ১০–১৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। অনুগ্রহ করে এই সুপারিশ যথাযোগ্য স্থানে পেশ করবেন। আমিও মনের দিক থেকে স্বস্তি পাব।

ইলিশ নিয়ে বাঙালির বিহ্বলতা, কাব্যি, আবেশ এবং ঘটি–বাঙালের অন্তহীন আকচা–আকছি আর কোনো দেশে কোনো জনজাতির মধ্যে সম্ভবত নেই। ইলিশের মতো এমন কোনো মাছ আর কোনো জাতির জনজীবনে এতখানি গুরুত্বও কখনো পেয়েছে কি না, জানি না। বর্ষার শুরু থেকে শেষ, ইলিশ নিয়ে বাঙালির আদিখ্যেতাও অবর্ণনীয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের। বাজারে ইলিশ উঠলে বাঙালি অন্য মাছের দিকে ফিরেও তাকাতে রাজি নয়। ঢাকার কারওয়ান বাজারে ঘুরে ঘুরে দেখেছি, ইলিশের মৌসুমে অন্য সব মাছ, তা সে যত স্বাদু ও লোভনীয় হোক না, যেন দুয়োরানির সন্তান। তেরছা চোখেও গৃহস্থ তাদের পানে তাকাতে প্রস্তুত নয়। অধ্যাপক ওয়াহাবরা এই মানসিকতা নিয়ে চিন্তিতও। না হলে বলতেন না, ছয় লাখ টনের মতো ইলিশ উৎপাদিত হলে রপ্তানি না করে উপায় নেই। কেননা অত জোগানে দেশে ইলিশের দাম কমে যাবে। কারবারিদের ক্ষতি হবে। বাঙালির অত্যধিক ইলিশপ্রেম অন্য প্রজাতির মাছও ক্রমে ধ্বংস করে দেবে। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে পরিবেশের বারোটা বাজবে।

বাংলাদেশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের হাল এখন ‘ঘটি ডোবে না নামেই তালপুকুর’–এর মতো। ইলিশের জন্য পশ্চিমের বাঙালির নোলা সদাই চুকচুক করে, কিন্তু গঙ্গা, রূপনারায়ণপুরে মাথা কুটেও ইলিশের দেখা মেলে না। পশ্চিমবঙ্গে ইলিশের জোগান যতটুকু, তা হয় দিঘার সমুদ্র নয়তো ডায়মন্ড হারবারের মোহানার দান। তার স্বাদ প্রাচীন ও প্রবীণদের স্মৃতিভারে জর্জরিত করে। চুরাশি বছর আগে বুদ্ধদেব বসু ‘কলকাতার বিবর্ণ সকালে ঘরে–ঘরে ইলিশ ভাজার গন্ধ’ ও ‘সরস শর্ষের ঝাঁজে’ বর্ষার সঙ্গে ‘ইলিশ উৎসব’–এর যে অনবদ্য যুগলবন্দী সৃষ্টি করেছেন, আজ তা পুব বাংলার কৃপার ওপর নির্ভর করে জেগে রয়েছে। এই দৈন্যের মধ্যে গঙ্গা ও পদ্মার ইলিশের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও কাজিয়া এখন তাই কেমন যেন নিদারুণ ঠাট্টা ও অবিশ্বাস্য কৌতুক মনে হয়!

যদিও অর্ধশতাব্দী আগেও তা মনে হতো না। গঙ্গা না পদ্মা—কোথাকার ইলিশ রূপে, গুণে ও স্বাদে শ্রেষ্ঠ; অহরহ চলত তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। ঘটি–বাঙালি যখন বড় মুখ করে বলত, দু শ বছর কোম্পানির তেল খেয়েছে বলে গঙ্গার ইলিশের স্বাদ অতুলনীয়, তখন বাঙাল–বাঙালি মুচকি হেসে জবাব দিত, ও কথা কইয়েন না, কইয়েন না। এটা হইল হেই কথা যে লেনিন–মার্ক্সবাদ বুঝতেন না। তর্ক ও ইলিশপ্রিয় ঘটি–বাঙালের এই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের মধ্যে আরও এক চাপান–উতোর ইলিশ রান্নার কায়দা ঘিরে। পশ্চিমবঙ্গে ঘটি বা বাঙাল কোনো গৃহেই ইলিশ মাছে পেঁয়াজ–রসুন ও আলু–আদার রেওয়াজ নেই। যুক্তিটা মোক্ষম। পেঁয়াজ–রসুন ইলিশের নিজস্ব চমৎকার গন্ধ কেড়ে তার অনন্য বিশেষত্বের বারোটা বাজিয়ে দেয়। বাংলাদেশে আবার ইলিশে পেঁয়াজ–রসুনের চল মারাত্মক। মাংসের বিরিয়ানির পাশে ইলিশের সহাবস্থানও সেখানে লক্ষণীয়। সৈয়দ মুজতবা আলী এসব মানতে পারতেন না। ইলিশের চেয়ে মাংসের বিরিয়ানি কাছে টানার ‘অপরাধে’ এক অধ্যাপকের সঙ্গে একটা সময় তাঁর এক সপ্তাহ বাক্য বিনিময় বন্ধ ছিল। মুজতবা আলীর কথা, দাওয়াতে ইলিশ থাকলে সেটাই হবে এক ও অদ্বিতীয়। দাওয়াত হতে হবে ইলিশময়। মাংস নৈব নৈব চ।

পাওয়া যাক না যাক, পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ নিয়ে পাগলামি এখনো প্রবল মোহনবাগান–ইস্ট বেঙ্গল দুই ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে। মোহনবাগান চিংড়ি, ইস্ট বেঙ্গল ইলিশ। ফুটবলপ্রিয় বাঙালির রেষারেষি ঘিরে এই দুই প্রিয় মাছ কবে থেকে কীভাবে বঙ্গজীবনে স্থান করে নিল, তার তেমন কোনো সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আমার চোখে পড়েনি। তবে জন্ম ইস্তক দেখছি, মোহনবাগান জিতলে বাজারে চিংড়ির দাম বেড়ে যায়, ইস্ট বেঙ্গল জিতলে ইলিশ। আবার ফুটবল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই বিভাজিত বাঙালি যখন গঙ্গা–পদ্মার ইলিশের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিচার করতে বসে, তখন তাদের দেখেছি একজোট হয়ে গঙ্গার কোলে ঝোল টানতে! অধ্যাপক ওয়াহাবের কাছে সেই কথা একবার পেড়েও ছিলাম। উত্তরে তিনি তিনটি কথা বলেছিলেন। প্রথমত, সমুদ্রের নোনাপানি থেকে নদীর মিষ্টিপানিতে এসে ডিম ছেড়ে ইলিশ আবার ফিরে যায় সমুদ্রে। মিঠাপানিতে যত অবগাহন করে, ততই ধুয়ে যায় তার শরীরের লবণ। তাতে মাছের স্বাদ বাড়ে। গঙ্গায় যে ইলিশ ধরা পড়ে, তা সমুদ্র থেকে কত দূর সাঁতরায়? বড় জোর ৫০–৬০ কিলোমিটার। আর পদ্মায় যেগুলো ধরা পড়ছে, তাকে সাঁতরাতে হয় দ্বিগুণ বেশি দূরত্ব। ইলিশের এই উজান বাওয়ায় তার ওজনে বাড়ে, স্বাদও খোলে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ঢোকার পর গঙ্গার নাম হয়েছে পদ্মা। নদীটা কিন্তু এক। এই নদীতে ‘ডায়াকম’ নামে এক শেওলা জন্মায়। সেই শেওলা ইলিশের অতি প্রিয় খাদ্য। আশ্চর্য, ডায়াকম কিন্তু মেঘনা বা অন্য নদীতে জন্মায় না। পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার তুলনায় বাংলাদেশের পদ্মা আড়ে–বহরে, দৈর্ঘ্যে–প্রস্থে বেশি। ফলে ডায়াকমের পরিমাণও বেশি। কাজেই, পদ্মার ইলিশের স্বাদ বেশি হওয়ার যুক্তিসংগত ও বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।

ওয়াহাব সাহেবের ৩ নম্বর কথাটা ইলিশের মাপসংক্রান্ত। বলেছিলেন, সবচেয়ে স্বাদু ইলিশ সেইগুলো, যার ওজন ৯০০ গ্রাম থেকে ১ কেজির মধ্যে। ব্যাখ্যাটা হলো, এর বেশি ওজন মানে সেই মাছ বারবার মিঠাপানিতে ডিম ছেড়ে সমুদ্রে যাওয়া–আসা করেছে। প্রতিবার ডিম ছাড়ার অর্থ মাছের স্বাদ হ্রাস পাওয়া। শুনে তাঁকে বলেছিলাম, আপনাদের দেশে বড় মাছের প্রতি অধিকাংশ ক্রেতার একটা স্বাভাবিক লোভ ও আকর্ষণ লক্ষ করেছি। যেন যত বড় মাছ, তত তার স্বাদ ও কৌলীন্য বেশি। আড়াই–তিন কেজি ইলিশের পেটে যে এক কেজি ডিম ভরা রয়েছে, বেশির ভাগ ক্রেতা সে খেয়াল রাখেন না। আমার কথাটা শুনে অধ্যাপক ওয়াহাব মৃদু হেসেছিলেন। তারপর স্বগতোক্তি, ‘এসব নব্য ধনী মানসিকতা। ইলিশের ডিম বড়ই সুস্বাদু সন্দেহ নেই। কিন্তু ডিম ভরা মাছ স্বাদু হয় না। মাছের স্বাদ পেতে হলে হয় ডিম ছাড়া, নয়তো সামান্য ডিমের ছড়া ধরেছে, তেমন ইলিশ।’

ইলিশ নিয়ে বাঙালি পাগলামি করবেই। বাঙালি ছাড়া ইলিশের কদর সেভাবে আর কেই–বা করতে পেরেছে? অবশ্য না করে ভালোই হয়েছে। ভিনদেশিরা স্যামন, টুনা, বাসা, ভেটকি নিয়ে ব্যস্ত থাকুক। ক্যাভিয়ারসহযোগে ওয়াইন উপভোগ করুক। বিলিতি সাহেব ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’ নিয়ে মাতোয়ারা হোক। আমরা ইলিশ ও তার ডিম নিয়ে বিভোর থাকি।

ইলিশের আঁতুড়ঘর যে দেশ, বাজার ও ব্যাপারীদের বাড়াবাড়ির দরুন সে দেশের অন্তত ২৫ শতাংশ দরিদ্র ও অতিদরিদ্র ইলিশের স্বাদ গ্রহণে অপারগ। বাংলাদেশের বাজার ক্রেতার প্রয়োজনমতো কেটে মাছ বিক্রি করে না। সরকার উদাসীন। সব শ্রেণির উপভোক্তার স্বার্থে আন্দোলনও গড়ে ওঠেনি। হাজার টাকা কেজি দরে গোটা মাছ কেনার সামর্থ্য যাঁদের নেই, ইলিশসহ সব মাছই তাঁদের কাছে মরীচিকা। আবদুল ওয়াহাব স্বীকার করেছেন, ভারতীয় বাজারের মতো এই রেওয়াজ বাংলাদেশেও চালু হওয়া জরুরি। তাঁকে বলেছিলাম, দেশের ২৫ শতাংশ দরিদ্রের দরজা হাট করে খুলে গেলে দেখবেন বার্ষিক ৬ লাখ টন ইলিশের উৎপাদন পর্যাপ্ত মনে হবে না। ইলিশ নিয়ে পাগলামিও সর্বার্থে সর্বজনীন হবে।

ইলিশ নিয়ে বাঙালির এই পাগলামির চালচিত্রে অবিশ্বাস্য লাগে রবীন্দ্রনাথ–নজরুলের অনুপস্থিতি, বরিশালের ভূমিপুত্র মনসামঙ্গল–এর রচয়িতা বিজয় গুপ্তর আপাত ইলিশ–নিস্পৃহতা! নদীমাতৃক বাংলাদেশে ‘পদ্মা’ নামাঙ্কিত বজরায় কাল অতিবাহিত করেও রবীন্দ্রনাথের মন কখনো কেন ‘ইলিশময়’ হয়ে ওঠেনি, তা অবশ্যই এক বিস্ময়! এমন নয় যে মাছ নিয়ে কবিগুরুর ছুৎমার্গিতা ছিল। তিনি তো ‘দামোদর শেঠ কি’র সঙ্গে ভেটকির অন্ত্যমিল খুঁজে পেয়েছিলেন। চিতল মাছকে বলেছেন ‘মিঠাই গজার ছোট ভাই’। নৌকাডুবিতে রমেশ কালিদাসকে দিয়ে আওড়েছেন, ‘স্বপ্ন নয়, মায়া নয়, মতিভ্রম নয়, এ যে রুই মাছের মুড়ো!’ স্মৃতিচারণা করেছেন পারিবারিক মাঝি আব্দুলকে নিয়েও, যিনি ‘হালের কাছে বসে থাকতেন, যাঁর দাড়ি ছিল ছুঁচলো, গোঁফ কামানো ও মাথা নেড়া’ এবং যিনি তাঁর দাদাকে এনে দিতেন ‘পদ্মার ইলিশ ও কচ্ছপের ডিম’। ব্যস ওইটুকুই! রবীন্দ্রনাথের মতো একই রকম আবেগহীন নজরুলও। ইলিশ যেন তাঁর কাছে কাব্যে উপেক্ষিতা ঊর্মিলা! মনসামঙ্গল–এ বিজয় গুপ্তর কলমে উঠে এসেছে ‘রোহিত’ বা রুই, মাগুর, খরসুন, চিংড়ি, চিতল, কই। কিন্তু ইলিশ কোথায়? অথচ উত্তরসূরি বুদ্ধদেব বসুর কলমে ইলিশ ‘রজতবর্ণ মনোহরদর্শন মৎস্যকুলরাজ মহান’ এবং বিস্ময়করভাবে ‘প্রতিভাধর’!

ইলিশ প্রাণঘাতী, এমন অপবাদ সেভাবে কেউ দেননি। যদিও ‘অতি দর্পে হত লঙ্কা’র মতো অতি ইলিশ স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। এ প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন তাঁর মৃত্যুর ঠিক ১৪ মাস আগে, ২০১১ সালের অগস্টে, আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে। ঘটনা দুটির প্রথমটি সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই অমর কাহিনি, যেখানে পাগলা রাজা মহম্মদ বিন তুঘলক গুজরাটে বিদ্রোহ দমনে গিয়ে আচমকাই ‘ইলিশের’ দেখা পেয়েছিলেন। মাছটি তাঁর বজরায় লাফিয়ে পড়েছিল। চমৎকার গড়নের ঝকঝকে সাদা সেই মাছ খাওয়ার ইচ্ছা তিনি প্রকাশ করেছিলেন। সঙ্গীদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি গোঁ ধরে সেই মাছ খান। হয়তো সবটাই। তাতে তাঁর পেট ছেড়ে দেয়। দিন কয়েকের মধ্যে তিনি মারা যান। মুজতবা আলীর মনে হয়েছিল, মাছটি নিশ্চয় ইলিশই ছিল এবং ইলিশ খেয়ে যখন তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তখন নির্ঘাত তিনি বেহেশতেই গেছেন। অন্য কোথাও নয়।

গুজরাটে ইলিশ পাওয়া যায়। ইলিশকে তারা ডাকে ‘পাল্লা’।

দ্বিতীয় কাহিনি স্বামী বিবেকানন্দকে ঘিরে। বিবেকানন্দর প্রামাণ্য জীবনীতে এর উল্লেখ রয়েছে জানিয়ে সুনীল লিখেছেন, স্বামীজি একবার পূর্ববঙ্গে গিয়ে স্টিমারে ঘুরতে ঘুরতে ইলিশ মাছ ধরা দেখে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। চোখের সামনে এত টাটকা ইলিশ! সঙ্গী কানাইকে আদেশ করলেন কয়েকটা কিনে আনতে। ওঁরা দলে ছিলেন সাতজন। কানাই তিন–চারটি কেনার কথা বলতে স্বামীজি ধমক দিয়ে বলেন, আমরা খাব আর মাঝিমাল্লা খালাসিরা চেয়ে চেয়ে দেখবে? অতঃপর কেনা হয়েছিল ষোলোটি ইলিশ। একেকটির দাম চার পয়সা। মোট এক টাকা!

আর এক দিনের কথা। সুনীল লিখেছেন, তখন স্বামীজির শরীর বেশ খারাপ। একটা যাই যাই রব উঠে গেছে। প্রায়ই তিনি বলেন, শিগগিরই চলে যেতে হবে। চল্লিশ বছরের বেশি বাঁচবেন না। একদিন শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ঘরে বসে তিন ঘণ্টা ধ্যান করলেন। এরপর তাঁর খুব খিদে পেল। ঠিক করলেন মাছ, ভাত, তরকারি সব খাবেন। মসলা, ঝালসহকারে। তরিবত করে। তখন গঙ্গায় ইলিশ মাছ ধরা হচ্ছিল। স্বামী প্রেমানন্দ সেই মাছ কিনছেন শুনে বিবেকানন্দ নিজে হাজির হলেন ঘাটে। কিনলেন টাটকা ইলিশ। বেলুড় মঠে সেদিন বেশি লোকজন নেই। প্রেমানন্দকে স্বামীজি সেদিন কিছু মাছ ভাজতে বললেন। ভাজা মাছের স্বাদ অপূর্ব। আর বললেন, একটু মাছের টক যেন হয়। সেদিন ইলিশের তেল দিয়ে ভাত খেলেন। ডাল দিয়ে ভাত মেখে খেলেন ইলিশ মাছভাজা। ঝোলেও ইলিশ। ঝোলে ঝাল হয়নি বলে কাঁচা মরিচ ডলে নিলেন। শেষ পাতে মাছের অম্বল। ভোজের পর শরীরে বাড়তি শক্তি পেলেন। লাইব্রেরির ঘরে কিছু ছাত্রকে পাণিনির ব্যাকরণের মতো নীরস ও শক্ত বিষয় পড়ালেন কয়েক ঘণ্টা। তারপর হাঁটতে বেরোলেন। অনেক গল্প করলেন সেদিন সবার সঙ্গে। সেই রাতেই তাঁর মৃত্যু হলো।

মহম্মদ বিন তুঘলক ও স্বামী বিবেকানন্দর কাহিনি শুনে অধ্যাপক ওয়াহাব বলেছিলেন, ইলিশ অতি তৈলাক্ত মাছ। বেশি খেলে হজমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ভেতর–ভেতর স্বাস্থ্য খারাপ থাকলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়াও সম্ভব। কিন্তু ইলিশ প্রাণঘাতী—এই অপবাদ তার চরম শত্রুও দিতে পারবে না। তাঁর ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে আমি বিবেকানন্দর নিয়তির কথা ভাবছিলাম। আহা, এভাবে যদি যাওয়া যায় মন্দ কী? অবশ্যই তাঁর মতো উনচল্লিশ বছরে নয়। পরিণত বয়সে। যাওয়ার বেলায়। শখ–আহ্লাদ সব পূর্ণ করে। বাধা–বন্ধনহীন অবস্থায়। ইলিশকে সঙ্গী করে। পরম তৃপ্তি নিয়ে। শান্তিতে…

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন