আত্মবিশ্বাসীদের যেসব সূক্ষ্ম গুণ থাকে, নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন

পাবলিক স্পিকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, কথাবার্তার ক্ষেত্রে কিছু শব্দের ব্যবহার আমাদের আলোচনাকে আকর্ষণীয় করে তোলে। এসব শব্দ শুধু যে আলোচনাকে আকর্ষণীয় করে, তা–ই নয়; বরং সামনে থাকা ব্যক্তিটিকে আমাদের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে নতুনভাবে চেনাতেও প্রভাব ফেলে। তবে শুধু কি বাচনভঙ্গি বা শব্দের ব্যবহারেই মানুষকে মুগ্ধ করে ফেলতে পারি আমরা? নাকি আমরা যা বলছি, তার পাশাপাশি আমাদের সামনে থাকা ব্যক্তিটির দিকে আমরা কীভাবে তাকাচ্ছি, তাকে আমাদের মনের কথাটা বোঝাতে কতটুকু আগ্রহী কিংবা কথা বলার সময় আমাদের দাঁড়ানো বা বসার ভঙ্গি, যেই পরিবেশে আমরা আলোচনা শুরু করেছি, সেটি সেই আলোচনার জন্য কতটুকু সহায়ক—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ?

গবেষণা থেকে জানা যায়, মানুষ তাকেই বেশি আস্থাভাজন মনে করে, যাকে সে কোনো না কোনো সময় সাহায্য করেছিল
ছবি: পেক্সেলস

যেকোনো কথোপকথনে আমরা কতটুকু সম্মান পাব কিংবা কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ না করে আলোচনাটিতে আমাদের আশপাশের মানুষগুলোকে কতটা প্রভাবিত করতে পারব, তা নিয়ে বেশ কিছু কৌশল মাথায় রাখতে পারেন।

ছোট ছোট সাহায্য চাওয়া

গবেষণা থেকে জানা যায়, মানুষ তাকেই বেশি আস্থাভাজন মনে করে, যাকে সে কোনো না কোনো সময় সাহায্য করেছিল। বিহেভিয়ারাল সায়েন্টিস্টরা এর নাম দিয়েছেন ‘বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ইফেক্ট’।

মার্কিন বহুবিদ্যাজ্ঞ ফ্রাঙ্কলিন তাঁর অভিজ্ঞতায় লিখেছিলেন, একদিন তিনি তাঁর এক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছ থেকে একটি দুর্লভ বই ধার করেন। পৃথিবীতে এত মানুষ থাকতে ফ্রাঙ্কলিন কেন তাঁর প্রতিপক্ষের কাছে গেলেন বা সাহায্য প্রার্থনা করলেন?

আদতে এই সূক্ষ্ম আচরণ বা কৌশলই তাঁকে তাঁর প্রতিপক্ষের কাছে একজন অন্য মানুষ হিসেবে তুলে ধরে। মতের পার্থক্য থাকলেও সমাজে যে সবার প্রয়োজনীয়তা আছে, এই ভাবনা মানুষের ভেতরের দূরত্ব মিটিয়ে দেয়।

দারুণ ব্যাপার হলো, পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিপক্ষই ফ্রাঙ্কলিনের অনুসারী হয়ে ওঠেন।

আমরা অনেক সময় বলি, ‘এত বড় মাপের মানুষ, তবু কোনো অহংকার নেই’—বিষয়টি আদতে এই ফ্রাঙ্কলিন ইফেক্ট। অধস্তনের পাশে বসে খাওয়াদাওয়া কিংবা নামী অধ্যাপক একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কলম চাইছেন—এসব ছোট ছোট বিষয়ের প্রভাব আদতে ছোট নয়।

আরও পড়ুন

ক্ষুদ্র থেকে শুরু

ফ্রাঙ্কলিন ইফেক্টের এই ভেরিয়েশনকে ‘ল্যাডার অব এনগেজমেন্ট’ বা ‘ফুট ইন দ্য ডোর’ টেকনিকও বলা হয়। আত্মবিশ্বাসীদের অনেকের মধ্যেই এই গুণ থাকে। তবে সবার ক্ষেত্রে সমান না–ও হতে পারে।

অনেকে বহু সময় নিয়ে এসব গুণ আত্মস্থ করেন। যেমন একজন নতুন কর্মী যোগ দিয়েছেন, তাঁকে কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রথমে ছোট ছোট কাজ দেওয়া। ধীরে ধীরে আরেকটু বড় কাজে তাঁকে অংশ নিতে দেওয়া। এতে যিনি কাজ দিচ্ছেন এবং যিনি কাজ করছেন, দুজনের মধ্যে একটি ভরসার জায়গা তৈরি হয়।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা

একটি কাজ অনেকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। একজন দূরদর্শী ব্যক্তি কাজের পদ্ধতি নয় বরং কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়াকেই বিশেষ গুরুত্ব দেন। এ ক্ষেত্রে যে দল এই কাজটি করবে, তাদেরই কর্মপদ্ধতি ঠিক করার সুযোগ দিলে কাজের গতি বেগবান হয়।

তবে এতেও থাকতে হবে বাধ্যবাধকতা। ‘কাজটি কীভাবে করলে ভালো হয়, কোন কোন দিকগুলো লক্ষ্য রাখা উচিত’—এসব প্রশ্ন সবার মধ্যে একটি দলীয় মনোভাব গড়ে তোলে। কাজগুলোকে অর্পিত নয়, বরং নিজস্ব—এই বোধ কর্মক্ষেত্র কিংবা সমাজের যেকোনো ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতি আস্থার জায়গা তৈরি করতে সহায়তা করে।

একজন দূরদর্শী ব্যক্তি কাজের পদ্ধতি নয় বরং কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়াকেই বিশেষ গুরুত্ব দেন
ছবি: পেক্সেলস

উত্তরে তাড়াহুড়া নয়

যিনি নিজের জ্ঞান ও বিশ্বাস নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা রাখেন, তিনি অন্যদের বক্তব্য শুনতে আগ্রহী হন। যেকোনো আলোচনায় কথার পিঠে কথাই আত্মবিশ্বাস নয়, বরং কোনো কথার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই, সেটি জানাও আত্মবিশ্বাসের একটি অংশ।

গবেষণায় দেখা যায়, যেকোনো আলোচনায় ২০ সেকেন্ডের ছোট্ট একটি নীরবতা মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে। এই ২০ সেকেন্ড অপরের কথা শোনা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে নিজের মতামত শোনাতে আগ্রহী করে তোলার ক্ষেত্রেও দারুণ কাজ করে।

যা বলতে চাই তা–ই বলা

‘অধিক কথার সার্থকতা’ বাস্তব জীবনে আদতেই কম। কেননা আমাদের মস্তিষ্ক একসঙ্গে অনেক তথ্য গ্রহণ করতে পারে না। অর্থাৎ আপনি শুনবেন, তবে তথ্যটি মনে না থাকার আশঙ্কা খুবই প্রবল। মূলত একসঙ্গে চার ধরনের আইডিয়া নিয়ে আলাপ করলে মস্তিষ্ক তা ধারণ করতে পারে।

তাই বাস্তব জীবনে যাঁরা সবার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেন, তাঁরা হন স্বল্পভাষী, গোছানো এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন।

আরও পড়ুন

তর্ক এড়ানো

কথায় আছে, ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’। বাস্তব জীবনে আমাদের প্রত্যেকের বিশ্বাস আলাদা। আলাদা বলেই মতের বিভেদ আছে। তাই বলে নিজের বিশ্বাসকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

সাধারণত কেউ তর্কে জড়াতে চাইলে বা কোনো চ্যালেঞ্জ সামনে এলে নিজেকে প্রমাণ করার বাসনাকে এড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে আমাদের এনার্জি অন্য আরেকজনের পর্যায়ে নামানো থেকে রক্ষা করা যায়।

একই সঙ্গে অনেকেই ইচ্ছা করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, ফলে সব ক্ষেত্রেই তর্ক এড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

কীভাবে কথা বলছি

যেকোনো আলোচনায় আমরা সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার কথা বলেছি, তর্ক এড়ানো, দীর্ঘ আলাপে না যাওয়া কিংবা গুছিয়ে বলার কথা বললেও আলাপের সময় বেশি ধীরে আলাপ করাও কিন্তু আলাপের আবেদন নষ্ট করে ফেলতে পারে!

কিংবা জায়গা বুঝে খানিকটা আওয়াজ তুলে বক্তব্য দিয়ে এবং শুধু অন্যের কথা শোনার সময়ই নয়, নিজের বক্তব্যটি বলার সময়ও মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করাও একটি গুণ।

জায়গা বুঝে খানিকটা আওয়াজ তুলে বক্তব্য দিয়ে এবং শুধু অন্যের কথা শোনার সময়ই নয়, নিজের বক্তব্যটি বলার সময়ও মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করাও একটি গুণ
ছবি: পেক্সেলস

সবার আগে শেষ করা

এই ভেরিয়েশনটি পুরোনো ‘লিভ দেম ওয়ানটিং মোর’ নামে পরিচিত। একটি কাজের ক্ষেত্রে গোছানো, মার্জিত এবং পরিশীলিত অভিব্যক্তি আশপাশের সবাইকে একটি স্বচ্ছ ধারণা দেয়। একই সঙ্গে এসব গুণের অধিকারী ব্যক্তির সঙ্গে বারবার কাজ করার আগ্রহও তৈরি করে।

এই আগ্রহই পরবর্তী সময়ে একজন ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য, সম্মানিত ও পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তি হিসেবে সবার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে।

আত্মবিশ্বাস তৈরির প্রথম কারিগর আমাদের পরিবার হলেও এতে আমাদের নিজেদের এবং আশপাশের পরিবেশের অবদান কম নয়। নিজের অধিকার, দায়িত্ব এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে মাথায় রেখে এগিয়ে যেতে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার বিকল্প আদতেই কিছু নেই।

সূত্র: সিএনবিসি

আরও পড়ুন