‘এ ছেলে তুলি ছেড়ে ডাম্বেল ধরেছে দেখছি, শাবাশ বটে’

আজ পয়লা বৈশাখ। এই সুযোগে পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই এমন একজন শিল্পীর কথা, যাঁর তুলির টানে ফুটে উঠত বাঙালি নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য। তিনি পটুয়া কামরুল হাসান (২ ডিসেম্বর, ১৯২১-২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮)। কলকাতা আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ব্রতচারী আন্দোলনের নায়ক, শিশু সংগঠক, কুটির শিল্প সংস্থার ডিজাইন সেন্টারের প্রধান নকশাবিদ ও পরিচালক—সব পরিচয় ছাপিয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বাংলাদেশের একজন প্রধান শিল্পী। পাঠকদের জন্য আজ থাকল তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা।

পটুয়া কামরুল হাসান (২ ডিসেম্বর, ১৯২১-২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮)

১৯৪৫ সালের ১৬ জানুয়ারি, আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন। আমি ওই দিন ইন্টারকলেজিয়েট বডি প্রতিযোগিতায় ‘বি’ গ্রুপে (উচ্চতা অনুযায়ী গ্রুপ হতো) প্রথম স্থান অধিকার করি এবং কলকাতা আর্ট স্কুলের ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা। আমার কাপটি নিয়ে আসার সময় শিল্পী জয়নুল আবেদিনকেই স্কুলের শিক্ষকদের তরফ থেকে যেতে হয়েছিল। আজকের দিনের ব্যবস্থাপনা, আয়োজন আর সেদিনের পরিবেশ আকাশ-পাতাল তফাত। প্রতিযোগিতার দিন দেখি, মফস্বল ছাড়াও কলকাতার বিভিন্ন কলেজের পক্ষ থেকে বহু ধনীর দুলাল বড় বড় গাড়ি হাঁকিয়ে আসছে, তাদের সবার সঙ্গেই সাহায্যকারী। সঙ্গে টার্কিশ টাওয়েল, সুগন্ধি অলিভ অয়েল, আরও কত কী, আর এই বান্দা এক শিশি খাঁটি সরিষার তেল একটি গামছায় জড়িয়ে ট্রামে করে কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে গিয়ে উপস্থিত।

মঞ্চে উপস্থিত হওয়ার সময় যত নিকটবর্তী হচ্ছিল, আমার হৃদ্যন্ত্রের বিট ততই দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছিল। তৎকালীন কলকাতার পাঁচজন বিচারকমণ্ডলীর সামনে উপস্থিত হতে হবে, আমার সমর্থক হিসেবে আর্ট স্কুলের পক্ষ থেকে আমার সহপাঠীদের মধ্যে মাত্র তিনজন উপস্থিত ছিল; অপরদিকে অন্যান্য প্রতিযোগীর সমর্থকদের দ্বারা হলঘর পরিপূর্ণ। যা-ই হোক, মঞ্চে আমরা উঠলাম। সবার নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেন্দ্রের নামও ঘোষণা করা হচ্ছিল। আমার নামের পর যখন ‘আর্ট স্কুল’ শব্দটি ঘোষিত হলো, তখন বিচারকমণ্ডলী থেকে দর্শক-সমর্থকেরাও কেবল আশ্চর্যই হননি, হাসির রোলও পড়ে গিয়েছিল।

শরীর গঠন প্রতিযোগিতায় কামরুল হাসান

বিচারকমণ্ডলীর একজন সদস্য বেশ উচ্চ স্বরে বলেই উঠলেন, ‘এ ছেলে তুলি ছেড়ে ডাম্বেল ধরেছে দেখছি, শাবাশ বটে।’

আমার সময়ে বিচারকমণ্ডলীদের সবাই অমুসলমান ছিলেন। এঁদের মধ্যে বিজয় মল্লিক আমাদের দুই ভাইকে বিশেষ স্নেহের চোখে দেখতেন। আমার গ্রুপে আমি প্রথম স্থান অধিকার করায় তিনিই বেশি আনন্দিত হয়েছিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘যাক কামরুল, তুমি তোমার দাদার (বড় ভাই আবুল হাসানাত) নাম রেখে গেলে।’ পাঠক-পাঠিকারা অবাক হবেন, আমার এই সাফল্যের সংবাদ তখনকার কোনো পত্রপত্রিকায়ই বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়নি। সেকালের প্রচারমাধ্যম মানে একমাত্র দৈনিক আজাদ পত্রিকা। পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যেই অবশ্য আজাদ-এ এই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর অবশ্য মোহাম্মদীতেও আমার এবং অন্যান্য মুসলমান ব্যায়ামীর ছবিসহ সংবাদ বহুবার প্রচারিত হয়েছিল।


সূত্র: বাংলাদেশ শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা (প্রথমা প্রকাশন)