এআই নেবে পরীক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষার্থীর উদ্যোগ

বাঁ থেকে হাসিবুল আসিফ, সারাফ লামইয়া ও নয়ন পালছবি: শিক্ষার্থীদের সৌজন্যে

যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা। কোথায় আমার ঘাটতি আছে, তা বোঝা। কেমন হয়, যদি এই কাজটাই এআই করে দেয়? এই ভাবনা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী তৈরি করেছেন ‘টেস্টমিত্র এআই’ নামে একটি অ্যাপ। নৃবিজ্ঞান বিভাগের হাসিবুল আসিফ, মার্কেটিং বিভাগের নয়ন পাল এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সারাফ লামইয়া—তিনজন মিলেই কাজটি করেছেন। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি যেন আরও গোছানো, কাঠামোবদ্ধ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়, সেটিই ছিল নির্মাতাদের উদ্দেশ্য।

টেস্টমিত্র এআই মূলত ‘কারেক্ট ইঙ্ক’ নামে একটি উদ্যোগের ‘পোর্টফোলিও প্রোডাক্ট’। শুরুতে কারেক্ট ইঙ্ক গড়ে তুলেছিলেন হাসিবুল আসিফ ও সারাফ লামইয়া। অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ডেভেলপের পাশাপাশি সার্বিক পরিচালনার বিষয়টি দেখতেন আসিফ। সারাফের দায়িত্ব ছিল কনটেন্টের অর্থায়ন ও মার্কেটিং। পরে মার্কেটিং লিড হিসেবে যোগ দেন নয়ন পাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটি ক্লাবে তিনজনের পরিচয়। সেখানে একসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাজ করতেন তাঁরা। ফলে একে অপরের দক্ষতা সম্পর্কে জানতেন। তাই একজোট হওয়াটা সহজ হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কোচিং ও টিউশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিন উদ্যোক্তা। এই সময়ে একটা সমস্যা তাঁদের চোখে পড়ে—অনেক পরিশ্রম করেও কোনো কোনো শিক্ষার্থী বুঝতে পারছেন না, তাঁদের ঘাটতিটা কোথায়। বুঝিয়ে বললেন হাসিবুল আসিফ, ‘একটা ক্লাসের কথাই ভাবুন। ধরুন একজন শিক্ষকের সামনে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী। তাঁর পক্ষে কিন্তু আলাদা আলাদা করে কে কোথায় ভুল করছে, সেটা ধরিয়ে দেওয়া কঠিন। তাই আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি সিস্টেম, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজেই পরীক্ষা দিয়ে নিজের দুর্বলতাগুলো বুঝতে পারবে। এআই বলে দেবে—কোথায় সে ভালো করছে আর কোথায় আরও কাজ করা দরকার। এই প্রবলেম সলভ করতে গিয়েই টেস্টমিত্রের ধারণা মাথায় আসে।’

টেস্টমিত্র এআই এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিক্ষার্থীরা আগের বছরগুলোর প্রশ্ন অনুশীলন করতে পারবে, নিজের মতো করে নতুন প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারবে, আবার এআইয়ের সাহায্যে সমস্যা সমাধানও করিয়ে নিতে পারবে। পরীক্ষার পর বিস্তারিতভাবে দেখতে পারবে, কোন বিষয়ে তার ভুল বেশি হচ্ছে, কোথায় বেশি ফোকাস করা দরকার। পেয়ে যাবে একটি ‘পারফরম্যান্স বেইজড স্টাডি প্ল্যান’।

বর্তমানে টেস্টমিত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। উদ্যোক্তারা যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের, তাই তিন মাসের জন্য নিজ ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ দেন তাঁরা। নয়ন পাল বলেন, ‘টেস্টমিত্র শুধু একটি প্রশ্ন প্র্যাকটিসের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি একটি “পার্সোনালাইজড প্রিপারেশন টুল”। এআই ব্যবহার করে নিজেই প্রশ্ন তৈরি করে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ এখানে আছে। অ্যাপটির ইন্টারফেস বেশ ইউজার-ফ্রেন্ডলি হওয়ায় যাঁরা ব্যবহার করছেন, তাঁরা ভালো সাড়া দিচ্ছেন। কিছু ব্যবহারকারী কিছু বাগের (সমস্যা) কথা জানিয়েছেন, সেগুলো আমরা নিয়মিত সমাধান করে যাচ্ছি।’

টেস্টমিত্র এআই তৈরির শুরুর সময়টা কঠিন ছিল। ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ভালো রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তখন প্রায় সব কাজই তিনজনের ছোট দলটিকে সামলাতে হয়েছে—অ্যাপ আর ওয়েবসাইট ডেভেলপ থেকে শুরু করে গবেষণা ও উন্নয়ন, বিপণন, এমনকি ব্যবহারকারীদের ফিডব্যাক নেওয়া, সব। ফিডব্যাক পাওয়ার পর সমস্যাগুলোর সমাধান, ফিচার ঠিক করা, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বারবার যেতে হয়েছে। এখন দল একটু বড় হওয়ায় কাজগুলো ভাগ করে করা যাচ্ছে। সামনে টেস্টমিত্রে গেমিফিকেশন, এক্সাম ক্যালেন্ডার এবং আরও ইন্টারেক্টিভ কিছু ফিচার যোগ হবে, তা নিয়েই কাজ চলছে। কারেক্ট ইঙ্ক–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও সারাফ লামইয়া বলেন, ‘শুরু থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা। সেই লক্ষ্য থেকেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই। কারেক্ট ইঙ্কও একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে শেখা ও শেখানোর পদ্ধতিটা আমরা আরও সহজ করতে চাই।’

আরও পড়ুন