সিলিকা জেলের প্যাকেটগুলো কেন ফেলে দেওয়া উচিত নয়

ওষুধ, চামড়া ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের বাক্সের ভেতরে থাকে সিলিকা জেলের ছোট ছোট প্যাকেট। এসব আমরা অনেকেই ফেলে দিই। তবে এর পর থেকে সিলিকা জেলের প্যাকেট আর ফেলে দেবেন না। কারণ, এসব আপনার ঘরের অনেক জিনিস ভালো রাখবে, পরিবেশের জন্যও বেশ উপকারী। যেখানে বাতাসের আর্দ্রতা বা ভ্যাপসা ভাব বেশি, সেখানে এসব বেশ কাজে দেয়। তাই ঘর বা অফিসের নানা কাজে আপনি এসব নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু এই অবহেলিত প্যাকেটগুলো আমাদের রোজকার জীবনে ঠিক কী কাজে আসে? এসব কি বারবার ব্যবহার করা নিরাপদ? আর ভুল করে কেউ খেয়ে ফেললে কী হবে? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।

সিলিকা জেলের এসব প্যাকেট আপনার জন্য এক বড় উপহার
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

অনলাইনে নতুন জুতা কিনলেন কিংবা ওষুধের বাক্স খুলতেই ভেতরে ছোট্ট সাদা প্যাকেট নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে? প্যাকেটের গায়ে বড় বড় করে লেখা থাকে ‘THROW AWAY, DO NOT EAT’। মানে, ফেলে দিন, খাবেন না। ব্যস। এটুকুই আমাদের কাছে প্যাকেটটির পরিচয়।

আমরা ভাবি, এটি হয়তো বিষাক্ত কোনো জিনিস বা আবর্জনা। তাই দেরি না করে সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলে দিই।

কিন্তু এসব প্যাকেট আপনার জন্য এক বড় উপহার। রান্নাঘর থেকে শুরু করে আলমারি, এমনকি শখের গ্যাজেটটি ভালো রাখতে এই ছোট্ট প্যাকেট জাদুর মতো কাজ করতে পারে।

কিন্তু কেন এসব প্যাকেট সবকিছুর সঙ্গে দেওয়া হয়? আর কেনইবা এসব ফেলে না দিয়ে যত্ন করে রাখা উচিত? চলুন, জেনে নেওয়া যাক সিলিকা জেলের ছোট্ট প্যাকেটের বড় কারসাজি।

সিলিকা জেল প্যাকেটের ভেতরে কী থাকে

সিলিকা জেল আদতে একধরনের বালু। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সিলিকন ডাই-অক্সাইড। কোয়ার্টজ পাথর যে উপাদান দিয়ে তৈরি, এটিও সেই একই জিনিস।

নামের শেষে জেল থাকলেও এসব আদতে জেলের মতো নরম নয়, বরং ছোট ছোট কাচের দানার মতো শক্ত পুঁতি। পুঁতিগুলোর গায়ে হাজার হাজার সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে।

এসব ছিদ্র দিয়েই এরা বাতাস থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প শুষে নিতে পারে। এতটাই যে জেলগুলো নিজেদের ওজনের প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পানি শুষে নিতে সক্ষম।

সিলিকা জেল আদতে একধরনের বালু। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সিলিকন ডাই-অক্সাইড
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

একে ঘরে তৈরি একটি ছোট ডিহিউমিডিফায়ার অর্থাৎ বাতাস থেকে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতা কমানোর ‘যন্ত্র’ বলা যেতে পারে।

আর এ কারণেই কোনো শুকনা জিনিসকে আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে এটি ব্যবহার করা হয়। তবে বাতাস থেকে প্রচুর পানি শুষে নেওয়ার পর এই শক্ত দানাগুলো কিছুটা জেলের মতো নরম হয়ে যায়। এ জন্য এটার নাম সিলিকা জেল।

আরও পড়ুন

সিলিকা জেল কী কাজে লাগে

আগেই বলেছি, এসবের মূল কাজ প্যাকেটের ভেতরের বাতাস থেকে বাড়তি জলীয় বাষ্প শুষে নেওয়া। যাতে আর্দ্রতা বা ভ্যাপসা ভাব ভেতরে থাকা জিনিসের কোনো ক্ষতি করতে না পারে। কোম্পানিগুলো মূলত পাঁচটি কারণে এই প্যাকেটগুলো ব্যবহার করে।

১. আর্দ্রতা কমানো: বাতাসের বাড়তি জলীয় বাষ্প শুষে নিয়ে জিনিসপত্র শুকনা রাখে।

২. ছাতা বা ছত্রাক থেকে সুরক্ষা: আর্দ্রতা না থাকলে খাবারে বা চামড়ার জিনিসে ছত্রাক বা ছাতা ধরতে পারে না।

৩. দীর্ঘদিন ভালো রাখা: ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখতে এবং খাবার অনেক দিন তাজা রাখতে সিলিকা জেল সাহায্য করে।

৪. দামি ইলেকট্রনিকসকে রক্ষা: ক্যামেরা, ল্যাপটপ, মুঠোফোন, গেমিং কনসোলের মতো সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশগুলো যেন মরিচা বা আর্দ্রতার কারণে নষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করে।

৫. পণ্যের মান ঠিক রাখা: জুতার চকচকে ভাব বা নতুন জিনিসের ঘ্রাণ ধরে রাখতে সিলিকা জেল কাজ করে। এ ছাড়া আর্দ্র পরিবেশ চামড়ায় যেহেতু সহজেই ছত্রাক পড়ে, তাই এ ক্ষেত্রেও সিলিকা জেল সুরক্ষা দেয়।

পুরোনো ইলেকট্রনিকস পণ্য সংরক্ষণে সিলিকা জেল কাজ করে পাহারাদারের মতো
ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

সিলিকা জেলের প্যাকেটগুলো কীভাবে আবার কাজে লাগাবেন

যেকোনো শুকনা জিনিস দীর্ঘক্ষণ ভালো রাখতে এসব প্যাকেট ব্যবহার করতে পারেন। ঘরের দৈনন্দিন নানা কাজে এসব প্যাকেট কিছুটা ম্যাজিকের মতো কাজ করতে পারে। চলুন দেখে নিই সিলিকা জেল কোথায় কোথায় ব্যবহার করা যায়।

  • মেকআপ বক্সের আইশ্যাডো যেন দলা পাকিয়ে না যায়, সে জন্য মেকআপ বক্সে একটি প্যাকেট রাখতে পারেন।

  • লবণের বয়াম বা মসলার জারের আশপাশে সিলিকা জেল রাখলে লবণ বা মসলা সব সময় ঝরঝরে থাকে।

  • রুপা বা সোনার গয়না কালচে হওয়া থেকে বাঁচাতে গয়নার বাক্সে এটি খুবই কার্যকর।

  • চিপস বা বিস্কুটের প্যাকেটের আশপাশে একটি সিলিকা জেল রাখলে অনেক দিন মুচমুচে থাকে।

  • ঘামের গন্ধে জিম ব্যাগ বা ব্যাকপ্যাকে ভ্যাপসা গন্ধ হয়ে গেলে সিলিকা জেলের একটি প্যাকেট রাখুন, দুর্গন্ধ দূর হবে।

  • যখন জুতা পরছেন না, তখন জুতার ভেতরে সিলিকা জেল রেখে দিন। এতে জুতার স্যাঁতসেঁতে ভাব থাকবে না।

  • গিটার বা বেহালার মতো যন্ত্রাংশগুলো আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে এদের বক্সে সিলিকা জেল রাখা জরুরি।

  • পুরোনো চিঠি, ডায়েরি বা জার্নাল যেন আর্দ্রতায় নষ্ট না হয়, সে জন্য ড্রয়ারে সিলিকা জেল দিয়ে রাখতে পারেন।

সিলিকা জেল প্যাকেটগুলো কত দিন কাজ করে

সিলিকা জেলের প্যাকেটগুলো কিন্তু আজীবন কাজ করে না। প্যাকেটের আকার ও ধরনভেদে এসব সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব বদলে ফেলা ভালো।

কিন্তু বুঝবেন কী করে যে প্যাকেটটি আর কাজ করছে না?

যখন দেখবেন শক্ত দানাগুলো জেলের মতো নরম হয়ে গেছে, তখনই বুঝবেন এটি বাতাস থেকে আর পানি শুষে নিতে পারছে না। এমনকি কিছু বিশেষ ব্র্যান্ডের সিলিকা জেল বাতাস থেকে পানি শুষে নিলে নিজের রং বদলে ফেলে; সাদা থেকে গোলাপি বা নীল হয়ে যায়।

একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। আপনি যখন কোনো নতুন পণ্যের ভেতর থেকে এই প্যাকেটটি পান, সেটি কত দিন ধরে ওই বাক্সে ছিল, তা আমরা জানি না। হতে পারে আপনার হাতে পৌঁছানোর আগেই এর মেয়াদ অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে।

তাই এসব পুনরায় ব্যবহারের সময় নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাই চাইলে আপনি বাজার থেকে আলাদা করে সিলিকা জেলের প্যাকেট কিনতে পারেন।

আরও পড়ুন

সিলিকা জেল ব্যবহারের কিছু দরকারি টিপস

বাড়িতে সিলিকা জেল থেকে সেরা ফল পেতে এসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—খুব ছোট বা কম প্যাকেট দিলে তেমন কোনো লাভ হবে না। আবার প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বড় বা বেশি প্যাকেট ব্যবহার করলে জিনিসপত্র অতিরিক্ত শুকিয়ে ভেঙে যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, কতটুকু জায়গায় কয়টি প্যাকেট দেবেন?

অনলাইনে যারা সিলিকা জেল বিক্রি করে, তাদের সাইটে সাধারণত ছোট ক্যালকুলেটর থাকে। সেসব ব্যবহার করে সহজেই মাপটা বুঝে নিতে পারেন।

তবে যদি পুরোনো প্যাকেটগুলোই আবার কাজে লাগাতে চান, তবে কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই। কয়েকবার ব্যবহার করলেই নিজেই বুঝে যাবেন ঠিক কতটুকু দরকার।

যদি প্যাকেটগুলো খোলা বাতাসে রেখে দেন, তবে সেসব অনবরত চারপাশের বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প শুষে নিতে থাকবে। এতে খুব দ্রুত এসবের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।

সিলিকা জেল সবচেয়ে ভালো কাজ করে এমন জায়গায়, যেখানে বাইরে থেকে বাতাস ঢোকে না অর্থাৎ এয়ারটাইট পাত্রে।

তাই শখের জিনিসটি যদি বায়ুরোধী বাক্সে না থাকে, তবে সেটি এবং সিলিকা জেলের প্যাকেট উভয়ই একটি মুখবন্ধ প্লাস্টিকের ব্যাগ বা ঢাকনাওয়ালা বয়ামে রাখতে হবে।

এতে সিলিকা জেল অনেক দিন ভালো থাকবে এবং জিনিসটিও সুরক্ষিত থাকবে।

সিলিকা জেল বাতাসের বাড়তি জলীয় বাষ্প শুষে নিয়ে জিনিসপত্র শুকনা রাখে
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

সিলিকা জেল কি আদতে বিপজ্জনক

সিলিকা জেলের প্যাকেটে বড় করে ‘খাবেন না’ লেখা দেখে আমরা অনেকেই ভয় পাই। ভাবি, এটি হয়তো মারাত্মক কোনো বিষ। আসলে সিলিকা জেল নিজে বিষাক্ত কিছু নয়। এটি খাওয়ার অনুপযুক্ত হওয়ার মূল কারণ হলো, এটি গলায় আটকে শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া কিছু বিশেষ ব্র্যান্ডের সিলিকা জেলে কোবাল্টের মতো বাড়তি কিছু রাসায়নিক থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

তবে ভুল করে দু–একটি দানা মুখে চলে গেলে ভয়ের কিছু নেই। বেশির ভাগ সিলিকা জেলই বিষাক্ত নয়। এটি গিলে ফেলা মানে হলো এক বা দুই চা-চামচ বালি খেয়ে ফেলা।

এটি আপনার খুব একটা ক্ষতি করবে না, আর লোকে যেমন ভাবে এটি শরীরের ভেতরের অংশ একদম শুকিয়ে ফেলবে, ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়।

একইভাবে এই প্যাকেটের ভেতরের দানাগুলো হাত দিয়ে ধরলেও কোনো সমস্যা নেই। এতে হাত বড়জোর কিছুটা ধুলাবালুতে নোংরা হওয়ার মতো হতে পারে, কিন্তু আপনার ত্বকের কোনো ক্ষতি করবে না। তবে যাদের ত্বক অতিসংবেদনশীল বা শুষ্ক প্রকৃতির, তাঁরা সাবধানতা অবলম্বন করুন।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন