প্রবাসে আমার মনে দেশের এবং মানুষের যে প্রতিচ্ছবি ভাসে, সেটা তোমার আঁকা
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।
আমাদের সম্পর্কটাকে কি ভালোবাসা বলা যায়? অথবা প্রেম? সত্যি বলতে কি, আমি না এগুলোর কোনোটাই বুঝি না। শুধু জানি, একটা মানুষের ভাবনায় পুরো কলেজজীবনটা পার করে দিয়েছিলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে সাহসের কাজ ছিল, তোমাদের বাড়ি গিয়ে কলবেলে চাপ দিয়ে পালিয়ে না আসা। খালাম্মা এসে যখন বললেন, তুমি বাড়ি নেই, তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। যদিও খবর নিয়েই গিয়েছিলাম যে তুমি বাড়িতেই আছ। তবু দেখা না হওয়াতেই যেন স্বস্তি পেলাম।
আচ্ছা, এরপর কি আমি তোমার বা খালাম্মার ওপর অভিমান করেছিলাম? অথবা রাগ? হবে হয়তোবা। নাহলে মাধ্যমিকে সাধারণ প্রথম বিভাগ পাওয়া ছাত্র কীভাবে উচ্চমাধ্যমিকে এত ভালো ফল করেছিল। তারপর ভর্তি পরীক্ষায় আরও অভাবনীয় ফল। এখন কেন যেন মনে হয়, খালাম্মা যদি আমাকে তোমাদের বাসার দরজা থেকে ফিরিয়ে না দিতেন, তাহলে হয়তোবা এতটা ভালো ফল করতে পারতাম না। তাই একটা সময় এসে মনে হয়েছে, আমার যৎসামান্য সাফল্যের পেছনে তোমার পাশাপাশি খালাম্মারও অবদান আছে।
এখনও যতবার বাড়ি যাই, তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে একবার না একবার যেতেই হয়। এবার দেশে গিয়ে প্রথম খেয়াল করলাম, তোমাদের বাড়ির একটা নামও আছে। বলা হয়, মানুষ নাকি একবারই বাঁচে—শৈশবে। বাকি জীবন বাঁচে তার স্মৃতিচারণা করে। আমারও তা–ই মনে হয়। এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে মধুর স্মৃতি কৈশোরে তোমার রিকশার পেছনে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া। এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখি, একটা কিশোর কলেজের কমনরুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। চাতক পাখির মতো কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে তার দুই চোখ।
সেই ১৯৯৬ সালে তোমাকে প্রথম দেখা। এখন ২০২৬। ৩০ বছর পর তোমার সঙ্গে প্রথম সামনাসামনি দেখা হলো। প্রথম কথা হলো। তোমার চেয়ে তোমার বাবার আর পরিবারের মানুষদের সঙ্গেই কথা হলো বেশি। সবাইকে কেন যেন খুব বেশি আপন মনে হচ্ছিল। আমাদের এই অদ্ভুত একপেশে সম্পর্কটার কখনো আমি কোনো নামকরণ করতে চাইনি। আমার মনে হয়েছে, একটা নাম দিলেই সম্পর্কটা তার বহুমাত্রা ছাড়িয়ে একমাত্রিক হয়ে উঠবে।
বাকি জীবনটা এই ভ্রান্তি বা মরীচিকাকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চাই। তোমার দৃষ্টি দিয়ে দেখতে চাই আমার মা অথবা দেশকে। প্রবাসে আমার মনে দেশের এবং মানুষের যে প্রতিচ্ছবি ভাসে, সেটা তোমার আঁকা। জানি না, আবার কখনো তোমার সঙ্গে দেখা হবে কি না। জীবনানন্দের কথা ধার করে নচিকেতা একটা গান করেছিলেন। তাঁর কথাগুলো আমাকে কেন জানি খুবই ভাবায়—
‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার—/তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!/তখন মুখোমুখী আমি আর শৈশব/মাঝখানে ব্যবধান কুড়ি অথবা ৩০ অথবা ৪০ অথবা—’