মা হিসেবে আমি আতঙ্ক বোধ করছি

ঢাকায় সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সব অভিভাবকের মনে এখন একই প্রশ্ন—আমাদের শিশুরা কোথায় নিরাপদ থাকবে? প্রতিবেশী, আত্মীয় বা পরিচিত মানুষের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা হিংস্র ‘প্রাণীগুলোর’ কাছ থেকে কীভাবে আমরা আমাদের সন্তানদের রক্ষা করব?

ঢাকায় সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অভিভাবকের মনে এখন একই প্রশ্ন—আমাদের শিশুরা কোথায় নিরাপদ থাকবে?ছবি: এআই/প্রথম আলো

আমি নিজেও এক কন্যাশিশুর মা। ভাবতেই শিউরে উঠি। একটি সাত বছরের শিশু নিজের বাসার পাশের ফ্ল্যাটেই এমন ভয়াবহ পাশবিকতার শিকার হয়েছে।
শিশুদের প্রতি সহিংসতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতনকারী শিশুর পরিচিত কেউ। ২০২৫ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনকারীরা শিশুর পরিচিত—আত্মীয়, বন্ধু বা বিশ্বস্ত কেউ।’ (তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, ইউনিসেফ)

আরও পড়ুন

রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ শিশুদের নিরাপত্তা শুধু আইনের ওপর নির্ভর করে না; অনেকাংশে নির্ভর করে পরিবার কতটা সতর্ক, দায়িত্বশীল এবং মনোযোগী, তার ওপর। যদিও একেবারে পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর কাছে শিশু যখন অনিরাপদ হয়ে যায়, তখন কিছুই বলার আর ভাষা থাকে না।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের একা বাইরে যাওয়া নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। তবে সতর্কতা আর ভয়ভীতি এক বিষয় নয়। জোর করে শিশুদের আটকে রাখা বা সবকিছুতে ভয় দেখানো তাদের মানসিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে তারা আশপাশের জগৎকে স্বাভাবিকভাবে না দেখে ভয় ও অবিশ্বাসের জায়গা থেকে দেখতে শেখে।

মা হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ। তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা এবং মনোযোগ দিয়ে শোনা অত্যন্ত জরুরি। শিশুকে শুধু ‘না’ বললেই হবে না; তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে কেন একা বাইরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কেন কোথাও যাওয়ার আগে পরিবারকে জানানো প্রয়োজন। সঠিক আলোচনা ও বয়স উপযোগী বোঝাপড়ার মাধ্যমে শিশুদের সচেতন করা অনেক বেশি কার্যকর।

অনেক পরিবার দীর্ঘদিন একই এলাকায় বা একই ভবনে বসবাস করে। পরিচিত পরিবেশ মনে করে শিশুরা একা খেলতে যায়, লিফটে ওঠানামা করে, দারোয়ানের সঙ্গে স্কুলে যায় বা ভবনের অন্য ফ্ল্যাটে যাতায়াত করে। অনেক অ্যাপার্টমেন্টে শিশুরা সহজেই এক তলা থেকে আরেক তলা, ছাদ বা অন্য ফ্ল্যাটে চলে যায়। বাবা-মায়েরা প্রায়ই ভাবেন, ‘বাড়ির ভেতরেই তো আছে’, তাই বিপদের আশঙ্কা কম।
কিন্তু বাস্তবে ভবনের ভেতরের অনেক জায়গাই নজরের বাইরে থাকে—সিঁড়িঘর, ছাদ, করিডোর, খালি ফ্লোর বা লিফট। পরিচিত পরিবেশ মানেই নিরাপদ পরিবেশ নয়। তাই শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কতক্ষণ বাইরে থাকছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি। একই সঙ্গে সন্তানকেও বোঝাতে হবে কেন কিছু পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বর্তমানে অনেক অভিভাবকই শিশুদের ‘গুড টাচ, ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে শিক্ষা দেন। স্পর্শের বিষয়টি শেখানো অবশ্যই জরুরি। তবে একই সঙ্গে পরিবার, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত মানুষের ক্ষেত্রেও সীমারেখা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে গিয়ে মানুষ ‘না’ বলতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না।

আরও পড়ুন

একজন সচেতন অভিভাবক মানুষের আচরণের ধরনও খেয়াল করেন। কিছু মানুষ শিশুদের প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখায়, কেউ শিশুর সঙ্গে একা থাকতে চায়, কেউ আদর বা মজার আড়ালে সীমারেখা ভাঙার চেষ্টা করে, আবার কেউ ধীরে ধীরে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ তৈরি করতে চায়। এসব আচরণের ধরন খেয়াল করা জরুরি।
অনেক সময় আমরা ‘ও তো পরিবারের মতো’ ভেবে সতর্কতা হারিয়ে ফেলি। অথচ পরিচিত হওয়া আর নিরাপদ হওয়া এক বিষয় নয়।
শিশুর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় শিশুদের অনেক সময় আলাদা ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় না। শাসনের নামে আমরা নিয়ন্ত্রণ করি, বড়দের সম্মান করতে শেখাই, কিন্তু ব্যক্তিগত সীমারেখা শেখাই না। শিশুর জীবন থাকে নিয়মের মধ্যে—স্কুল, খাওয়া, পড়াশোনা, ঘুম—কিন্তু তার অনুভূতি বা অস্বস্তিকে সব সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
ফলে অনেক শিশু ধীরে ধীরে শিখে যায়, তাদের অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক সময় তাদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, বিশ্বাস করা হয় না, বা ‘শিশুসুলভ কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
আমাদের বুঝতে হবে, শিশুদের কাছে ‘বিপদ’ বা ‘ঝুঁকি’ বড়দের মতো স্পষ্ট কোনো ধারণা নয়। তারা অনেক সময় অস্বস্তি অনুভব করে, ভয় পায় বা কোনো আচরণে অস্বাভাবিক কিছু টের পায়; কিন্তু বড়দের মতো সেটিকে ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে না।
তাই কোনো শিশু যদি কারও কাছে যেতে না চায়, কারও সঙ্গে মিশতে অস্বস্তি বোধ করে, কাউকে দেখে চুপ হয়ে যায় বা ভীত হয়ে পড়ে—সেগুলোকে শিশুসুলভ আচরণ বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
শিশুর প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা তার পরিবার। যদি কোনো শিশু মনে করে তার কথা বিশ্বাস করা হবে না, অভিযোগ করলে উল্টো সে-ই বকাঝকা বা শাস্তির মুখে পড়বে, তাহলে সে ধীরে ধীরে সবকিছু নিজের মধ্যে চেপে রাখতে শেখে।
আর এই নীরবতাই অনেক সময় শিশুদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে ফেলে।
শিশু যত ছোটই হোক, তাকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে মূল্য দিতে হবে। তার বিচারবোধ ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে দিতে হবে। সেই বিচারবোধ গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পিতামাতারই। বয়স উপযোগী আলোচনা, খোলামেলা যোগাযোগ এবং নিরাপদ মানসিক পরিবেশের মধ্য দিয়েই শিশু শিখবে—সব নিষেধ শাসন নয়, অনেক নিষেধই তার নিরাপত্তার জন্য।

আরও পড়ুন