তাসনিয়া ফারিণের মা স্কুলের জানালায় কেন ওড়না বেঁধে রাখতেন?
অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণের আজকের অবস্থানে আসার পেছনে পুরো অবদানটুকু মা সৈয়দা শারমীনের। মা দিবস সামনে রেখে নকশার আয়োজনে এই মা–মেয়ে শোনালেন তাঁদের গল্প।
‘একটু একটু করে যখন বড় হচ্ছি, খুব বিরক্ত হতাম, যখন সবকিছুতেই শাসন করতেন মা। ফোন ধরা যাবে না, সময়মতো পড়তে বসতে হবে, গান করতে হবে, ঠিকমতো খেতে হবে—এসব নিয়মানুবর্তিতায় মনে হতো আমার মা–ই কি পৃথিবীর সবচেয়ে কড়া মা। কোথায়, আমার বন্ধুদের মায়েরা তো এমন না। তবে এখন বুঝতে পারি, মায়ের সেই নিয়মকানুন আমাকে শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনে সাহায্য করেছে। মায়ের কারণেই আজ আমি তাসনিয়া ফারিণ হয়ে উঠতে পেরেছি।’
মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস। এ উপলক্ষে ‘নকশা’র বিশেষ আয়োজনে অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ ও তাঁর মা সৈয়দা শারমীনকে নিয়ে নকশার ফটোশুট হলো মাদানী অ্যাভিনিউর শেফ’স টেবিলে। বিয়ের পর ফারিণ চলে গেছেন রাজধানীর উত্তরায় আর মা থাকেন ইস্কাটনে। ছবি তোলার দিনটি মা-মেয়ে যেন ফিরে গেলেন তাঁদের পুরোনো দিনে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর প্রথম মুঠোফোন ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছিলেন ফারিণ। বন্ধুরা অনেক আগে থেকেই ফোন আর ইন্টারনেট ব্যবহার করত। এইচএসসি পর্যন্ত সব জায়গাতেই ফারিণের সঙ্গে মা যেতেন। তবে সেই বয়সে মায়ের সবকিছু একটু বাড়াবাড়ি মনে হলেও এখন ফারিণ উপলব্ধি করেন, তাঁর এত ভালো একাডেমিক ক্যারিয়ার, স্কুলিং মায়ের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
ফারিণের কথার মাঝেই মা সৈয়দা শারমীন বললেন, ছোটবেলা থেকেই ফারিন বেশ লক্ষ্মী। ঘরের মেঝেতে কার্পেটের এক জায়গায় ওকে বসিয়ে খেলনা, বই বা রং–পেনসিল দিয়ে রাখলে সে সেখানে তা দিয়েই কাজ করত বা খেলত। দুই ভাই–বোনের মধ্যে ফারিণ বড়। ছোট ভাই মাহির ধ্রুব এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে।
বাবা জামিলুর রহমানের সরকারি চাকরির কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে পড়েছেন তাসনিয়া ফারিণ। মাত্র তিন বছর বয়সে কক্সবাজার কেজি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু। সেই সময়কার একটা মজার ঘটনা শেয়ার করলেন। ক্লাসের জানালা থেকে মায়ের ওড়না দেখতে দেখতে ক্লাস করতেন ফারিণ। প্রতিদিন তো মায়ের এত সময় বসে থাকা সম্ভব হতো না, বাসায় অনেক কাজ থাকত। তাই ফারিণের মা যে ওড়না পরে আসতেন, জানালার কাছে তা ঝুলিয়ে রাখতেন। অনেক দিন পর বিষয়টি বুঝতে পারেন ফারিণ।
যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠবেন, সেই সময় পত্রিকায় হলি ক্রস স্কুলের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেখে মাকে দেখান ফারিণ। আগে থেকেই মায়ের ইচ্ছা ছিল মেয়ে এই স্কুলে পড়ুক। দিনরাত পড়াশোনা করে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে রীতিমতো অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভর্তির সুযোগ পান ফারিণ। হলি ক্রসে পড়াশোনায় অনেক চাপ ছিল। সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত করেও স্কুলে প্রথম থেকে ১০–এর মধ্যে স্থান অধিকার করে নিতেন ফারিণ।
ফারিণ জানালেন, আজকের এই যে তাসনিয়া ফারিণ হয়ে ওঠা; তার পেছনে সবটুকু অবদান মায়ের। মায়ের আগ্রহে নজরুল একাডেমি থেকে সংগীতে ১০ বছরের কোর্স করেছেন। ‘স্কুল শেষে মা আমাকে গানের ক্লাসে নিয়ে যেতেন, কখনো অনুষ্ঠানের জন্য রাত ১০টা পর্যন্ত মা আমার সঙ্গে বসে থাকতেন। কোনো বিশ্রাম নিতেন না।’
‘ওর বাবার অতটা ইচ্ছা ছিল না যে ও নাচ-গান শিখুক বা মিডিয়াতে কাজ করুক আমারই ইচ্ছাটা বেশি ছিল,’ বলছিলেন ফারিণের মা সৈয়দা শারমীন। ‘ওকে নাচের স্কুলে নিয়ে গেলে দেখা গেল, সেখানেও যেমন ভালো করছে, তেমনি কবিতা আবৃত্তিতেও স্কুলে প্রথম হয়েছে ফারিণ। ও যখন পুরস্কার পেত, আমার আগ্রহ আরও দ্বিগুণ হতো।’ তবে ফারিণের বিরুদ্ধে মায়ের একটা অভিযোগ, তিনি খেতে চাইতেন না। শুধু একটি বিষয় নিয়েই মাকে জ্বালাতেন ফারিণ।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর ফারিণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। তবে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) পছন্দের বিষয় পেয়ে সেখানেই ভর্তি হন ফারিণ। সেখান থেকে স্নাতক। তবে নায়িকা হবেন, এমনটা কখনো তাঁর ভাবনায় ছিল না। এসএসসি পরীক্ষার পর তাঁদের এক পরিচিত জন তাঁর মায়ের কাছে একটি বিলবোর্ডের জন্য ফারিণের ছবি চান। পরে সেই ছবির শেষ পর্যায়ে বাছাই হলে কাজটির সুযোগ পান ফারিণ। এরপর তাঁকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
মায়ের এই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে কি ফারিণের কখনো একঘেয়ে লাগত? জানতে চাইলে ফারিণ বললেন, তেমনটা কখনো মনে হয়নি। তখন মনে হতো এটাই জীবন। তবে মা যোগ করলেন, ‘ও যে সব সময় আগ্রহ নিয়ে করত, তেমনটা কিন্তু না। ওই যে বললাম না, মায়ের বাধ্য মেয়ে, তাই যেখানে যেটা করাতাম, সে মনোযোগ দিয়ে করত। কখনো না করত না।’
‘নকশা’ ফটোশুটের এক পর্যায়ে প্রথমা বুক ক্যাফেতে গিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন মা–মেয়ে। তখনই জানলাম, নিয়মিত বই পড়েন ফারিণ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিতে বেশ কয়েকবার পুরস্কার পেয়েছেন। বলছিলেন, ‘মা সময় পেলেই ছোট থেকেই আমাকে গল্পের বই পড়ে শোনাতেন, যে চর্চাটা আমার এখনো রয়ে গেছে।’ সৈয়দা শারমীন চাইতেন তাসনিয়া ফারিণের ভেতরে মানুষ হিসেবে ভালো সব গুণ থাকুক।
‘আমার আর রেজওয়ানের সম্পর্কটা মায়ের কাছে কীভাবে বলব, তা নিয়েও বেশ দ্বিধান্বিত ছিলাম। মনে হতো মা কখনোই মেনে নেবেন না। একদিন ঘুরতে যাচ্ছি, এমন সময় তেল নিতে পেট্রলপাম্পে দাঁড়াল গাড়ি। মা তখন নিজে থেকে হঠাৎ বললেন, “তুমি যে একটা ছেলের সঙ্গে কথা বলো, তা আমি জানি। আমার কাছে লুকানোর কিছু নেই। ছেলেটাকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ো।”
আমার প্রতি মায়ের আস্থা আর বিশ্বাস দেখে সেদিন অবাক হয়েছিলাম। এখন তো অনেক বড় হয়েছি, মায়ের সেই কড়া শাসনও আর নেই, যা ইচ্ছা তা–ই করতে পারি। তবে মা যে শৃঙ্খলার বীজ আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, সেখান থেকে বের হতে পারিনি। শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন, সময়মতো খাওয়াদাওয়া, বইপড়া, মোবাইল ফোনে কম সময় কাটানো—এই নিয়মানুবর্তিতাগুলো আমাকে এখন একটি সুন্দর জীবনযাপনে সাহায্য করেছে,’ মাকে জড়িয়ে ধরে এমনটাই বললেন ফারিণ।