আইইউবির তাওসিফকে কেন দেওয়া হলো ‘অলরাউন্ডার স্বর্ণপদক’

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ২৬তম সমাবর্তনে ‘অলরাউন্ডার স্বর্ণপদক’ পেয়েছেন আহমদ তাওসিফছবি: তাওসিফের সৌজন্যে

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) ২৬তম সমাবর্তনে ‘অলরাউন্ডার স্বর্ণপদক’ পেয়েছেন আহমদ তাওসিফ। গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বিভাগ থেকে ৩ দশমিক ৮৮ সিজিপিএ নিয়ে যিনি স্নাতক শেষ করেছেন, স্বর্ণপদক তিনি পেতেই পারেন। কিন্তু ‘অলরাউন্ডার’ কেন? লেখার শেষ অনুচ্ছেদে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আপনার জানা হয়ে যাবে।

কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দেননি

ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে তাওসিফ যখন উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন, তখন করোনাকাল। সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা। কোথায় ভর্তি হবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে বিতর্ক। ছেলেবেলা থেকেই কুইজ, বিতর্কসহ নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাওসিফ। বাংলা বিতর্ক দিয়ে শুরু। কলেজে ওঠার পর ইংরেজি বিতর্কে ঝুঁকে পড়েন। ২০২০ সালের ওয়ার্ল্ড স্কুলস ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে (ডব্লিউএসডিসি) বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন। সেসময় বাংলাদেশ টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতাতেও চ্যাম্পিয়ন হন। এসবের সুবাদে আইইউবি থেকে বৃত্তি মেলে, ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও সহজ হয়ে যায়। তাওসিফ বলেন, ‘কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দিইনি। আইইউবি থেকে ফুল ফ্রি স্কলারশিপের অফার পেয়ে ভর্তি হয়ে যাই। কনফিডেন্ট ছিলাম যে এটা আমার জন্য ভালো হবে।’

কিন্তু পড়ার বিষয় হিসেবে ‘গ্লোবাল স্টাডিজ’কেন বেছে নিলেন? তাওসিফের উত্তর, ‘বিষয় হিসেবে এটা ইউনিক (অনন্য)। অনেক কিছু পড়া যায়। আমরা যেমন যুদ্ধ নিয়ে পড়েছি, পরিবেশ নিয়েও পড়েছি। আবার সরকারের পলিসি (নীতি) নিয়ে পড়েছি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়েও পড়েছি। আর এই বিষয়ে গবেষণার সুযোগ অনেক বেশি।’

তাওসিফের দুটি একাডেমিক প্রকাশনা আছে। একটি জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক, যেটা কিউ ১ মানের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। অপরটির বিষয় জলবায়ু। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন এই তরুণ। এখন পর্যন্ত গুগল স্কলারে তাঁর সাইটেশনের সংখ্যা ৩৬।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল ‘ওপেন ক্রেডিট’পদ্ধতি। তাওসিফ চার বছরের স্নাতক শেষ করেন তিন বছরে। স্নাতক চলাকালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট অ্যান্টোনিজ কলেজে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি পেশাদার কোর্সও করেছেন। এটির জন্য ফুল ফান্ডিং (পূর্ণ তহবিল) পেয়েছিলেন তিনি। উচ্চমাধ্যমিকের পর তুরস্ক সরকারের বৃত্তিও পেয়েছিলেন। তবে পরিবার ও দেশের টানে সেবার যাওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন

অলরাউন্ডার

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফল বরাবরই ভালো ছিল। বিতর্ক তো করতেনই, এবার শুরু করেন লেখালেখি। দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে বেশ কয়েকটি নিবন্ধ লিখেছেন। বেশির ভাগই শাসনব্যবস্থা-সম্পর্কিত মতামত কলাম। এর মধ্যে ইভেন্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে ইউনূস সেন্টারেও কাজ করেছিলেন এক বছর।

২০২৪ সালে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপস (ডব্লিউইউডিসি)। সেই প্রতিযোগিতায় তাওসিফ ইএসএল (ইংলিশ অ্যাজ আ সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ) বিভাগে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন। হারিয়েছিলেন প্রিন্সটন, কলাম্বিয়ার মতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা দলগুলো।

বিতর্ক করার পাশাপাশি বিতর্ক শেখাতেও শুরু করেন তিনি। মাস্টারমাইন্ড, স্কলাস্টিকা, সেন্ট জোসেফ এবং ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের বিতর্ক দলের কোচ ছিলেন। বিতর্ক শিখিয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মরক্কো জাতীয় দলের কোচ। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং হংকংয়ের বিভিন্ন একাডেমিতে তিনি বিতর্ক শিখিয়েছেন।

অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকসে আয়োজিত আন্তর্জাতিক আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন আহমদ তাওসিফ। এশিয়ান ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডিবেট (এবিপি), ইউনাইটেড এশিয়ান ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (ইউএডিসি) ও এশিয়ান স্কুলস ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপের (এএসডিসি) প্রধান বিচারক পর্ষদেও ছিলেন তিনি।

চূড়ায় ওঠার নেশা

তাওসিফের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। বাবা সরকারি কর্মকর্তা। শৈশবে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে বন্ধুদের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলার স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল। পরিবারে মা-বাবা ছাড়াও আছেন ভাই ও ভাবী। ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ঘুরতে ভালোবাসেন তাওসিফ। পেশা হিসেবে কী পছন্দ, এমন প্রশ্নে সরাসরি উত্তর দিলেন না। তবে ইচ্ছার কথা জানালেন। তাওসিফের ভাষায়, ‘ম্যাটেরিয়ালিস্টিক (বৈষয়িক) কোনো ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার ইচ্ছা আমার নাই। আমি ভিন্ন ভিন্ন কালচার (সংস্কৃতি) দেখতে চাই, ভিন্ন ভিন্ন কালচারের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই। পৃথিবীটা অনেক বড়। আমি এটাকে আবিষ্কার করতে চাই।’

স্কটল্যান্ডে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গিয়ে প্রথমবারের মতো একা পাহাড়ে উঠেছিলেন। সেখান থেকেই চূড়ায় ওঠার নেশা। পরে ভিয়েতনাম, আলবেনিয়া, মন্টেনিগ্রো, নর্থ ম্যাসেডোনিয়া, হংকং, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডের বিভিন্ন উঁচু জায়গায় আরোহণ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু ছিল পানামার ভোলকান বারু। প্রায় সাড়ে ১১ হাজার ফুট। কথায় কথায় শোনালেন সারা রাত ধরে ভোলকান বারুতে ওঠার অভিজ্ঞতা, ‘এটা এমন একটা পয়েন্ট, যেখান থেকে একই সঙ্গে প্যাসিফিক মহাসাগর আর ক্যারিবিয়ান সাগর দেখা যায়। সূর্যোদয়ের সময়ে একই সঙ্গে বিশাল পাহাড় আর সমুদ্র মিলিয়ে দেখা, এটা আমার জন্য খুব রোমাঞ্চকর ছিল।’

ভিয়েতনামের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ফানসিপানে ওঠাও তাঁর জন্য একটু বিশেষ। সাধারণত দুই দিন লাগলেও প্রায় ১০ হাজার ফুটের এ পর্বতে তিনি উঠেছিলেন মাত্র একদিনে। তাওসিফ বলেন, ‘নিজেকে আর সৃষ্টিকর্তার সৌন্দর্যকে আবিষ্কার করার মধ্যে এক ভিন্ন রকম আনন্দ পাই।’

আরও পড়ুন