সাধের সবজি, স্বাদের সবজি

এই ২০২০ সালের করোনাকালীন লকডাউনে আমরা সবচেয়ে বেশি খেয়েছি সবজি। অবশ্য সবসময় সবজি খাওয়া হয়। তবে, এবার সবজি খাওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে নয়। এতো বেশি সবজি বিভিন্ন দিক থেকে বাসায় এসেছে, কারো কাছে কোনো দিকে বিলোতে না পেরে সব নিজেরাই খেয়েছি। এবার বেশি পরিমাণে ছিলো কচু জাতীয় সবজি।

সারা জীবনেও যতোটুকু খাইনি তার সবই খাওয়া হয়েছে গত ৫ মাসে। কচুর লতি, কচুর ডগা, কচুর মুখি, কচুর ফুল, কচু শাক। বিভিন্ন রকমের, বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন ধাঁচের রান্না করে করে স্বাদ বদলিয়ে খাওয়া হয়েছে এসব সবজি।

বিজ্ঞাপন

গতকাল দরজা খুলেই দেখি অনেক বড় একটা বস্তা। ভেতরে বেশ কয়েকটা নারকেল, কচুশাক, টক পাতা আর লতি— আবারো এসেছে উপহার হিসেবে। একেবারে তাজা। শাকগুলো এতোই সজীব, এতোই সবুজ, এতোই কোমল, এতোটাই সুন্দর যে মনে হচ্ছিল তখনই রান্না করি। লতিগুলো বেশ সরু আর লম্বা লম্বা। এগুলো কাটতে অনেক কষ্ট হয়ে যাবে নিশ্চিত। তারপরও এসব দেখে মনে রাগ আসে না, আনন্দ জাগে।

রান্নার প্রস্তুতি হলো। আজ কচু শাক রান্না হবে, কচুর লতিও। আম্মু বললেন, কয়েকটা হলুদের ডগা হলে বেশ ভাল হতো। হলুদের ডগা অর্থাৎ হলুদ গাছের মাঝখানে সবচেয়ে যে চিকন পেঁচানো কচিপাতা হয়, সেটা। এই সরু সরু লতিগুলো চিংড়ি মাছ, টক পাতা দিয়ে রান্না করে কয়েকটা হলুদের পাতা ছিটিয়ে দিলে এতো দারুন সুগন্ধ হয়, যা খেতে অমৃতের মতো মনে হয়।

default-image

চিন্তা করলাম কী করা যায়! আমাদের ‘ভেজিটেবল শাহিন’কে ফোন করলাম, সে খুব আফসোসের সুরে বললো, বরিশাল গেছে! তারপরও হাল ছাড়লাম না। দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে ফোন করলাম আরেকজন সহযোগীকে। তাকে কিছু আনতে বলা হলে পৃথিবীর যে প্রান্তে যাই থাকুক না কেনো, আমাদের জন্য নিয়ে আসবেনই। ফোনে তাকে বুঝিয়ে বললাম। তিনি ঘণ্টাখানিক পর হন্তদন্ত হয়ে ফিরে আসলেন— বিশাল বড় এক প্যাকেট কচুর ফুল নিয়ে।

কচুর ওপর কচু, আশেপাশে কচু, তার ওপরে আরো কচু! হাসবো নাকি কাঁদব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। করোনাকাল শুরু হওয়ার পর যেখান থেকে যাই আসুক, যে যাকিছু আনুক সবকিছু ওপরে আমাদের বাসায় আসে বাসার নিরাপত্তা কর্মীর মাধ্যমে। অন্যদেরকে নিশ্চিত করতে হয় ফোনে। আমি যখন আমাদের সেই সহযোগীকে বললাম— কচুর ফুল আনতে বলি নাই, হলুদের ডগার কথা বলেছি; আপনি বুঝতে পারেন নাই কেনো! তখন তিনি, অত্যন্ত করুন সুরে আমাকে বললেন, আমাকে আর কিছুক্ষণ সময় দেন ম্যাডাম, আমি এখনই নিয়ে আসবো।

রান্নার প্রস্তুতি হলো। আজ কচু শাক রান্না হবে, কচুর লতিও। আম্মু বললেন, কয়েকটা হলুদের ডগা হলে বেশ ভাল হতো। হলুদের ডগা অর্থাৎ হলুদ গাছের মাঝখানে সবচেয়ে যে চিকন পেঁচানো কচিপাতা হয়, সেটা। এই সরু সরু লতিগুলো চিংড়ি মাছ, টক পাতা দিয়ে রান্না করে কয়েকটা হলুদের পাতা ছিটিয়ে দিলে এতো দারুন সুগন্ধ হয়, যা খেতে অমৃতের মতো মনে হয়।

বললাম, আর কষ্ট করতে হবে না, রান্না হয়ে গেছে। খাওয়ার সময় এখন। আপনি চিন্তা করবেন না, বাসায় চলে যান। তার চলে যাওয়া দেখার জন্য ব্যালকনিতে আসলাম, আমি আর আম্মু। দুই দফায় চেষ্টা করে হলুদের ডগা না পেয়ে আফসোস করতে করতেই চোখ পরলো সামনের বাসার ফুলবাগানে। আম্মু বললেন ওগুলো হলুদের গাছ, আমি বললাম, ‘মনে হয় না’। কারণ ওগুলোর আশেপাশে সব দোলনচাঁপা আর হোয়াইট লিলি ফুলের গাছ।

অনেক ওপরে থেকে দেখছিলাম, তারপরও আম্মু বললেন, আমি শিওর, এগুলো হলুদ গাছ। আমাদের বাসার নিরাপত্তাকর্মীকে বলে সামনের বাসায় পাঠালাম, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি হলুদ গাছের সবচেয়ে কচিপাতাটা নিয়ে আসলেন। যদিও আমরা পেঁচানো পাতা যেটা চেয়েছিলাম, সেটা নয়, তারপরেও সুগন্ধীতে ভরপুর। আমরা হাল ছাড়িনি, শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দুইজনকে ফোন করে দুই ঘণ্টার চেষ্টায় যেটা হয়নি, একটু চোখ খুলেই দুই মিনিটের চেষ্টায় তা হয়ে গেছে। রান্নার একেবারে শেষ পর্যায়ে যখনই পাতাটার প্রয়োজন তখনই সেটা পেয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যে খাওয়াও শেষ। করোনাকালের আশীর্বাদ; যখনি যা চাই তা পাই।

তবে শিক্ষণীয় বিষয় হলো রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত কবিতাটি,

বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে

বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে,

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু,

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,

একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু ।

যে দুটি রান্না করেছিলাম, সে দুটি রান্নার প্রণালি আপনাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিলাম।

কচু শাক

default-image

কচু শাকগুলো ভালো করে ধুয়ে মাঝারি আকারে করে কেটে নিতে হবে। চিকন জিরে তাওয়ায় টেলে গুঁড়ো করে নিতে হবে। বেশি করে রসুনের কোয়া, হলুদের গুঁড়ো, লবণ, মসলা গুঁড়ো, কাঁচা মরিচ, আমসি (এটা দিলে টেস্ট বাড়বে, না হলেও সমস্যা নেই), শুকনো পেলন বিচি (এটা এক ধরনের ডাল)। এইসব উপকরণ একসঙ্গে দিয়ে খুবই সামান্য পরিমাণ পানি দিয়ে প্রেসার কুকারে তিন শিস দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রেসার কুকার থেকে গ্যাস বের করে দিতে হবে। তাতে রং থাকবে একেবারে সবুজ। ডাল ঘুঁটনি দিয়ে একটু ঘুঁটে নিলেই পেস্ট জাতীয় হয়ে যাবে। চুলায় অন্য একটি পাত্রে সামান্য তেল গরম করে তাতে আবারো বেশি করে রসুনের কোয়া দিয়ে বাগার দিতে হবে (বেশি করে রসুন দিতে বলার কারণ, অনেক সময় কচুতে গলা ধরে, রসুনের কোয়া বেশি হলে গলা ধরার কোনো সম্ভাবনা থাকে না)। ফুটে উঠলেই নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করা যায়। শুকনা মরিচ টেলে নিলে মচমচে ভাব হয়। অনেকে শুকনা মরিচ দিয়ে খেতে পছন্দ করেন।

কচুর লতি

default-image

চিকন কচুর লতিগুলো পরিষ্কার করা বেশ ঝামেলাপূর্ণ। তারপরেও খেতে চাইলে কিছু লতি পরিস্কার করে নিয়ে ছোট আকারে টুকরা করে নিতে হবে। চুলায় তেল দিয়ে তাতে কিছু রসুনের কোয়া হালকা করে ভেজে তারপর হলুদের গুঁড়ো, লবণ, কাঁচা মরিচ, চিংড়ি মাছ, টমেটো কুচি একসঙ্গে কিছুক্ষণ ভেজে নিন। তাতে কচুর লতিগুলো ঢেলে দিয়ে চুলার আঁচ কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে। দুই একবার নেড়ে চেড়ে সামান্য পরিমাণ পানি দিতে হবে। টক পাতা থাকলে কুচি করে কয়েকটা দেওয়া যায়, না হলেও সমস্যা নেই। কচুর লতি নরম হয়ে আসলে তার ওপর হলুদের পাতা কুচি করে ছিটিয়ে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে দিতে হবে। হলুদের পাতার সুঘ্রাণ আপনা-আপনিই লতির মাঝে ছড়িয়ে যাবে। গরম গরম কচুর লতির সঙ্গে লেবু কেটে দিয়ে পরিবেশন করা যায়।

বিজ্ঞাপন
রসনা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন