অর্গানিক ফাংশনাল ফুড সুস্থ থাকার জন্য কতটা জরুরি?

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খুরশীদ জাহান বলেন, ‘অর্গানিক শব্দটি সারা বিশ্বেই এখন বেশ আলোচিত। বাংলাদেশেও অর্গানিক খাবারের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। অর্গানিক ফুড এমন খাবার, যা কোনো ধরনের রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ছাড়া শতভাগ প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদন করা হয় এবং এর রক্ষণাবেক্ষণেও কোনো ধরনের কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করা হয় না। পরিবেশবান্ধব এই উৎপাদনব্যবস্থা মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি দূষণ রোধ করে বলে এখন সারা বিশ্বেই এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে আমাদের দেশে খাবারের মধ্যে যেসব রাসায়নিক মেশানো হয়, তাতে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্গানিক খাবার গ্রহণের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি বিষাক্ত কোনো কিছু আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে না।’

বিশ্বব্যাপী খাদ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হয়ে পড়ে। ব্রঙ্কাইটিসসহ শ্বাসযন্ত্রে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। অনেকেই কিডনি ও লিভারের রোগে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ক্ষেত্রে অর্গানিক ফুড এমন প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করা হয়, যেখানে মানবসৃষ্ট সার ও কীটনাশক, ফুড এডিটিভস, বৃদ্ধিনিয়ন্ত্রক, ইরেডিয়েশন, জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিএমও) পদ্ধতিতে বা এর মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করা হয় না।
অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেডের সায়েন্টিফিক অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক অরুণ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের দেশে “অর্গানিক” শব্দটি এখন খুব ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সব ক্ষেত্রে খাবার বা পণ্যের মান যাচাই করে এই শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। শতভাগ খাঁটি অর্গানিক পণ্যের কিছু গুণ থাকে। যেমন ইউএসডিএ, ইইউ এবং জ্যাস সনদ থাকতে হয়। অর্গানিক ফুড বা পণ্য কেনার আগে এসব বিষয় মাথায় রাখতে হবে।’

অরুণ কুমার মণ্ডল আরও বলেন, ‘ফাংশনাল ফুডের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এতে বায়ো-অ্যাকটিভ উপাদান থাকতেই হবে। ফাংশনাল ফুড বিশেষ ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় বায়ো-কেমিক্যাল প্রসেসে স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এই বায়ো-অ্যাকটিভ উপাদানগুলো নন-টক্সিক হতে হবে। ফাংশনাল ফুড যে নিরাপদ ও কার্যকর, তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকতে হবে। এই খাবারগুলোর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে না।’

ফাংশনাল ফুড ১৯৯১ সালে জাপানে প্রথম স্বীকৃতি পায়। ফুড উইথ স্পেসিফায়েড হেলথ ইউজ (এফওএসএইচইউ) এই স্বীকৃতি দেয়। ২০১৫ সালে এটি ফুড উইথ ফাংশন ক্লেইমস (এফএফসি) হিসেবে নতুন ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৬ সালে ভারতের পার্লামেন্টে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড-সংক্রান্ত যে আইন পাস হয়, সেটির আওতাধীন ফাংশনাল ফুড ও এ-জাতীয় খাদ্যপণ্যের জন্য ২০১৬ সালে ভারতে ‘দ্য ফুড সেফটি স্ট্যান্ডার্ড রেগুলেশনস’ পাস হয়। এর কার্যকারিতা শুরু হয় ২০১৮ সাল থেকে। বাংলাদেশেও ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘সেফ ফুড অ্যাক্ট ২০১৩’ পাস করা হয়েছে। এর ৩১ নম্বর ধারায় ফাংশনাল ফুডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে সুস্থ এবং নীরোগ থাকার জন্য এই খাদ্যের ব্যাপারে মানুষের ধারণা ও আগ্রহ বাড়ছে। বাণিজ্যিকভাবেও এই খাবার জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

২০১৫ সালে ফাংশনাল ফুডের বিশ্ববাজার ছিল ১২৯ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চ অনুসারে, ২০১৮ সালে এশিয়া প্যাসিফিক ফাংশনাল ফুড মার্কেটের রেভিনিউ ছিল ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। এটি ২০২৪ সাল নাগাদ ১০০ বিলিয়নের কাছাকাছি যাবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী ফাংশনাল ফুডের বাজার ছিল ১৭০ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২২ থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আর ২০২৬ সালের মধ্যে ২৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ খুব বেশি দিন হয়নি ফাংশনাল ফুড নিয়ে কাজ করছে। তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে, অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেড (ওএনএল) ফাংশনাল ফুড নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেডই বাংলাদেশের প্রথম সার্টিফায়েড অর্গানিক ফুড প্রডিউসার হিসেবে কাজ করছে। কারকুমার মোড়কে অর্গানিক ফাংশনাল ফুডের কয়েকটি পণ্য বাজারে এনেছে অর্গানিক নিউট্রিশন লিমিটেড। বাংলাদেশে এ ধরনের খাবার নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা তৈরিতে ইতিবাচক সাড়াও ফেলছে। এই সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পাবে সুস্থ শরীর ও প্রশান্ত মনের নাগরিক।