তিথিডোর যে কারণে মোহাম্মদপুরবাসীর কাছে জনপ্রিয়

মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে বেশ নজর কেড়েছে তিথিডোর ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট
ছবি: সুমন ইউসুফ

কোনো টেবিলে বসে স্কুলফেরত কিশোর-কিশোরী খাচ্ছে ছোলে বাটুরে। কোনো টেবিলে দম বিরিয়ানি খাওয়ার ফাঁকে পরিবারের সবার মধ্যমণি হয়ে উকুলেলে বাজিয়ে মগ্ন হয়ে গান গাইছে কেউ।

আবার কোনো টেবিলে ছোট্ট গোলাপ, চিঠি আর এক কাপ লাতে হাতে নিয়ে বই পড়তে পড়তে কারও জন্য অপেক্ষা করছে কোনো তরুণী। আর তাদের ঘিরে আলো ছড়াচ্ছে লাল-নীল, হলুদ-সবুজ বাতি।

তিথিডোরে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মায়াবী আলো-আঁধারির এই খেলা চলে।

আরও পড়ুন
তিথিডোরে দেয়াললিখন
ছবি: সুমন ইউসুফ

কফি শপ বা রেস্টুরেন্ট পরিচয়ের বাইরে এটি বুক ক্যাফেও। হয়তো এ কারণেই দুই বছরেই মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে বেশ নজর কেড়েছে তিথিডোর ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট।

অনেকে মিউজিক্যাল ক্যাফেও বলে থাকেন। আরেক কারণেও জনপ্রিয় তিথিডোর—এই রেস্তোরাঁয় অন্দরসজ্জায় আছে আশি ও নব্বই দশকের শহরতলির আবহ।

তিথিডোর শব্দটার অর্থ করা যায় ‘সময়ের বন্ধন’। এই নামে বুদ্ধদেব বসুর একটি উপন্যাসও আছে। তবে বুদ্ধদেব বসুর বই বা অর্থ নয়, তিথিডোর উচ্চারণ করতে মজা লাগে, তাই এই নাম—বলছিলেন ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্টটির স্বত্বাধিকারী ও ব্যবস্থাপক অনল রায়হান। তিনি ব্যবসায়ী নন। ব্যবসা করার কোনো ইচ্ছাও তাঁর ছিল না।

এখানে পড়তে পারেন আবার বাড়িতেও কোনো ফি ছাড়াই বই নিয়ে যেতে পারেন
ছবি: সুমন ইউসুফ

তাহলে কোন তাড়নায় এমন একটা বুক ক্যাফে গড়ে তুললেন?

অনল রায়হান বলেন, ‘আমি কফি প্লেস খুব পছন্দ করি। খুব ইচ্ছা ছিল একটা কফিশপে চাকরি করব। টেবিলে টেবিলে যাব। কাস্টমারদের কফি দেব। হেসে বলব, হ্যালো। গুড ইভিনিং স্যার! কখনো, সুপ্রভাত মেম! লাটে না ক্যাপাচিনো? একদিন দেখলাম, এই জায়গায় কফিশপের জন্য একটা গ্যারেজ ভাড়া দেওয়া হবে। তারপর আর খুব বেশি ভাবিনি।’

ক্যাফে চালানোর কাজটাকে উপভোগ করেন অনল রায়হান। তিনি ও তাঁর কাছের কিছু মানুষ মিলে ঠিক করেন মেনু। তিনি বলেন, ‘আমি চাকরি করেছি মিডিয়া, এনজিও, অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সি ও টেক্সটাইলে। ক্যাফের কাজটা একদম ভিন্ন। নতুন অভিজ্ঞতা। ভালো লাগছে এ কারণেই। সবচেয়ে সুখকর হলো, বিভিন্ন চেহারা, মানসিকতা আর চরিত্রের মানুষ দেখা।’

আরও পড়ুন
তিথিডোর প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে
ছবি: সুমন ইউসুফ

জানা গেল, কাস্টমাররা কখনো কখনো তাঁর জন্য এটা-সেটা খাবার নিয়ে আসেন। বিব্রতকর কিন্তু মধুর একটা অনুভূতি। একবার একটা রহস্যজনক প্যাকেজ এল। ফুলের বুকে, জহির রায়হানের একটা বই আর কাঠের ওপর খুব সুন্দর কাজ করে লেখা ‘তিথিডোর’। সঙ্গে একটা উইশিং কার্ড। কিন্তু প্রেরকের নাম নেই। পরে জানা গেল, তিনি তিথিডোরের একজন কাস্টমার।

তিথিডোরের একটা বিষয় একেবারে মৌলিক। সেটা হচ্ছে, দেয়াললিখন। এই দুই বছরে কত মানুষের কত রকম কথা যে দেয়ালে লেখা হয়ে আছে! প্রেম, বিরহ থেকে শুরু করে খেলা, রাজনীতি, ফিলোসফি, কার্টুন—সবকিছু আছে তিথিডোরের দেয়ালে। পুরো ক্যাফের ডিজাইনটা অনল রায়হানেরই করা। এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে তাঁকে রাত-দিন এক করতে হয়নি। মনে যা এসেছে, তা-ই করেছেন।

রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জায় আছে আশি ও নব্বই দশকের শহরতলির আবহ
ছবি: সুমন ইউসুফ

অনল রায়হান বলেন, ‘তিথিডোর অত্যন্ত সাধারণ একটা ক্যাফে অ্যান্ড কিচেন। আমাদের চেয়ে বহু ভালো রেস্টুরেন্ট এ শহরে আছে। আমাদের বইয়ের ছোট একটা লাইব্রেরি আছে। মানুষ এখানে পড়তে পারেন। বাড়িতেও বই নিয়ে যেতে পারেন।

কোনো ফি লাগে না। কিন্তু “বুক ক্যাফে” কনসেপ্টটা তো আর এখন নতুন কিছু নয়। সুতরাং তিথিডোরের বাড়তি কোনো আকর্ষণ নেই। তারপরও ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে এই মোহাম্মদপুরে, তিথিডোরে যে কাস্টমাররা নিয়মিত আসেন, আমি তার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞ।’

তিথিডোরকে পরিবেশবান্ধব ক্যাফে হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা আছে। সম্পূর্ণ নিরামিষাশী। সবজি সব নিজেদের খামার থেকে আসবে, কোনো বিদেশি সবজি ব্যবহার করা হবে না।

সুন্দরবন বা বান্দরবানের প্রত্যন্ত জায়গায় স্থানীয় উদ্যোগে হবে ছোট ছোট তিথিডোর। মেনুতে থাকবে স্থানীয় খাবার। ঢাকা থেকে কিছু যাবে না বই ছাড়া। একসময় আন্তর্জাতিক পরিসরে তিথিডোর কাজ শুরু করবে বলে স্বপ্ন দেখেন অনল রায়হান।

আরও পড়ুন