শুধু মেয়েদের জন্য কেন সাপার ক্লাব করলেন মার্সী ত্রিপুরা, তাঁর ডাইনিংয়ে খেতে হলে কী করতে হবে
সাপার ক্লাব মূলত এমন একধরনের ডাইনিং, যেখানে খাবারকে কেন্দ্র করে গল্প, আড্ডা ও নতুন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুযোগ হয়। এখানে সীমিত অতিথি থাকে এবং উদ্যোক্তাদের নির্বাচিত মেনুকে ঘিরে তৈরি হয় এক নতুন অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি সাপার ক্লাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনায় এসেছে টেবিল ফর হার। এর উদ্যোক্তা মার্সী ত্রিপুরা।
বাইরে খেতে যাওয়া মানেই রেস্তোরাঁয় গিয়ে পছন্দের খাবার খাওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের সংস্কৃতি নিয়ে গড়ে উঠছে নিত্যনতুন উদ্যোগ। বর্তমান সময়ে তেমনই এক জনপ্রিয় ধারা সাপার ক্লাব।
সেখানে শুধু কী খাচ্ছেন, তা নয়; কোথায়, কার সঙ্গে এবং কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাপার ক্লাব মূলত এমন একধরনের ডাইনিং, যেখানে খাবারকে কেন্দ্র করে গল্প, আড্ডা ও নতুন মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুযোগ মেলে।
এখানে গিয়ে হাজির হলেই খাবার পাওয়া যায় না; বরং আগে থেকে বুকিং দিতে হয়। আপনাকে জানানো নির্দিষ্ট সময়ে যেতে হবে। সেখানে সীমিত অতিথি এবং রেস্তোরাঁ দ্বারা পরিকল্পিত মেনুকে ঘিরে তৈরি হয় এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
খাবারের চেয়েও বেশি কিছু
সম্প্রতি সাপার ক্লাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনায় এসেছে টেবিল ফর হার। এর উদ্যোক্তা মার্সী ত্রিপুরা। রান্না করতে তাঁর বরাবরই ভালো লাগত। ঢাকায় পড়াশোনা করতে এসে হোস্টেলে থাকার সময় বাধ্য হয়েই রান্না শেখেন তিনি।
রান্নার পাশাপাশি খাওয়াতে ভালোবাসেন মার্সী। ২০২২ সালে কানাডায় চলে যান। এ সময়ের মধ্যে রান্না নিয়ে ব্লগ করতেন। ২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে দেশে ফিরে আসেন।
মার্সী বলেন, ‘তখন বন্ধুরা অনেকে বলতেন, আমি যেহেতু ভালো রান্না করি, তাহলে রান্না নিয়ে কিছু করতে পারি। কানাডায় থাকার সময় দেখতাম, মেয়েদের অনেক কমিউনিটি ক্লাব আছে। তখন মনে হলো, এমন কিছু তো আমি করতে পারি, যেখানে একই টেবিলে বসে শুধু নিজেদের মনের কথা বলতে বলতে অপরিচিত মানুষগুলো হয়ে উঠবেন পরিচিত। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে চলবে গল্প, আড্ডা আর বন্ধুত্ব।’
মার্সীর এক বন্ধুর ধারণা ছিল, শুধু মেয়েদের নিয়ে সাপার ক্লাবের প্রতি কেউ উৎসাহী হবেন না। তবে ঘটনাটা উল্টো হলো।
এ বিষয়ে মার্সী জানালেন, ‘প্রথম আমার কুকিং ভিডিওতে বিষয়টি ঘোষণা দিয়ে ফরম লিংক দিলে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এক হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে।’
মার্সীর সঙ্গে এই সাপার ক্লাব টিমে আরও আছেন থাংশ্রী দাংগ, পপি চাকমা, ভিক্টোরিয়া চাকমা। তাঁদের সাপার ক্লাবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর অন্তরঙ্গ পরিবেশ।
এখানে আটজনের একটি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই অতিথিদের নির্বাচনটা মার্সী নিজেই করেন।
সাপার ক্লাবের তারিখ ঘোষণা দিয়ে তাঁরা ভিডিওতে থাকা লিংকে অতিথিদের একটি ফরম পূরণ করতে বলেন, যে ফরম পূরণ করে অতিথিরা তাঁদের নির্ধারিত মেইলে পাঠান।
এরপর অনেক যাচাই–বাছাই করে আটজনকে সাপার ক্লাবের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তখন জানিয়ে দেওয়া হয় জনপ্রতি খাবারের দাম। সাধারণত চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় সাপার ক্লাবের জন্য নির্ধারিত থাকে।
এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে মার্সী বলেন, ‘মানুষের জীবনে এখন মন খুলে কথা বলার সুযোগ কম। আমরা চাই, টেবিল ফর হারে এসে সবাই যেন তাঁদের মধ্যে মন খুলে কথা বলতে পারেন। কোনো একজনের নেতিবাচক মন্তব্য যেন আরেকজনকে আঘাত না করে। এ জন্য অনেক সতর্কতার সঙ্গে আমরা অতিথি নির্বাচন করে থাকি, যাতে করে এখান থেকে সবাই মানসিক প্রশান্তি নিয়ে ঘরে ফেরেন।’
মেনুতেও থাকে চমক
এখানে কখনো পাহাড়ি খাবার, কখনো থাই, ভিয়েতনামের খাবার পরিবেশন করা হয়। সাপার ক্লাবে সাধারণত যিনি এর উদ্যোক্তা, তাঁর তত্ত্বাবধানে মেনু নির্বাচিত হয়ে থাকে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অতিথিরা আগে থেকে মেনু জানতে পারেন না। বিভিন্ন কোর্সে খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবার পরিবেশনের সময় প্রতিটি খাবারের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বর্ণনা দেওয়া হয় অতিথিদের কাছে।
কী উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, খাবারটির উৎস কোথায়; যদি ফিউশন করা হয়, তার বর্ণনাও সাপার ক্লাবে থাকে। এ জায়গাতেই অন্যান্য রেস্তোরাঁর সঙ্গে সাপার ক্লাবের পার্থক্য। সাপার ক্লাবের খাবার শুধু পেট ভরানোর কারণ হয়ে ওঠে না, হয়ে ওঠে গল্প বলার একটি মাধ্যম।
টেবিল থেকে তৈরি হয় সম্পর্ক
ডিজিটাল যোগাযোগের এই সময়ে মুখোমুখি কথা বলার মূল্য যেন অনেক বেশি। এ জন্য বাড়ছে সাপার ক্লাবগুলোর জনপ্রিয়তা। ঢাকায় এখন গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি সাপার ক্লাব। দা সাপার পেয়ার, সুমাইয়া খান সাপার এই সময়ের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়।
তবে একেকটি সাপার ক্লাবের রয়েছে একেক রকম রীতি। সময়, খাবারের মেনু ও মূল্যটাও তখন আলাদা হয়ে থাকে। খাবারের পরিবেশনায়ও দেখা যায় ভিন্নতা। একই টেবিলে বসে ভিন্ন পেশা, বয়স ও অভিজ্ঞতার মানুষ নিজেদের গল্প ভাগ করে নেন।
অনেকের সঙ্গেই হয়তো প্রথম দেখা, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মনের অনুভূতির আদান-প্রদানের কারণে একধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে কোনো কোনো সাপার ক্লাবে চাইলে বন্ধুরা কিংবা পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে যেতে পারবেন।
সাপার ক্লাবে ফোনের স্ক্রিনের বাইরে বসে একসঙ্গে খাওয়া, কথা বলা এবং সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা মানুষকে আবারও টেবিলকেন্দ্রিক পারিবারিক সামাজিকতার দিকে ফিরিয়ে আনছে।
সাপার ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য
সাপার ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য হলো, শুধু খাবার নয়, একটি রাতকে স্মরণীয় করে তোলা। ঘরোয়া পরিবেশ, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, খাবারের গল্প এবং ভিন্নধর্মী একটি অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে সাপার ক্লাব আধুনিক নগরজীবনে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছে। সাপার ক্লাবের খাবার টেবিলটি কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন কয়েকজন মানুষের জীবনের গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। হোক না তাঁরা অপরিচিত!