চট্টগ্রামের যে রেস্তোরাঁয় পাবেন মেজবানি স্বাদ

ধোঁয়া উঠছে। বড় হাঁড়ির ভেতর টগবগ করে ফুটছে গরুর মাংস। রং লালচে, কোথাও কালচে। ওপরে ঘন ঝোল। চিকচিক করছে তেলের স্তর। তার ভেতর থেকে ভেসে আসছে মরিচ, জিরা আর ধনিয়ার গাঢ় ঘ্রাণ। সেই গন্ধে দূর থেকেই বোঝা যায়, আজ কোনো বাড়িতে মেজবান আছে। মেজবানের এই স্বাদ একসময় প্রতিদিন পাওয়াটা ছিল কঠিন। কারণ, সাধারণত বিশেষ কোনো উপলক্ষেই তৈরি হতো এসব পদ। তবে বিশেষ সেই খাবারকে সকাল-বিকেল ‘চাহিবামাত্র দিতে বাধ্য থাকিবে’ বানিয়ে ফেলেছে ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’, চট্টগ্রামের সেই রেস্তোরাঁ ঘুরে এলেন সুজয় চৌধুরী

মেজ্জান হাইলে আইয়ুন রেস্তোরাঁয় সাজানো মেজবানি পদছবি: সৌরভ দাশ

মাংসের টুকরাগুলো নরম। হাত বা চামচ ছোঁয়ালেই আলগা হয়ে আসে। ঝোলের প্রতিটি ফোঁটায় মিশে থাকে ধীরে কষানো মসলার গাঢ় স্বাদ। এই স্বাদ শুধু মুখে লাগে না। নাকে লাগে। মনে লাগে। টেনে আনে পুরোনো স্মৃতি। ভেতরে-ভেতরে জাগে উৎসবের অনুভব। চট্টগ্রামের মেজবান এমনই। এক প্লেট ভাত আর মাংসের ভেতর লুকিয়ে আছে শহরের ইতিহাস। মানুষজনের সম্পর্ক। আর আছে এক অদৃশ্য টান, যা মানুষকে বারবার একই টেবিলে ফিরিয়ে আনে।

চট্টগ্রামে কেউ অতিথি হয়ে এলে তাঁকে মেজবান না খাইয়ে বিদায় দেওয়াটা অনেকের কাছেই অসম্পূর্ণ দাওয়াত। এখানে আপ্যায়নের মাপকাঠিই যেন এই খাবার। শুরুতে ইতিহাসের দিকে চোখ রাখা যাক। ‘মেজবান’ শব্দটির শিকড় ফারসিতে। অর্থ, অতিথি আপ্যায়ন। চট্টগ্রামে এসে এটিই হয়ে গেছে ‘মেজ্জান’। এটি একধরনের সামাজিক চর্চা।

কুলখানি, চেহলাম, মৃত্যুবার্ষিকী—এসব আয়োজনে মেজবান প্রায় অপরিহার্য। আবার খুশির অনুষ্ঠানেও এর সমান উপস্থিতি। আকিকা, খতনা, গায়েহলুদ, নতুন ব্যবসা, নতুন বাড়িতে ওঠা—সব জায়গাতেই মেজবানের আয়োজন দেখা যায়। ইতিহাস বলছে, বিশেষ এই ভোজের বয়স কয়েক শ বছর। ধারণা করা হয়, আরব বণিকদের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এর শুরু। সময়ের সঙ্গে এটি বদলেছে। কিন্তু মূল ভাবনা বদলায়নি।

মেজবানের সবচেয়ে বড় শক্তি এর উন্মুক্ততা। এখানে দাওয়াতে কড়াকড়ি নেই। কে পরিচিত, কে নয়—তা–ও বড় বিষয় নয়। যে আসে, সে-ই অতিথি। আমাদের আজকের মেজবানের খোঁজ দেওয়ার আগে একটু ইতিহাসে চোখ বোলানো যাক।

মেজবানের স্বাদ নিতে অনেকেই আসেন মেজ্জান হাইলে আইয়ুন রেস্তোরাঁয়
ছবি: সৌরভ দাশ

পুরোনো দিনের মেজবান

পুরোনো দিনের মেজবান মানেই ছিল শহরের কিছু বনেদি পরিবার। চৌধুরী, খান, মিয়া, ভূঁইয়া—ঘুরেফিরে আসত এমন কিছু নাম। মানুষে ভরে যেত তাদের বাড়ির উঠান। আয়োজনও হতো বিশাল। কিন্তু সেখানে একটা ব্যাপার ছিল সাধারণ—খাবার সবার জন্য।

তখন মেজবানের পাতে দেওয়া হতো নলা বা নেহারির ঝোল, কাঁজি, সুরগা। এখন যেগুলো খুব একটা দেখা যায় না। সঙ্গে থাকত মাষকলাইয়ের ডাল। ভুনা ডাল। লাউ দিয়ে বুটের ডাল। আর অবশ্যই থাকত ঝাল মাংস। গরু, মহিষ বা ছাগল—যা পাওয়া যেত। চর্বি আর হাড় দিয়ে রান্না করা ডাল ছিল আলাদা আকর্ষণ। অনেক জায়গায় মাছের পদও থাকত। তবে সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল মাংস।

ভোর থেকে শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। বড় বড় হাঁড়ি বসানো হতো। নিচে জ্বলত কাঠের আগুন। মাংস ঢালা হতো। একে একে যোগ হতো মসলা। জিরা, ধনে, শুকনা মরিচ, রসুন, পেঁয়াজ। ধীরে ধীরে ফুটতে থাকত সব। কেউ আগুন বাড়াত। কেউ কমাত। কেউ মসলা মেশাত। এই রান্না দেখার মতো ছিল। আর গন্ধ—সেটা তো আলাদা গল্প। একসময় চারপাশে ছড়িয়ে পড়ত সেই গন্ধ। মানুষ বুঝে যেত—আজ বড় আয়োজন।

অনেকেই বলতেন, মেজবানের নিমন্ত্রণ আগে আসে নাকে, পরে মুখে। খাবার পরিবেশনেও ছিল নিজস্বতা। মাটির মালসা ভর্তি করে আনা হতো ঝোল। ডাব্ব মালা (ওড়ং) দিয়ে ঢালা হতো মাংস। মাটির শানকি, কলার পাতা—এসবেই পরিবেশন করা হতো খাবার। অতিথিরা সার বেঁধে বসতেন। কেউ আগে, কেউ পরে—এমন নয়, একসঙ্গে সবাই। একই সারিতে বসে খাওয়ার ভেতরেই ছিল মেজবানের আসল সৌন্দর্য। কে ধনী, কে গরিব—এই পার্থক্য সেখানে থাকত না। খাওয়া শেষে মানুষ উঠে দাঁড়াত। হাত ধুত আর দোয়া করত। এই দোয়াটাই ছিল মেজবানের আসল প্রাপ্তি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদল এসেছে। তবু মেজবান হারিয়ে যায়নি। বরং নতুনভাবে ফিরে এসেছে। এখন রেস্তোরাঁয়ও মেজবানের আয়োজন হচ্ছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় একটি নাম ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’।

নতুন প্রজন্মকে মেজবানের স্বাদ দিতে রেস্তোরাঁটি চালু করেন মনজুরুল হক
ছবি: সৌরভ দাশ

মেজ্জান হাইলে আইয়ুন

চট্টগ্রামের শুলকবহরে ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’-এ ঢুকতেই অন্য রকম এক ব্যস্ততা চোখে পড়ে। দরজা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই নাকে লাগে মেজবানি মাংসের কড়া ঘ্রাণ। এক পাশে সারি সারি টেবিল। পরিবার নিয়ে বসেছেন অনেকে। কেউ প্লেটে ভাত মেখে নিচ্ছেন, কেউ পাশেরজনকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন ঝোল। টেবিলের ওপর মাটির শানকি। তার ভেতর লালচে ঝোল আর নরম মাংস। পাশে বুটের ডাল। সালাদ। আবার কোথাও বন্ধুরা একসঙ্গে বসেছেন। গল্পের সঙ্গে ভেসে আসছে হা-হা হি-হি। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে হাঁড়ি নাড়ার শব্দ। মাঝেমধ্যে কর্মীরা দ্রুত পায়ে টেবিলের দিকে ছুটছেন।

এই উদ্যোগের পেছনে আছেন মনজুরুল হক। চট্টগ্রামের ছেলে। সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা। সেখানে রেস্তোরাঁ–সংস্কৃতি দেখে বুঝেছিলেন, খাবার শুধু পেট ভরানোর বিষয় নয়। এটি একটি অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার স্বাদ দিতে ২০১২ সালে ছোট পরিসরে শুরু করেন ‘বারকোড ক্যাফে’। পরে চালু করেন ‘মেজ্জান হাইলে আইয়ুন’। লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার—মেজবানের স্বাদকে নতুনভাবে এই প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।

মনজুরুল বলছিলেন, শহরে আসল মেজবানি মাংসের ভালো জায়গা ছিল না একসময়। সেই অভাব থেকেই এ উদ্যোগ। আসল মেজবানি মাংসের ব্যাখ্যায় মনজুরুল হক বলেন, ‘মসলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পদের ভারসাম্যপূর্ণ সংমিশ্রণ দিতে হয়। এ ছাড়া সব মাংস দিয়ে রান্না হয় না। কচি ষাঁড়ের বিভিন্ন অংশ লাগে। হাড়, গুর্দা—সবকিছু দরকার।’

মনজুরুল হকের সঙ্গে আলাপ করত করতেই টেবিলে চলে এল মেজবানি। কালাভুনা, নলার ঝোল, মেজবানি মাংস, বুটের ডাল, ভাত ও সালাদ। মাটির শানকি আর বাঁশের ঝুড়িতে সব সাজানো। মনজুরুল হক বলছিলেন, শুধু মেজবানের স্বাদ নিতে এখন দেশ-বিদেশ থেকে এখানে আসেন মানুষ।

রেস্তোরাঁয় এক কোণে বসে ছিলেন শারমিন সুলতানা ও নাজমুল হক দম্পতি। সঙ্গে তাঁদের দুই সন্তান। তাঁদের টেবিলে তখন সদ্য পরিবেশন করা হয়েছে মেজবানি মাংস, ভাত আর বুটের ডাল। কথা বলতে বলতেই জানা গেল, দিনটি তাঁদের জন্য বিশেষ—বিবাহবার্ষিকী। সাধারণ কোনো আয়োজন নয়, একটু ভিন্ন কিছু করতে চেয়েছিলেন তাঁরা, তাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে এসেছেন। শারমিন সুলতানা বলছিলেন, ‘বাসায় তো আমরা মাঝেমধ্যে মাংস রান্না করি। কিন্তু এই স্বাদটা আলাদা।’

আরও পড়ুন
বিশেষ দিবস উদ্‌যাপনেও এখন এই রেস্তোরাঁয় ভিড় করেন নগরবাসী
ছবি: সৌরভ দাশ

স্বাদেই পরিচয়

মেজবানের প্রাণ গরুর মাংস। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সময়। এই রান্না তাড়াহুড়া করে হয় না। ধীরে কষাতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। আগুন জ্বলতে থাকে। এতে মাংস ধীরে ধীরে নরম হয়। ঘন হয় ঝোল। লাগে শুকনা মরিচের ঝাঁজ। সব মিলে তৈরি হয় এক অনন্য স্বাদ। আলাদা করে কিছু বোঝা যায় না। এটাই মেজবানের বৈশিষ্ট্য। এই রান্নার মূল কথা ভারসাম্য। ঝাল বেশি হলে সমস্যা, কম হলেও সমস্যা। ঝোল বেশি হলে স্বাদ নষ্ট, কম হলে জমে না। আগুনও তেমন। কখন বাড়াতে হবে, কখন কমাতে হবে, এটাই আসল কৌশল।

মনজুরুল হক বলেন, ‘রেসিপি জানলেই হয় না। আগুন বুঝতে হয়। মসলা বুঝতে হয়। একটু এদিক-ওদিক হলেই স্বাদ বদলে যায়। এ কারণেই মেজবানের মাংস শুধু রান্না নয়। এটি অভিজ্ঞতা।’

শেষ পর্যন্ত, মেজবান শুধু খাবার নয়। এটি চট্টগ্রামের সংস্কৃতি, মানুষকে কাছাকাছি আনার উপলক্ষ, চট্টগ্রামের মানুষের উদারতার প্রতিচ্ছবি। আর সেই উদারতার একঝলক বুঝতে চাইলে দাওয়াত রইল, মেজ্জান হাইলে আইয়ুন।

আরও পড়ুন