সকালের যে ৭টি রুটিন আপনার আয়ু বাড়াতে সাহায্য করবে

দীর্ঘায়ুর জন্য মানুষ কি না করে। এই লেখায় চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ এবং দীর্ঘায়ু বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এমন কিছু সহজ অভ্যাস তুলে ধরা হয়েছে, সকালে যা অনুসরণ করলে আপনার দিন শুধু ভালোভাবেই শুরু হবে না; বরং দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের দিকেও এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

যদি সকালের অভ্যাস ভালো হয়, তাহলে ধীরে ধীরে আপনার শরীর ও মনও ভালো থাকবে
ছবি: প্রথম আলো

সকালে আমরা যা করি, তা আমাদের শরীর ও মনের ওপর অনেক বড় প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান নেক্সট হেলথের ডা. জেফ্রি এগলার বলেন, ‘সকালের অভ্যাস আমাদের দেহঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে হরমোন তৈরি হয়, হজমপ্রক্রিয়া এবং ঘুম-জাগরণের নিয়ম ঠিকভাবে চলে।’
সহজ করে বললে, যদি আপনার সকালের অভ্যাস ভালো হয়, তাহলে ধীরে ধীরে আপনার শরীর ও মনও ভালো থাকবে।
নিউরোফিটের সহ-সিইও অ্যান্ড্রু হোগ একটি সহজ উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শরীরের নার্ভাস সিস্টেমটা একটি জাহাজের মতো। আপনি যদি সকালে সেটাকে সঠিক পথে চালিত করেন, তাহলে সারা দিন ঠিক পথে থাকা সহজ হয়ে যায়।’

আরও পড়ুন

সকালের যে ৭টি রুটিন আপনাকে দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করবে:

১. ঘুম থেকে উঠেই পানি খান

সকালে পানি পান করলে হজম ভালো হয়, শরীরের বিপাকক্রিয়া ঠিক থাকে এবং জমে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ বের হতে সাহায্য করে
ছবি: প্রথম আলো

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এক গ্লাস পানি পান করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ডা. জেফ্রি এগলার বলেন, সকালে পানি পান করলে হজম ভালো হয়, শরীরের বিপাকক্রিয়া ঠিক থাকে এবং শরীরের জমে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ বের হতে সাহায্য করে। তাই সকালে উঠে এক গ্লাস পানি পান করতে যেন ভুল না হয়। এদিকে অ্যান্ড্রু হোগ বলেন, ‘পানি আমাদের আবেগপ্রবণ ভারসাম্যও ২৬ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, আগের দিন ঠিকমতো পানি না খেলে রাতে শরীর একটু পানিশূন্য হয়ে যায়, যার কারণে সকালে মাথা ভারী লাগে এবং মনোযোগ কমে যায়। সকালে সঠিকভাবে পানি পান করলে এই সমস্যা দূর হয়। সঠিকভাবে পানি পান নার্ভাস সিস্টেমের কার্যকারিতা ও বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে সহজ করে, যা দীর্ঘায়ুর জন্য অপরিহার্য।

২. পুষ্টিসমৃদ্ধ নাশতা খান

সকালে উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার যেমন প্রাকৃতিক দই বা ওটমিলের সঙ্গে ফল, মিশ্র বাদাম ও বীজ খাওয়া ভালো
ছবি: পেক্সেলস

সকালের নাশতা দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার—কারণ, এটা আপনার দিনের শুরুটা ঠিক করে দেয়। পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডা. ফেদেরিকা আমাতি বলেন, সকালে এমন নাশতা খাওয়া উচিত, যেটাতে ফাইবার বেশি থাকে এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে। এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, শক্তি বাড়ে এবং সারা দিন ভালোভাবে কাজ করা যায়।
ডা. ফেদেরিকা আমাতি বলেন, ‘সকালের নাশতা আমাদের দৈনিক ক্যালরির একটি বড় অংশ (প্রায় ২০ শতাংশ) পূরণ করে—তাই এখানে ভালো খাবার বেছে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার যেমন প্রাকৃতিক দই বা ওটমিলের সঙ্গে বেরি, মিশ্র বাদাম ও বীজ খাওয়ার পরামর্শ দেন ডা. আমাতি। এগুলো শরীরকে এমনভাবে সুস্থ রাখে, যা দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনা বাড়ায়।

৩. শরীর স্ট্রেচ করুন

দাঁত ব্রাশ ও নাশতার মাঝখানে ৫ থেকে ১০ মিনিট শারীরিক মুভমেন্ট করুন
ছবি: সুমন ইউসুফ

স্ট্রেচিং, যোগব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটাহাঁটি করে দিন শুরু করতে পারেন। এতে শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ে, শরীর নমনীয় থাকে। প্রাকৃতিক আলোতে বাইরে যেতে পারলে দেহঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক থাকে।
দাঁত ব্রাশ ও নাশতার মাঝখানে ৫ থেকে ১০ মিনিট শারীরিক মুভমেন্ট করুন। পা স্ট্রেচ করতে পারেন, পিঠ বাঁকাতে পারেন বা খানিকটা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। ডা. আমাতির মতে, সুস্থতার জন্য এ অভ্যাসগুলো খুবই উপকারী। এই সামান্য কাজগুলো আপনাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘায়ুর সম্ভাবনা বাড়ায়।

৪. নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় করুন

হাত মুঠো করে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হালকা করে টোকা (ট্যাপিং) দিলে শরীর দ্রুত সক্রিয় হয়
ছবি: পেক্সেলস

শুধু ঘুম থেকে উঠলেই শরীর পুরোপুরি জেগে ওঠে না—নার্ভাস সিস্টেমকেও সক্রিয় করতে হয়। অ্যান্ড্রু হোগের মতে, সকালে ঘুম থেকে উঠে মাত্র তিন মিনিট সময় দিলেই একটি সহজ ব্যায়াম করা যায়। যেমন হাত মুঠো করে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হালকা করে টোকা (ট্যাপিং) দেওয়া। এটি খুব সহজ ব্যায়াম, সময়ও কম লাগে, কিন্তু শরীরকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে।
এই অভ্যাস ‘ভেগাল টোন’ (শরীরের ‘শান্ত থাকার ক্ষমতা’ কতটা ভালো, তার একটা মাপকাঠি) উন্নত করে, যা স্ট্রেস সামলানোর ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরের কোষগুলোকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
অ্যান্ড্রু হোগ বলেন, এটি আয়ু বাড়ানোর আরেকটি অভ্যাস।

আরও পড়ুন

৫. মাইন্ডফুলনেস চর্চা করুন

গভীর শ্বাস দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে, যা শরীরের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।
ছবি: খালেদ সরকার

শরীরের পাশাপাশি মন ও আবেগের দিকেও খেয়াল করুন। ডা. ফেদেরিকা আমাতি বলেন, সকালে মাইন্ডফুলনেস ও কৃতজ্ঞতা চর্চা করা খুব ভালো অভ্যাস। এ জন্য জার্নাল লিখতে পারেন, গভীর শ্বাস নিতে পারেন, অথবা ধ্যান করতে পারেন। এগুলো করলে মন শান্ত থাকে, মানসিক স্বচ্ছতা বাড়ে এবং আবেগ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে, যা শরীরের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

৬. দিনের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন

সকালের শুরুতেই দিনের লক্ষ্যগুলো কাগজে লিখে সঙ্গে রাখতে পারেন
ছবি: পেক্সেলস

ডা. এগলার পরামর্শ দিয়েছেন, প্রতিদিন সকালে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে দিনের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার ঠিক করে নেওয়া ভালো অভ্যাস; কারণ, এতে আপনি কী কাজ করবেন এবং কীভাবে করবেন—এটা আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। এ লক্ষ্যগুলো মনে মনে ভাবা যেতে পারে বা কাগজে লিখে সঙ্গে রাখা যেতে পারে। এতে মনোযোগ ও কাজ করার দক্ষতা বাড়ে, কাজগুলো বেশি গুছিয়ে করা যায় এবং এতে জীবনটা এলোমেলো মনে হয় না, বরং একটি নির্দিষ্ট পথে চলছে বলে অনুভূত হয়। এই অনুভূতি মানুষকে বেশি অনুপ্রাণিত রাখে এবং ছোট ছোট কাজকেও অর্থপূর্ণ মনে করায়।

৭. সকালের কফি উপভোগ করুন

কফি খেলে অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ে, যা শরীরের জন্য উপকারী
ছবি: খালেদ সরকার

কফি শুধু ঘুম কাটায় না—পেটের স্বাস্থ্যের জন্যও এটি ভালো। ডা. আমাতি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, কফি খেলে অন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ে, যা শরীরের জন্য উপকারী। এটি মূলত কফিপ্রেমীদের অন্ত্রে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। মজার বিষয় হলো, ডিক্যাফ কফিতেও একই উপকার পাওয়া যায়। তবে কফির পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি।
তাই সকালে এক কাপ তাজা কফি উপভোগ করতেই পারেন।
সূত্র: রিয়েল সিম্পল ডট কম

আরও পড়ুন