বৃষ্টিদিনে এক কাপ চায়ের সঙ্গে আপনি কাকে চান

বৃষ্টির দিনে গরম চায়ে চুমুক। নস্টালজিয়া। প্রিয়জনের সঙ্গে গল্প আর মন ভরে প্রকৃতি উপভোগ—এসব নিয়েই লিখেছেন আনিসুল হক

বৃষ্টিদিনে এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই
মডেল: আহানাফ ও সাবরিন, পোশাক: রং বাংলাদেশ, সাজ: পারসোনা, স্থান কৃতজ্ঞতা: প্রেরণা প্রাঙ্গণ, ফটোশ্যুট সমন্বয়: বিপাশা রায়, ছবি: সুমন ইউসুফ

টিনের চালে, শজনে ডালে, কদমতলে, কূল–উপচানো যমুনাতটে, কংক্রিটের ছাদে, রিকশার হুডে, হলুদ সোনাব্যাঙ ছাওয়া মাঠে, কোমরডোবা রাজপথে এক শ রকমের রূপ আর হাজার রকমের ধ্বনি নিয়ে এমন বৃষ্টি আর কোন দেশে আসে!

কদমের কালচে সবুজ পাতার ফাঁকে সোনার চাঁদের মতো কদম ফুল। বারান্দার টবে, বাগানের কাঁটামেহেদি বেড়ার পাশে, ফুটপাতের কিশোরীদের হাতে, ডালে বেলি ফুলের অস্তিত্ব–নাড়ানো সৌরভ! রাতের বেলা সাপ ডেকে আনা গন্ধরাজের প্ররোচনাভরা সৌগন্ধ।

ভোররাত থেকে চরাচর ডোবানো বৃষ্টি তো, বিগলিত অঙ্গে শয়ন চলতে থাকুক, নিন্দ যাই মনের হরিষে। চারতলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখব, এ কী! কামরুল হাসানের ওয়াশ, পুরো কার্টিজ পেপার ভিজিয়ে নীল কিংবা কালো এইমাত্র কি ছেড়ে দিলেন পটুয়া!

সঙ্গিনীকে ডাকি, এসো এসো, দেখে যাও, ঝিলের জলে বৃষ্টির ছাঁট পড়ছে যেন গ্যালারিতে মেক্সিকান ওয়েভ। কিংবা ডাকি তাকে সন্ধ্যার পর, এসো, মেঘের ফাঁকে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে! চায়ের কাপ হাতে উনি বলেন, বৃষ্টিতে চা ভিজে যাবে তো! আরে তাতেই তো মজা। আনো দুই কাপ চা। নীড় ছোট ক্ষতি কী, আকাশ তো বড়!

চুমুক চলবে কেবল চায়ের কাপে
মডেল: আহানাফ ও সাবরিন, পোশাক: রং বাংলাদেশ, সাজ: পারসোনা, স্থান কৃতজ্ঞতা: প্রেরণা প্রাঙ্গণ, ফটোশ্যুট সমন্বয়: বিপাশা রায়, ছবি: সুমন ইউসুফ
আরও পড়ুন

এমন দিনেই চা–স্পৃহা চঞ্চল চাতক–চাতকী দল চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় চলো। হালকা লেবু–চা, সুগন্ধি ব্লেন্ডারস চয়েস, কিংবা বাংলার বিখ্যাত কালো পাতির কড়া দুধ–চা। এমন দিনেই তারে পান করা যায়। বৃষ্টিদিনে এই আমাদের বিলাসিতা। একেবারে হলুদ চা–ও হতে পারে। টারমারিক। সর্বরোগের উত্তম দাওয়াই।

এমন বৃষ্টিদিনে নস্টালজিয়া ভিড় করে
মডেল: সাবরিন, পোশাক: রং বাংলাদেশ, সাজ: পারসোনা, স্থান কৃতজ্ঞতা: প্রেরণা প্রাঙ্গণ, ফটোশ্যুট সমন্বয়: বিপাশা রায়, ছবি: সুমন ইউসুফ

না না, এ তোমার ষড়যন্ত্র। তুমি ব্রাজিল মার্কা চা চাইছ।

আচ্ছা তাহলে নাহয় তোমার রোজমেরি কিংবা হিবিসকাস চা–ই দাও। একটুখানি নীল হলে আর্জেন্টিনা চা হয়ে যাবে। কিংবা একেবারে গ্রিন টি। গ্রিন টির উপকারিতা জানো তো?

কী?

গ্রিন টি খেলে বয়স স্থির থাকে, এটাতে চিনি লাগে না, মেহমান এলে বিস্কুটের পয়সা বেঁচে যায়, আর একবার মেহমান গ্রিন টি খেয়ে গেলে আর কোনো দিনও সে বাসামুখী হয় না।

যাও! ফাজলামো করছ! গ্রিন টি আমার খুবই প্রিয়।

তবে খাও। চিরসবুজ চির আয়ুষ্মতী হও।

আরও পড়ুন

এমন বৃষ্টিদিনে নস্টালজিয়া ভিড় করে। অতীত এসে হানা দেয় মেঘের মতো, মনের আকাশে। একবার চা আমার নাক বাঁচিয়েছিল। কবি হেলাল হাফিজের সংবর্ধনায় সেবার নেত্রকোনা গিয়েছিলাম। ফেরার বাস সকাল ৬টায়। পৌষ মাস। ঘোরতর শীত, কুয়াশা।

বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি বাস স্টার্ট দিয়েছে, আর চায়ের দোকানে কেটলিতে টগবগ করে ফুটছে পানি। চা না খেয়ে যাওয়া চলে না। বাস ছেড়ে দিল। প্রথম ট্রিপ বাদ। চা খেয়ে পরের বাসে উঠলাম। ঘন কুয়াশার মধ্যে আধঘণ্টা চলার পর দেখি, সামনের বাস অ্যাকসিডেন্ট করেছে।

আগের বাস একটা ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিয়েছে। যাত্রীরা ঘুমিয়ে ছিল, সামনের সিটের রডে বাড়ি খেয়ে সবার নাক ভেঙে গেছে। ভাগ্যিস চা খাব বলে প্রথম বাস ছেড়ে দিয়েছিলাম!

বর্ষার সঙ্গে চায়ের সম্পর্কটা যেন জন্মগত

আরেকবার তো জীবনই বেঁচে গেল। তখন বুয়েটে পড়ি। কবিতার কামড়ে অস্থির যুবা আমরা কজন। বুয়েটের শহীদ মিনারের পাশে মহাসড়কের ট্র্যাফিক আইল্যান্ডে বসে নাট্যজন তৌকীর আহমেদের কণ্ঠে আবৃত্তি শুনছি—‘মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর,/ নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।’

রাত বাজে দুইটা। চায়ের তেষ্টা পেল। আমরা উঠে ঢাকা মেডিক্যাল ক্যানটিনের দিকে গেলাম। ফেরার পথে দেখি, ধাবমান ট্রাক ওই আইল্যান্ডকে ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সবচেয়ে সুন্দর বর্ষাকালে। এমন যে বুড়িগঙ্গার নামই বুড়ি, সেও তো বর্ষাকালে নবযৌবনের ছন্দ আর সৌন্দর্য নিয়ে ছোটে। তখন লঞ্চের টেবিলে দুই কাপ চা নিয়ে বসুন, দুজনে মুখোমুখি, অজানা দুখে দুখী, বলে ফেলুন বলে ফেলুন…, বাতাসে জল ঝরে অনিবার! বর্ষার সঙ্গে চায়ের সম্পর্কটা জন্মগত, অনেক বৃষ্টি যেখানে হয় না, সেখানে চা চাষ করা যাবে না।

আরও পড়ুন

শাওন–রাতে যদি তাকে স্মরণে আসে, তখন আদা–চা খাবেন। আর যদি স্মরণ না আসে, তাহলে মসলা–চা। বৃষ্টিকে বলতে পারেন, তুমি চোখের পাতা ছুঁয়ো না, সে যেন এসে দেখে পথ চেয়ে তার আপনি কেমন করে কেঁদেছেন।

উল্টোটাও বলতে পারেন, চার্লি চ্যাপলিনের মতো—আমি বৃষ্টিতে হাঁটতে পছন্দ করি, কারণ, তাতে কেউই আমার অশ্রু দেখতে পায় না। কিংবা বলতে পারেন, আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে/ জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না। লাগবে কোত্থেকে? মন কই থুইয়া আইছ? মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে!

দুই কাপ চা নিয়ে শুরু হোক গল্প
মডেল: আহানাফ ও সাবরিন, পোশাক: রং বাংলাদেশ, সাজ: পারসোনা, স্থান কৃতজ্ঞতা: প্রেরণা প্রাঙ্গণ, ফটোশ্যুট সমন্বয়: বিপাশা রায়, ছবি: সুমন ইউসুফ

তো কথাটা কী দাঁড়াল! আমাদের বর্ষা মানে তুমুল বৃষ্টি, মুষল বৃষ্টি, অঝোর বৃষ্টি, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, আকাশভাঙা বৃষ্টি, ছিপছিপে বৃষ্টি, প্যাচপেচে বৃষ্টি, ঝুম বৃষ্টি, রোদ্দুরে বৃষ্টি, উথালপাতাল বৃষ্টি! এমন বৃষ্টিদিনে আপনি বলবেন, প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই, ভীষণ অসম্ভবে তোমাকে চাই, এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই।

কিংবা শায়েরি বলতে পারেন:

এয় আব্রে করম থম থম কে বরস, ইতনা না বরস কে ও আ না সকে

জাব আ জায়ে তো জম কে বরস ইতনা বরস কে ও জা না সকে

ওগো দয়ালু মেঘ, থেমে বরষাও, এমন বর্ষণ কোরো না যেন সে আসতে না পারে।

সে এসে গেলে ঘন বর্ষণ করো, এমন বর্ষণ করো যেন সে ফিরে যেতে না পারে।

—আজমল রাজা কাদরি

তখন ওরা দুজন চা খাবে। বাংলা সিনেমায় এর চেয়ে বেশি কিছু চলবে না। চুমুক চলবে কেবল চায়ের কাপে।

আরও পড়ুন