শিশু থেকে পরিণত বয়সের সন্তান যেভাবে তার বাবাকে দেখে
এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে, শিশু থেকে পরিণত বয়সের সন্তানেরা বাবাকে কীভাবে দেখে এবং সে সময় বাবাদের কোন কোন আচরণ এড়িয়ে চলা উচিত।
একজন বাবা যে সন্তানের জীবনে নিরাপত্তা, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও পথচলার নীরব দিকনির্দেশক, এ কথা সবারই জানা। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, একটি শিশু তার বাবাকে ঠিক কীভাবে দেখে? বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কি সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়?
শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে দেখার চোখও বদলে যায়। কখনো বাবা নিরাপদ আশ্রয়, কখনো নায়ক, কখনো শিক্ষক, আবার কখনো বন্ধু।
প্রতিটি বয়সে বাবার উপস্থিতি, আচরণ ও ভাষা সন্তানের মনে গভীর ছাপ ফেলে, যা তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, আত্মবিশ্বাস ও জীবনের সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বয়স ০-২ বছর: নিরাপদ আশ্রয়
এই বয়সের শিশুরা শুধু কথাই শোনে না; তারা স্পর্শ, কণ্ঠ আর ভালোবাসা অনুভব করে। বাবার কোলকে তারা সবচেয়ে শান্তির জায়গা মনে করে। খেয়াল করে দেখবেন, এই বয়সের শিশুরা বাবার কোলকে নিরাপদ বোধ করে, বাবার কণ্ঠ শুনলে তাদের কান্না থেমে যায়। বাবার কাছে থাকলেই তাদের কাছে পৃথিবীটা ঠিকঠাক লাগে।
তারা কী শেখে ও লক্ষ করে
বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসার স্পর্শে ধরা পড়ার অনুভূতি।
দিনভর ক্লান্ত থাকার পর আপনি কীভাবে কাছে যান, আপনি কি তাদের জড়িয়ে ধরেন, নাকি অন্যের হাতে তুলে দেন। এসব তারা লক্ষ করে।
কী কী করবেন না
দূরে থাকা, শীতল আচরণ করা বা সব দায়িত্ব মায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া।
এ সময় আপনার উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় তার কাছে।
বয়স ৩-৫ বছর: নায়ক
এই বয়সের শিশুর চোখে বাবাই সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে মজার আর সবচেয়ে সাহসী মানুষ। অর্থাৎ তার নায়ক আপনি। কাজ থেকে ফিরে বাবার একটু সময় দেওয়া, কোলে তুলে নেওয়া, তার সঙ্গে খেলা, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া—এই ছোট ছোট কাজই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় ভালোবাসার ও আনন্দের মুহূর্ত।
তারা কী শেখে ও খেয়াল করে
এই বয়সে শিশুরা দেখে, ভালোবাসা আসলে কীভাবে প্রকাশ পায়।
মায়ের সঙ্গে বাবা কীভাবে কথা বলেন, সন্তানেরা ভয় পেলে বাবা পাশে দাঁড়ান কি না, রেগে গেলে বাবা কী ভাষা ব্যবহার করেন, সবই তারা মনে রাখে।
কী কী করবেন না
শিশুর সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলবেন না।
মজা করলেও কখনো উপহাস করবেন না।
তাদের কখনোই বলবেন না, ‘তুমি এমন করছ কেন!’
এই বয়সে শিশুরা খুব বেশি ভয় পায়। আর যদি কোনোভাবে আপনিই ভয়ের কারণ হয়ে ওঠেন, তখন তারা শেখে, ভালোবাসা কষ্ট দিতে পারে। এই ধারণা ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তাদের সঙ্গে থেকে যায়।
বয়স ৬-৯ বছর: শিক্ষক
এই বয়সে বাবাই হয়ে ওঠেন শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষক। শিশুরা খেয়াল করে, সমস্যা হলে বাবা কীভাবে সমাধান করেন, মানুষজনের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, আর চাপের সময় নিজেকে কীভাবে সামলান। বাবার প্রতিদিনের আচরণই এই বয়সে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় পাঠ।
তারা কী শেখে ও খেয়াল করে
এই বয়সে শিশুরা বাবা কী বলেন, তার চেয়ে বেশি শেখে বাবার কাজ দেখে।
বাবা দোকানদার বা অন্য মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, ভুল হলে কীভাবে ঠিক করেন—সবকিছু তারা মনে রাখে।
কী কী করবেন না
তাদের ছোট করবেন না।
তাদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাবেন না।
‘এসব কিছু না’ বলে তাদের দুশ্চিন্তাকে তুচ্ছ করবেন না।
বয়স ১০-১২ বছর: রক্ষক
শিশুরা এ সময় খেয়াল করে, বাবা সত্যিই শুনছেন, নাকি শুধু ‘শুনছি’ বলে পাশ কাটাচ্ছেন। এ বয়সে শিশুর কাছে মনে হয় পৃথিবীটা অনেক বড় এবং কিছুটা ভয়ংকর। তখন তাদের দরকার হয় নিরাপত্তা, আর এই নিরাপত্তা তারা খুঁজে পায় বাবার কাছে।
বাবা যখন বলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে আছি, তোমার কিছু হবে না’, তখন এই কথাই তাদের জন্য বড় নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
তারা কী শেখে ও খেয়াল করে
বাবা কথা বলার সময় মন দেন কি না।
যখন কাঁদে, তখন বাবা কীভাবে সাড়া দেন।
কী কী করবেন না
শিশু যখন কষ্ট পায় বা ভয় পায়, তখন তাদের অনুভূতিকে অবজ্ঞা করবেন না বা এড়িয়ে যাবেন না।
যদি বাবা বলেন, ‘কিছু হয়নি’, তখন শিশু মনে করে তার অনুভূতি গুরুত্বহীন। বা তার কষ্টকে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না।
এভাবে অনুভূতি উপেক্ষা করলে শিশুর মধ্যে একধরনের চাপা কষ্ট জমে থাকে, যা ট্রমার সৃষ্টি করতে পারে।
বয়স ১৩-১৬ বছর: পথপ্রদর্শক
এই বয়সে শিশুরা নিজেদের একটি পরিচয় গড়তে চায়। তাই তারা কিছুটা দূরে সরে যেতে পারে। কিন্তু বাবা কীভাবে কথা বলেন, আচরণ করেন ও জীবন যাপন করেন—তা তারা গভীরভাবে খেয়াল রাখে। বাবা রুষ্ট হলেও তাঁর উপস্থিতির মূল্য কমে না।
তারা কী শেখে ও লক্ষ করে
রাগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, মানুষকে কীভাবে সম্মান করতে হয় এবং কোথায় সীমা টানতে হয়—এসব তারা বাবার আচরণ থেকেই শেখে।
বাবা ভুল করলে কীভাবে ক্ষমা চান, কিংবা হতাশ হলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, এসব বিষয় তারা খুব মন দিয়ে লক্ষ করে।
কী কী করবেন না
কিশোরেরা মূলত সংযোগ ও বোঝাপড়া চায়। যদি পরিবারের ভেতর এই সংযোগ না থাকে, তাহলে তারা বাইরে খুঁজবে এই সংযোগ।
বাইরে পাওয়া সব সংযোগ যে নিরাপদ বা সঠিক হবে, তা নিশ্চিত নয়।
তাই অবিরতভাবে তাদের সমালোচনা করবেন না। আবেগগত দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করুন।
বয়স ১৭-২০ বছর: আদর্শ
এই বয়সে তারা নিজের জীবন গড়তে শুরু করে। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, সম্পর্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তবু বাবার প্রভাব এখনো গভীরভাবে থেকে যায়। বাবা কী মূল্যবোধ শিখিয়েছেন, কীভাবে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, আর পরিবারে তারা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে কি না—এসব নিয়েই তারা ভাবতে থাকে। তাই বাবাই তার কাছে আদর্শ।
তারা কী শেখে ও লক্ষ করে
এই বয়সের কিশোরেরা দেখে, পুরুষেরা শুধু রাগী হয় না, তাদের মনও কোমল হতে পারে, আবেগ থাকে।
এ ছাড়া সম্মান জোর করে নয়, অর্জন করতে হয়—এসব তারা বাবার কাছ থেকে শেখে।
বাবারাও অনেক সময় ভুল করেন। তখন তারা লক্ষ করে, আপনি এই ভুল কীভাবে স্বীকার করেন।
কী কী করবেন না
তাদের ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা।
তাদের দরকার দিকনির্দেশনা, সমর্থন। ছায়া হয়ে থাকা নয়।
বয়স ২০-২৫ বছর: বন্ধু
এখন তারা আপনাকে নিখুঁত মনে করে না, কিন্তু আপনাকে এখনো তার প্রয়োজন। কঠিন সময়ে আপনি কেমন ছিলেন—সেটাই তারা মনে রাখে।
তারা কী শেখে ও লক্ষ করে
ভালোবাসা কি শর্তসাপেক্ষ?
ভুল হলে কি ক্ষমা পাওয়া যায়?
কারণ ছাড়া কি ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলা যায়?
কী কী করবেন না
এই বয়সে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হয় পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আবেগের স্বীকৃতি। ভালোবাসা চুপচাপ রেখে দিলে তারা অনেক সময় মনে করে, তারা আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
তাই এ সময় স্পষ্টভাবে বলা জরুরি, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বা ‘আমি তোমার জন্য গর্বিত’।
ভুল-বোঝাবুঝি হলে তা মেরামত করার সাহস দেখানো দরকার, ক্ষমা চাইতে বা ক্ষমা দিতে কার্পণ্য করা উচিত নয়।
মনে রাখতে হবে, সম্পর্ক সারানোর জন্য সময় কখনো শেষ হয়ে যায় না, আর সন্তানের পাশে দাঁড়াতে কখনো দেরি হয় না।
সূত্র: সেন্টার ফল মেল সাইকোলজি