ফেরোমোন—সম্পর্ককে অদ্ভুতভাবে প্রভাবিত করে যে সংকেত

অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না কেন কোনো একজন ব‍্যক্তি আশপাশে থাকলেই ভালো লাগে। কেন কারও উপস্থিতিতে স্বস্তি আসে বা কেন কারও সঙ্গে অদ্ভুত এক ‘কেমিস্ট্রি’ অনুভূত হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে যে প্রভাবকটি গুরুত্বপূর্ণ কলকাঠি নাড়ে, তা হলো ফেরোমোন। এটি শরীরের নিঃশব্দ রাসায়নিক সংকেত, যা অবচেতনভাবে আমাদের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না কেন কোনো একজন ব‍্যক্তি আশপাশে থাকলেই ভালো লাগেছবি: সুমন ইউসুফ

ফেরোমোন কী?

ফেরোমোন এমন এক ধরনের রাসায়নিক সংকেত, যা একই প্রজাতির অন্য সদস্যের আচরণ, অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে এটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়, মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সূক্ষ্ম ও গবেষণাধীন।

১. আকর্ষণের রসায়ন তৈরি করতে পারে

সম্পর্কের শুরুর দিকে ফেরোমোন সম্ভাব্য সঙ্গীকে কেমন লাগছে, সেটি প্রভাবিত করতে পারে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সঙ্গী বা অপরপক্ষের শরীরের গন্ধ আপনাকে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করতে পারে। নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারে। শারীরিকভাবে আকর্ষণ করতে পারে। ফলে ফেরোমোনের প্রভাবে প্রথম দেখায় কারও প্রতি দ্রুত টান তৈরি হতে পারে। প্রথম দেখা থেকেই মনে হতে পারে ‘অনেক দিনের চেনা’।

২. বিশ্বাস ও ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে 

কিছু গবেষণা বলছে, কিছু ফেরোমোন-জাতীয় সংকেত মানুষের মধ্যে সহানুভূতি, সহযোগিতা, উদারতা, ইতিবাচক মুড তৈরিতে সাহায্য করে। পাশাপাশি কণ্ঠস্বর, শরীরীভাষা, প্রাকৃতিক গন্ধ, অবচেতন রাসায়নিক সংকেত অক্সিটোসিন (লাভ হরমোন) নিঃসরণে ভূমিকা রাখতে পারে। যখন কারও উপস্থিতি, গন্ধ, স্পর্শ ও আচরণ একসঙ্গে স্বস্তি দেয়, তখন মস্তিষ্ক তাকে ‘সেফ পারসন’ বা ‘মাই পারসন’ হিসেবে গ্রহণ করে। এটিই অনেক সময় সম্পর্কের গভীরতার ভিত্তি।

৩. পরিচিত গন্ধ থেকে নিরাপত্তা ও স্বস্তির অনুভূতি

কোনো প্রিয় মানুষের স্বাভাবিক শরীরের গন্ধ অনেক সময় মস্তিষ্কে পরিচিতি, নিরাপত্তা ও শান্তির অনুভূতি তৈরি করে। সঙ্গীর জামার গন্ধে স্বস্তি পাওয়া যায়। সঙ্গী কাছে থাকলে মন শান্ত হয়। দূরে থাকলেও জামা-কাপড়ের গন্ধে তাকে মনে পড়ে। এসব দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরিতে ও সম্পর্কের আবেগগত গভীরতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

৪. ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে বন্ধন শক্তিশালী হয়

আলিঙ্গন, কাছাকাছি থাকা, চুম্বন বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় শরীরে অক্সিটোসিন ও অন্যান্য হরমোন বাড়ে। এসব বিশ্বাস বাড়ায়, আবেগগত সংযোগ তৈরি করে ও সঙ্গীর প্রতি টান বাড়ায়। তবে কেবল ফেরোমোনের প্রভাবে এমন হয় না, আদতে অন্যান্য হরমোনও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।

৫. কথা না বলেও আবেগ পৌঁছে দিতে পারে

মানুষের শরীরের গন্ধ বা রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে ভয়, দুঃখ, এমনকি আনন্দের মতো আবেগও কিছুটা পৌঁছাতে পারে। এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে গবেষণায়। অর্থাৎ কেউ চিন্তিত হলে আপনি অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন। আবার কারও নীরব উপস্থিতিতে নিজেকে শান্ত লাগতে পারে।

তবে…

ফেরোমোন একাই সম্পর্ক তৈরি করে না। বরং সম্পর্কের প্রাথমিক আকর্ষণ তৈরিতে সাহায্য করে। উপস্থিতি, গায়ের গন্ধ, শারীরিক স্পর্শ—এসবের মাধ্যমে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে নিয়মিত যোগাযোগ, সম্মান, মানসিক,  নিরাপত্তা, ধারাবাহিক যত্ন, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস—এসবের মাধ্যমে। ফেরোমোন থাকলেও সম্পর্কে সততা না থাকলে, আচরণ ভালো না হলে সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে টেকে না।

শেষ কথা

অনেক সময় সম্পর্কের গভীরতা শুরু হয় এমন এক অনুভূতি থেকে, যার ভাষা নেই, কিন্তু উপস্থিতি আছে। ভালোবাসা শুধু চোখে দেখা বা কথায় বলা বিষয় নয়। শরীরও অনেক সময় নিঃশব্দে কথা বলে। ফেরোমোন সেই নীরব ভাষার অংশ; যা মানুষকে টান, স্বস্তি ও সংযোগ অনুভব করাতে সাহায্য করতে পারে।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে

আরও পড়ুন