মা–বাবা কি সারাক্ষণ ফেসবুকে? কখন চিন্তার কারণ, কী করবেন
বাসায় আত্মীয়স্বজন এসেছেন, অথচ মা বা বাবা ব্যস্ত ফেসবুকে। নাতি–নাতনি খেলতে ডাকছে, কিন্তু তাঁদের চোখ মুঠোফোনের পর্দায়। বাইরে ঘুরতে গিয়েও একের পর এক ভিডিও দেখছেন। আবার কখনো কোনো চমকপ্রদ স্বাস্থ্য পরামর্শ, আবেগঘন পোস্ট বা বিনিয়োগের লোভনীয় প্রস্তাব দেখে সত্যতা যাচাই না করেই বিশ্বাস করছেন, শেয়ারও করছেন। এমনকি অপরিচিত মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
কিছুদিন আগেও সন্তানদের অতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহারের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন মা–বাবারাই। কিন্তু এখন অনেক মিলেনিয়াল ও জেন–জি সন্তানের অভিযোগ উল্টো—‘আমার মা–বাবা তো সারাক্ষণই ফেসবুকে!’
অবশ্য ফেসবুক ব্যবহার করলেই যে সমস্যা, তা নয়। বন্ধু–স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, তথ্য জানা কিংবা বিনোদনের জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু যখন ফেসবুক বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, দৈনন্দিন দায়িত্ব বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কখন বুঝবেন বিষয়টি চিন্তার
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বেশি সময় ফেসবুক ব্যবহার করাই সমস্যার লক্ষণ নয়; বরং কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে দেখা দিলে সতর্ক হওয়া দরকার। যেমন—
বারবার ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করেও না পারা
ফেসবুক ব্যবহার করতে না পারলে অস্থির বা বিরক্ত হয়ে পড়া
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে ফোনে ব্যস্ত থাকা
খাওয়া, আড্ডা বা বিশ্রামের মাঝেও বারবার ফেসবুক দেখা
বাস্তব জীবনের চেয়ে অনলাইন যোগাযোগে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়া
সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলা
পরিবারে দূরত্ব তৈরি হতে পারে
একই ঘরে থেকেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কথাবার্তা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে দাদা–দাদি বা নানা–নানির সঙ্গে নাতি–নাতনির যে সময় কাটানোর কথা, সেটিও কমে যেতে পারে।
আবার পরিবার নিয়ে বাইরে ঘুরতে গেলেও যদি বেশির ভাগ সময় ফোনেই কাটে, তাহলে বাস্তব মুহূর্তগুলো উপভোগ করার সুযোগ কমে যায়।
ভুয়া খবর ও গুজব সহজে বিশ্বাস করা
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম বড় সমস্যা ভুয়া তথ্য। অনেক সময় আবেগঘন বা চাঞ্চল্যকর পোস্ট, পুরোনো ছবি, বিকৃত ভিডিও কিংবা বানানো তথ্য সত্যতা যাচাই না করেই শেয়ার করা হয়। এতে ভুল তথ্য আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো তথ্য বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে অন্তত একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সূত্র থেকে যাচাই করা উচিত।
অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি
ফেসবুক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে প্রতারকদের নানা কৌশল এখন নিয়মিত দেখা যায়।
যেমন—
ভুয়া বিনিয়োগের প্রস্তাব
লটারিতে জেতার দাবি
মেসেঞ্জারে পরিচিত সেজে টাকা চাওয়া
ভুয়া অনলাইন শপ
তাই অপরিচিত কাউকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া, মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংকিং তথ্য শেয়ার করা কিংবা যাচাই না করে টাকা পাঠানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
টোটকা, ভুয়া ওষুধ বা অপচিকিৎসার ঝুঁকি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়—
সাত দিনে ডায়াবেটিস ভালো হবে
হাঁটুর ব্যথা একেবারে সারবে
ক্যানসারের ঘরোয়া চিকিৎসা
হার্টের ব্লক দূর করার দাবি
এসব পোস্ট দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা ভেষজ পণ্য ব্যবহার শুরু করা বিপজ্জনক হতে পারে। কোনো স্বাস্থ্য–পরামর্শ গ্রহণের আগে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কেন এত আকর্ষণীয় লাগে
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, নতুন নোটিফিকেশন, লাইক, মন্তব্য কিংবা ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের একটি রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এটি ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। সেই অনুভূতি আবার পেতে অনেকেই অজান্তেই বারবার ফোন হাতে নেন।
এ ছাড়া ফেসবুকের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর পছন্দ বুঝে একই ধরনের আরও কনটেন্ট দেখায়। ফলে পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিলেও কখন যে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা কেটে যায়, অনেকেই টের পান না।
মা–বাবাকে কীভাবে বোঝাবেন
এ ধরনের বিষয়ে রাগারাগি বা অভিযোগ সাধারণত উল্টো ফল দেয়। ‘তুমি সারাক্ষণ ফেসবুকে থাকো’—এভাবে বলার বদলে ইতিবাচকভাবে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করুন। যেমন—
একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়ার প্রস্তাব দিন।
নাতি–নাতনির সঙ্গে খেলতে উৎসাহ দিন।
পরিবারের সবাই মিলে গল্প বা বোর্ড গেম খেলতে পারেন।
পুরোনো ছবি দেখে স্মৃতিচারণা করতে পারেন।
অনেক সময় বিকল্প আনন্দের সুযোগ তৈরি হলে ফোনের ব্যবহারও কমে আসে।
পরিবারে কিছু নিয়ম করা যেতে পারে
খাওয়ার টেবিলে ফোন নয়।
পরিবারের আড্ডার সময় ফোন ব্যবহার নয়।
ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখা।
সপ্তাহে অন্তত এক দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিরতি নেওয়া।
ফোনের স্ক্রিন টাইম নিয়মিত দেখা এবং প্রয়োজনে সীমা নির্ধারণ করা।
কখন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন
যদি অতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারের কারণে পারিবারিক সম্পর্ক, ঘুম, কাজ বা মানসিক স্বাস্থ্যে স্পষ্ট প্রভাব পড়ে এবং নিজে থেকে ব্যবহার কমানো সম্ভব না হয়, তাহলে একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিতে পারেন।
মনে রাখুন
ফেসবুক নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন এটি বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, দায়িত্ব এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য, জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়।
সূত্র: স্ট্যাটিসটা ও হেলথলাইন