ফ্যামিলি তুলে দিয়ে অফিস ভাড়া, ভাড়াটেদের দুঃখ বোঝার কে আছে

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নতুন বাড়িভাড়ার নির্দেশিকা দিয়েছেফাইল ছবি: প্রথম আলো

ঢাকার মিরপুর ১১ নম্বরের বাসাটায় উঠেছিলাম দুই বছর আগে। তখন মনে হয়েছিল, ঢাকার দালানকোঠার ভিড়ে একটু খোলামেলা জায়গা পেলাম। ছাদের চিলেকোঠা—দুটি ছোট ঘর, একটি রান্নাঘর আর একটি বাথরুম। চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আমাদের ছোট সংসারের জন্য সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। খোলামেলা পরিবেশ পছন্দ করি বলেই এমন বাসা বেছে নেওয়া।

কিন্তু দেড় বছর পেরোতেই সেই বাসাই এখন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। বাড়ির মালিকপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে ভবনটি আর আবাসিক থাকবে না। ফ্যামিলি ভাড়াটে থাকলেও ধাপে ধাপে সব ফ্ল্যাট অফিস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হবে। অর্থাৎ এই বাড়িতে আমাদের থাকার মেয়াদ শেষের পথে। কয়েকটি ফ্ল্যাটে ইতিমধ্যেই অফিস বসেও গেছে। যাঁরা আছেন, তাঁদের সবাইকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

এ সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য শুধু বাসা বদলের প্রশ্ন ছিল না। ছিল সময়ের সংকট, মানসিক চাপ আর অসহায়ত্ব। স্বামী–স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী। অফিসের চাপ সামলে ঢাকায় নতুন বাসা খোঁজা যে কতটা কঠিন, তা ভাড়াটেমাত্রই জানেন। তাই আমরা মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলি, কেন এমন সিদ্ধান্ত, সময়টা একটু বাড়ানো যায় কি না। অনেক অনুরোধের পর চার–পাঁচ মাস অতিরিক্ত সময় পাই।

আরও পড়ুন
এমন নোটিশের বদলে এখন অনেক বাড়িতে ফ্যামিলি তুলে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে বানিজ্যিক ব্যবহারের জন্য
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

কথা বলার সময় বোঝা গেল, আমাদের চিলেকোঠার ফ্ল্যাটটি নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা আছে তাঁদের। ছাদে থাকা এই দুই কক্ষের সঙ্গে আরও একটি ঘর যোগ করে সেটিকে তিন রুমের অফিস স্পেস হিসেবে ভাড়া দিতে চান। এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার, এই ফ্ল্যাটে এখন শুধু দুটি ঘর, একটি রান্নাঘর ও একটি বাথরুম আছে। কোনো বারান্দা নেই, নেই আলাদা ড্রয়িং বা ডাইনিং। অথচ গত দুই বছরে এই ছোট ফ্ল্যাটের জন্য যে ভাড়া গুনেছি, তা ছিল নিচের বড় ফ্ল্যাটগুলোর ভাড়ার ঠিক অর্ধেক।

নিচের ফ্ল্যাটগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে তিনটি বেডরুম, আলাদা ড্রয়িং ও ডাইনিং স্পেস, রান্নাঘর, চারটি বাথরুম আর চারটি বারান্দা। আয়তনেও অনেক বড়। স্বাভাবিকভাবে ভাড়াও বেশি। কিন্তু তুলনা করলে দেখা যায়, সুযোগ-সুবিধা ও জায়গার হিসাবে চিলেকোঠার এই ফ্ল্যাটের জন্য যে ভাড়া নেওয়া হয়েছে, তা মোটেও কম নয়। বরং বাথরুম, রান্নাঘর আর ঘরের ফিটিংস সমস্যার পরও তুলনামূলক বেশি ভাড়া দিতে হয়েছে আমাদের।  

তবু বাসাটাকে ঘিরে আমাদের আবেগ তৈরি হয়েছে। তাই মালিকের নতুন পরিকল্পনার কথায় আমরা বিকল্প চিন্তা করি—যদি একটি ঘর যোগ করে অফিস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়, আমরা সেটাই নিতে চাই। ভাড়া কত হবে, তা জানতে চাই। এখানেই আসে বড় ধাক্কা। মালিকপক্ষ যে ভাড়ার কথা বললেন, তা নিচের ফ্ল্যাটের সমান নয়, বরং আরও ৫–৮ হাজার টাকা বেশি।

আরও পড়ুন
বাসাভাড়া বেড়ে গেলে নতুন বাসা খুঁজে পাওয়াও কঠিন
মডেল: ইসরাত ও দ্বীপ। ছবি: সুমন ইউসুফ

হিসাব করে দেখলাম, আমাদের এই চিলেকোঠার ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়বে প্রায় ১৪–১৫ হাজার টাকা। অথচ যোগ হবে মাত্র একটি ঘর। থাকবে না একাধিক বাথরুম, থাকবে না বারান্দা বা পূর্ণাঙ্গ আবাসিক সুবিধা। অফিস স্পেস হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করে তুলে মালিকের লাভ বাড়বে, কিন্তু ভাড়াটের বাস্তবতার কোনো হিসাব সেখানে নেই।

এর মধ্যে গতকাল ২০ জানুয়ারি দেখলাম, ঢাকঢোল পিটিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নতুন বাড়িভাড়ার নির্দেশিকা দিয়েছে। বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগের কথা বলা হয়েছে। কাগজে-কলমে যা আইনসম্মত বলে দাবি করা হচ্ছে, বাস্তবে তা ভাড়াটেদের জন্য নতুন আশঙ্কা তৈরি করছে। আমার এই বাড়িতেই হোক বা ঢাকার অন্য কোথাও—এই নির্দেশিকার ব্যাখ্যা যেভাবে মালিকপক্ষ করতে পারেন, তাতে ভাড়া যে আরও বাড়বে, সেই আশঙ্কা অমূলক নয়।

এই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে, ঢাকায় ভাড়াটে হওয়া মানে শুধু মাস শেষে ভাড়া দেওয়া নয়। এর মানে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা, যেকোনো সময় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার মুখে পড়া, আর আইনি কাঠামো থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ না থাকার ভোগান্তি বইতে থাকা।

ডিএনসিসির নির্দেশিকা কাদের সুরক্ষা দেবে, আর কাদের জন্য বাড়াবে চাপ—সে প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। কিন্তু ভাড়াটে হিসেবে মনে হচ্ছে, নগরে টিকে থাকা এবার আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে আমাদের মতো ছাপোষা পরিবারগুলোকে।

আরও পড়ুন