আমার সঙ্গে কেউ মেশে না!

‘আমার সঙ্গে কেউ মেশে না’ বলে যেন সন্তান বিষন্নতায় না ভোগে। প্রতীকী এই ছবিতে মডেল হয়েছেন তাজিম ও সুমি
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

স্কুলগেটের সামনে নারীটিকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে গিয়েছিলাম, ‘কেমন আছেন, অনেক দিন পর দেখা।’ উনি কেমন যেন সিঁটিয়ে গেলেন। এদিক-ওদিক তাকালেন দু-একবার। তাঁর এই আচরণে ভীষণ অবাক হয়ে বললাম, ‘কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?’

ওই নারী ধরা গলায় বললেন, ‘আপনি জানেন না বোধ হয়। আমার ছেলে রক্তিম, খুব দুষ্টু তো, ক্লাসে এর-ওর সঙ্গে মারামারি করে। ভীষণ চঞ্চল। আবার রেজাল্টও খুব খারাপ করেছে এবার। স্কুলে রোজ অভিযোগ। ক্লাসের সব বাচ্চা ঠিক করেছে, ওর সঙ্গে কেউ মিশবে না। এমনকি মায়েরাও বলে দিয়েছেন যেন রক্তিমের সঙ্গে কেউ না মেশে। আর মায়েরা ঠিক করেছেন যে আমার সঙ্গেও কেউ মিশবেন না। তাহলেই নাকি উপযুক্ত শিক্ষা হবে।’

হতভম্ব হয়ে ওনার দিকে চেয়ে রইলাম। কী বলছেন এসব? রক্তিমের মা এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।

আরও পড়ুন

ওপরের ঘটনাটি একবিন্দু মিথ্যা নয়, শুধু ছেলেটির নাম বদলে দিয়েছি। প্রায় ১০ বছর আগের ঘটনা এটি। তারপর জেনেছি আরও অনেক ঘটনা। কেবল দুষ্টু আর খারাপ ছাত্র বলে নয়, আমার এক বন্ধুর ছেলে দেখতে শ্যামবর্ণ, স্কুলের বন্ধুরা তাই তার সঙ্গে মিশত না। এড়িয়ে যেত, বুলিং করত, মন্দ কথা বলত। আমার বন্ধুটি তার শিশুটিকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত মনোরোগবিদের কাছে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ, তার সন্তান স্কুলে যাবে না বলে বিদ্রোহ করেছিল।

নিজে আমি একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ। টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিছু শিশু রোগী আছে আমার। ইনসুলিন নিতে হয় তাদের জীবনধারণের জন্য। এ রকম এক কিশোরী, ঢাকার উত্তরার এক নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রী, একবার চেম্বারে এসে কেঁদে বলল, ‘ম্যাডাম আমি স্কুল ছেড়ে দিয়েছি।’

সেকি কেন? চমকে উঠি বলি।

প্রাইভেটে ও লেভেল দেব। স্কুলে যাব না আর। ক্লাসের কেউ আমার সঙ্গে মেশে না। কারণ, আমার ডায়াবেটিস আছে। আমাকে ইনসুলিন নিতে হয়।

তাতে সমস্যা কী? অসুখ-বিসুখ মানুষের থাকতেই পারে।

এবার মেয়ের বাবা মুখ খুললেন, ‘ম্যাডাম, সবাই ওকে এড়িয়ে চলে। মেয়েটা ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে। তাই স্কুলে আর দেব না ভেবেছি। এমনকি শিক্ষক আর অভিভাবকেরাও সবাই ওকে কেমন চোখে যেন দেখে!’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি, আমাদের স্কুলগুলো সুস্থ শিশুদের জন্যই শিশুবান্ধব নয়, আর একটা অন্য ধরনের শিশুর জন্য কী আর আশা করা যায়?

আরেক সহকর্মীর ছেলের গল্প বলি। সে উঁচু ক্লাসেই পড়ে। কিন্তু তার সঙ্গে বন্ধুরা মেশে না। কারণ, ছেলেটা একটু ‘চাইল্ডিশ’। এখনো মায়ের কোলঘেঁষা। গার্লফ্রেন্ড নেই। বন্ধুরা কোথাও ‘স্টে নাইট’ করতে গেলে তাকে অনুমতি দেওয়া হয় না। বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও খেতে গেলে রাত ১০টা বাজলেই শুরু হয় বাড়ি থেকে ফোন। বন্ধুরা ওর নাম দিয়েছে ‘মামস পেট’। ব্যাপক হাসাহাসি চলে ওকে নিয়ে। ছেলে বাড়ি এসে কেবল মায়ের সঙ্গে রাগ করে। এটা-ওটা ভাঙে।

আমার নিজের মেয়ের দুই বন্ধু, যারা একসময় হরিহর আত্মা ছিল, হঠাৎ খেয়াল করি, তারা আর পরস্পরের সঙ্গে মেশে না।

মেয়েকে জিজ্ঞেস করি, তোমাদের মধ্যে কি ঝগড়া হয়েছে?

মেয়ে গম্ভীর মুখে জবাব দেয়, ‘না।’

আমি হাসি, আরে বলো না, এ রকম তো হয়ই। আমরা কত আড়ি দিতাম স্কুলে। আবার ভাব হয়ে যেত। কানি আঙুলে আড়ি, বুড়ো আঙুলে ভাব। তোরা তো এসব চিনিসই না।

মেয়ে মলিন মুখে বলে, মা, রুবি কোনো বিষয়ে এ পায়নি এবার, সব কটিতে সি আর ডি, তাই মিলার আম্মু বলেছেন ওর সঙ্গে মেশার দরকার নেই। ভালো ছাত্রদের সঙ্গে মিশতে আর খেলতে বলেছেন। এখন আমার বন্ধুদের গ্রুপটা ভেঙে গেছে!

অবাক হওয়ার ক্ষমতাও হারাচ্ছি মনে হয় আজকাল। আবারও বলছি, বিশ্বাস করুন, কোনো ঘটনাই মিথ্যে নয়। কেবল নামগুলো এদিক-ওদিক করেছি মাত্র। তার চেয়ে বড় কথা, মেয়ের বন্ধুদের একবার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করতে চেয়ে মেয়ের কাছেই বাধা পেয়েছি। গম্ভীর মুখে সে বলেছে, ওরা আসবে না।

কেন আসবে না? মায়েদেরও বলব তো!

তুমি কি ওদের বাড়ি যাও? ওদের মায়েদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে, এক রকম জামা পরে রেস্তোরাঁয় খেতে বা ঘুরতে যাও? তুমি তো ওদের গ্রুপে নেই!

মায়েদের গ্রুপ! কী সর্বনাশ! চিন্তিত হয়ে ভাবি, কীভাবে কোন একটা মায়েদের গ্রুপে ঢোকার বন্দোবস্ত করা যায়! আর আমাদের সন্তানেরা তাতে একটা গ্রহণযোগ্য অবস্থানে আসতে পারে?

দুই

এসব দেখেশুনে মাঝে মাঝে নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে। ঢাকার বিখ্যাত এক স্কুলের ছাত্রী ছিলাম আমিও। ক্লাসে যার যার মতো বন্ধুদের গ্রুপও ছিল। বন্ধুদের মধ্যে আড়ি হতো, আবার ভাব। মনোমালিন্য হতো, ঝগড়াও। একজন আরেকজনের কাছে লুকিয়ে কারও কারও বদনামও করত। সেটা জানাজানি হলে চোখ ফুলে লাল হতো। খাতা ধার দেয়নি বলে কথা বন্ধ রাখতাম এক সপ্তাহ, তারপর খাতার কথা অচিরেই ভুলে যেতাম। বছরের মাঝখানে অন্য স্কুল থেকে কেউ এলে তাকে সবাই সন্দেহের চোখে দেখত, সে কিছুদিন একা একা এতিমের মতো ঘুরে বেড়াত, তারপর একদিন সব ভুলে সেও যোগ দিত টিফিন টাইমের উচ্ছ্বসিত খেলায়। ঝগড়া-আড়ি এড়িয়ে চলা, মেশা না মেশা—হ্যাঁ আমাদের সময়ও ছিল বইকি। কিন্তু তা নিতান্তই শিশুসুলভ। ছেলেমানুষি। কখনোই অতটা সিরিয়াস নয়। সব ভুলে খেলায় মেতে উঠতে দেরি হতো না কারও। আর আরেকটা কথা, স্কুলে কার সঙ্গে খেলছি, কার সঙ্গে ঝগড়া করছি, কে কার সন্তান, কে কোন এলাকায় থাকে, কে ভালো ছাত্র, কে খারাপ, কে ক্লাস টেস্টে কত পেল—এসব নিয়ে একবিন্দু মাথা ঘামাতেন না আমাদের বাবা-মা। আমরা আমাদের মতো থাকতাম, শৈশবটা ছিল আমাদেরই দখলে, একেবারেই আমাদের নিজস্ব।

শিশুদের সেই শৈশবকে আমরা ছিনিয়ে নিয়েছি। কে ছিনিয়ে নিল? রেজাল্ট কার্ডের এ প্লাস মার্ক, স্কুলগেটের বাইরে দাঁড়ানো অভিভাবকদের পছন্দ-অপছন্দ, সামাজিক মর্যাদা, স্মার্টনেস, যোগ্যতায় কারও এগিয়ে থাকা, কারও পিছিয়ে পড়া—এ রকম নানা রকম বিভাজন। শিশুদের ‘শিশুত্ব’ বা চাইল্ডনেসকে হরণ করছি আমরা। শেখাচ্ছি স্বার্থপরতা, বিভাজন, শ্রেণিবৈষম্য, নিষ্ঠুরতা, অন্যের দুর্বলতা বা অসহায়ত্বে নির্মম আনন্দ। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী শিশুরা বন্ধুত্ব করবে, পরস্পরের সঙ্গে মিশবে—এ রকম একটা ভুল ধারণা গড়ে উঠেছে। স্কুলগেটে গড়ে ওঠা মায়েদের ‘গ্রুপ’ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে স্কুলের ভেতরে সন্তানের গতিবিধি। এই নানা বিধিনিষেধ আর বিভাজনের গন্ডগোলে হঠাৎ দেখা যাচ্ছে একটি শিশু হয়ে পড়েছে একা। কেউ মেশে না তার সঙ্গে, কেউ খেলে না। তাকে নিয়ে অন্যরা হাসাহাসি করে বা বুলিং করে। কারণ, হয়তো সে ভালো ছাত্র নয়, কিংবা সে ‘মামস পেট’। হতে পারে সে একটু বোকা, যথেষ্ট স্মার্ট নয়, তার মা-বাবা কোনো গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন—যে কারণেই হোক শিশুটি স্কুলে একা, বন্ধুহীন। সেই শিশুটি আপনার বা আমার সন্তানও হতে পারে। সবাই যখন খেলায় আর আড্ডায় মেতে ওঠে, সে হয়তো তখন এক কোণে ছলছল চোখে বসে থাকে। সবাই যখন বাইরে ঘুরতে বা খেতে যায়, কেউ তাকে ডাকে না। কোনো বন্ধুর বাড়িতে জন্মদিনের পার্টি হলে তাকে কেউ নিমন্ত্রণ করে না। কী একটা দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে শিশুটিকে। এখন সে কী করবে? অভিভাবক হিসেবে আপনারই-বা করণীয় কী?

তিন

বন্ধুত্বের জগৎটা অবারিত। এতে হস্তক্ষেপ করার দরকার নেই। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, সহচরেরা ভালো না মন্দ, মাদক নেয় কি না, ইভ টিজিং করে কি না, খারাপ কাজ করে কি না—এসব দিকে লক্ষ অবশ্যই রাখতে হবে, কিন্তু বন্ধু বেছে দেওয়ার কাজ আমাদের নয়। কাউকে বয়কট করে চলার, এড়িয়ে চলার মতো পরামর্শও যেন আমরা না দিই। নিজে জীবনে ‘ভালো ছাত্র’ আর ‘ভালো ছেলেমেয়ে’র সঙ্গে মিশে যত কিছু শিখেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি তথাকথিত খারাপ ছাত্র আর দুষ্টু ছেলেমেয়েদের কাছে। মনে রাখবেন জীবনে প্রত্যেকের কাছেই শেখার কিছু আছে। আজ যে ক্লাসের মহা দুষ্টু, মহা অমনোযোগী বাচ্চা, সে যে কাল অনুকরণীয় হয়ে উঠবে না, তা কে জানে। শুরুতে যে ছেলেটির কথা বলছিলাম, রক্তিম, যার সঙ্গে ১০ বছর আগে কেউ মিশত না, ১০ বছর পর তার সঙ্গে এখন বন্ধুত্ব করার জন্য সবাই আগ্রহী। সে এখন তুমুল জনপ্রিয় ক্লাসে। তাই আমার সঙ্গে কেউ মেশে না, কেউ আমাকে ডাকে না, আড়ালে হাসাহাসি করে বলে বিষণ্নতায় ভোগারও কিছু নেই। জগতে সব সময়, সব দেশে, সব জায়গায় এসব মেশা না-মেশার রাজনীতি, বুলিং আর হাসাহাসি ছিল, আমাদের কালেও ছিল, এগুলোকে বিশেষ পাত্তা দিতে নেই। এসব নেতিবাচকতা থাকবেই। তবু জীবন তার নিজের গতিতে এগিয়ে যাবে। কেবল স্টিয়ারিংটা সোজা ধরে রাখতে হবে। এদিক-ওদিক বাঁকা হলেও যেন রাস্তা থেকে নেমে না পড়ে। আর ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে বাবা-মা হিসেবে আমরা যেন সোজা রাস্তাটা সহজে চিনিয়ে নিতে পারি। পাশে থাকি। ব্যস, এটুকুই।