জুতা কিনতে কেন এলিফ্যান্ট রোডের রাখী সুজে ছুটে যান কিছু মানুষ?

ঢাকাতেই এখন পাওয়া যায় পুমা, নাইকি, বুগাতি ও বাটার মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জুতা; আছে অ্যাপেক্স, জিলস ও ওরিয়নের মতো সুপরিচিত দেশি ব্র্যান্ড। তারপরও কেন এলিফ্যান্ট রোডের রাখী সুজে ছুটে যান কিছু মানুষ? খোঁজখবর করতে নিজেই একদিন দোকানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন এম এ হান্নান

এলিফ্যান্ট রোডের রাখী সুজছবি: এম এ হান্নান

দোতলা ভবনের নিচতলার সামনের অর্ধেকটাজুড়ে কাচের তাকে থরে থরে সাজানো রঙিন জুতা। মাঝখানে মেঝেতে টুল পেতে বসে ক্রেতাদের জুতা বুঝিয়ে দিচ্ছেন কর্মীরা। অন্য অর্ধেক অংশ ও দোতলার পুরোটায় মজুত করে রাখা হয়েছে বাক্সবন্দী জুতা। আজকাল ব্র্যান্ডগুলো যেখানে পণ্যের চেয়ে তার মোড়ক নিয়েই ভাবে বেশি, সেখানে আশির দশকের সেই পুরোনো সাদা–কালো লেখায় সাদামাটা কাগজের বাক্সে ক্রেতাদের কাছে জুতা বিক্রি করে যাচ্ছে রাখী। অনেকটা পুরোনো দিনের চক বা খড়িমাটির বাক্সের আদলে তৈরি প্যাকেটগুলো রংচঙে না হলেও জুতা যে কত বিচিত্র রঙের হতে পারে, নব্বইয়ের দশক থেকেই সেটি করে দেখিয়েছে রাখী সুজ।

১৯৮৬ সালে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যাল মোড়ের গফুর ম্যানশনে ৭ বাই ২ ফুটের একটি ছোট্ট দোকান দেন জাভেদ ইকবাল। মেয়ের নামে দোকানের নাম রাখেন রাখী সুজ। অল্প সময়েই ছোট্ট এই দোকান জনপ্রিয়তায় বাকিদের ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে এখন দোতলা ভবনজুড়েই রাখী সুজ। এ যেন জুতার স্বর্গরাজ্য!

নানা রং ও নকশার রাখী সুজ
ছবি: এম এ হান্নান

দাদি কিনতেন, নাতিও কেনেন

শুরুর সময় থেকে এখনো বিক্রির কাজ করছেন মোহাম্মদ আলম। তিনি জানান, ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো প্রথম যুগের মতো সাদা–কালো বাক্সে জুতা বিক্রি করে রাখী। কথায়–কথায় জানলাম, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠাতা জাভেদ ইকবাল মারা গেছেন। বর্তমানে দোকানটি পরিচালনা করছেন তাঁর ছেলে মো. তাহমিদ ও ছোট ভাই সাজেদ ইকবাল। আর যাঁর নামে এই দোকান, সেই রাখী এখন কানাডায় থাকেন।

ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নকশায়ও বদল এনেছে রাখী সুজ। তবে দামে সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও টেকসই জুতা বানানোই তাদের লক্ষ্য। জাভেদ ইকবাল বলতেন, ‘লাভ কম হোক, তবু যেন ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকেন। পরে জুতার প্রয়োজন হলে তিনি যেন আমাদের দোকানেই ফিরে আসেন।’ মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘বর্তমান বিক্রেতারাও মনে করেন, জুতার গুণগত মানই আমাদের এত দূর নিয়ে এসেছে। যে কারণে আমাদের কখনোই আলাদা করে বিজ্ঞাপন দিতে হয়নি। রাখীর জুতা যিনি একবার পরেন, তিনি ফিরে ফিরে আসেন। তাঁর কাছ থেকে শুনে আবার অন্যজন এসেছেন। আর এভাবে এখন তো প্রজন্ম ধরে অনেকে ক্রেতা হয়ে গেছেন। আমাদের ৯৯ শতাংশ ক্রেতাই নিয়মিত। ৩৫ বছরের পুরোনো ক্রেতাও আছেন, যাঁরা তখন ছোট ছিলেন, তারপর বড় হলেন, বিয়ে করলেন, তাঁরা এখন নাতিপুতি নিয়েও আসেন।’

৯ বছর ধরে রাখী সুজের ম্যানেজার আমজাদ হোসেন। তিনি জানান, নবাবগঞ্জে ২৫ জন কর্মচারী নিয়ে চলে তাঁদের প্রোডাকশন হাউস। থাইল্যান্ড ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা বিভিন্ন উপকরণেও প্রস্তুত হয় রাখীর জুতা ও স্যান্ডেল।

মিরপুর থেকে জুতা কিনতে আসা রাবেয়া ইসলাম বলেন, ‘তিন বছর আগে ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম এসেছিলাম। সেই থেকে নিয়মিত ক্রেতা। আমার পা তুলনামূলক একটু চওড়া। ফলে অন্য ব্র্যান্ডের জুতা পরে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।’

দোকানের একাংশে সাজিয়ে রাখা জুতার বাক্স
ছবি: এম এ হান্নান

নম্বরে নয়, নামে পরিচয়

দোকান ঘুরে দেখলাম বিভিন্ন ধরনের জুতা রয়েছে। ফ্ল্যাট স্যান্ডেল, কম হিল থেকে উঁচু হিলের জুতা, নাগরা, ক্যাজুয়াল শু, অফিস ওয়্যার, পাম্প শু, পার্টি শু ইত্যাদি। ঈদ উপলক্ষে ছেলেদের জন্য আমদানি করা পাকিস্তানি কাবুলি জুতাও আছে। অন্য সব ব্র্যান্ডের মতো রাখীর জুতাগুলোকে নম্বর ধরে ডাকা হয় না। এখানকার প্রতিটি জুতারই আছে আলাদা নাম। এই যেমন হেলেন, মোনালিসা, কবুতর কোলাপুরী, নাগপুরী, জয়পুরী, নিউ কাতান, রোজ, স্মৃতি, মুলতান, ঢেউ, সূর্য, মতি, পান্না, বর্ষা, বন্ধন, কুসুম, কদম, ক্যান্ডি, চাঁদনী, প্রীতি, হেমা, ইভা, জিগজ্যাগ, বুটিকস, ঝিনুক ইত্যাদি। নামের যেমন বাহার, নকশাতেও সেই ভাব।

আমজাদ হোসেন বলেন, ‘শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জুতার কাঠামো আমরা একই রকমভাবে ধরে রেখেছি। সময়ের সঙ্গে এসেছে নতুন সংযোজন। আশির দশকে জুতার রঙে অত বৈচিত্র্য ছিল না। ছেলেদের জুতা বলতে কালো, চকলেট আর বাদামি রঙের জুতা আর মেয়েদের বেলায় কালো, সাদা আর কফি রঙের জুতা। আমরা ধীরে ধীরে জুতায় আরও নানা রং পরিচিত করাই।’

অন্য ব্র্যান্ডে এখন যেখানে দুই হাজার টাকার নিচে জুতাই পাওয়া যায় না, সেখানে রাখীর জুতার সর্বোচ্চ দাম আড়াই হাজার। তবে ক্রেতাদের অনুরোধে ছেলেদের কিছু জুতা পাকিস্তান থেকে আমদানি করার কারণে সেগুলোর দাম একটু চড়া। সেটিও ছয় হাজারের মধ্যে।

আলোচনা আর ঘুরে দেখার একফাঁকে খেয়াল করলাম, দোকানে ক্রেতার ভিড় বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ৯ রমজান সকাল–সকাল দোকানে যে ভিড় চোখে পড়ল, তাতে অনুমান করা যায়, ঈদের কাছাকাছি সময়ে দোকানের অবস্থা কী হবে।

আরও পড়ুন