দোকানে এখন কোন ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে, জানালেন বিক্রয়কর্মীরা
ঈদ ঘিরে ফ্যাশন হাউসগুলোতে এখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় পছন্দের পোশাকের সাইজ না পাওয়া, ট্রায়াল কক্ষে দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা শপিং ব্যাগের মতো বিষয় নিয়ে তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বিক্রয় সহকারীদের। অনেক সময় নেতিবাচক ঘটনাও ঘটে যায়। তবে বিক্রয় সহকারীদের চেষ্টা থাকে সবকিছু যেন সামলাতে পারেন হাসিমুখেই। কয়েকটি দোকান ঘুরে জানা গেল কোন বিষয়গুলোর কারণে তৈরি হয়ে যায় মনোমালিন্য বা হট্টগোল।
সাইজ পেতে শোরগোল
আউটলেটগুলোতে উৎসবের কেনাকাটায় একেবারে শেষ সময়ে উপযুক্ত সাইজের পোশাক পেতে বাধে বিপত্তি। এটিকে কেন্দ্র করে বিক্রয় সহকারীদের ওপর চড়াও হন অনেক ক্রেতা। আবার অনেক সময় সাইজ নিয়ে ক্রেতাদের নিজেদের মধ্যেও বাধে ঝামেলা। দেখা যায়, একই সাইজ দুজনেরই প্রয়োজন, কিন্তু ওই সাইজের একটা পোশাকই আছে। সে ক্ষেত্রে বিক্রয় সহকারীরা দোকান থেকে বাসার দূরত্ব এবং জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় একজন ক্রেতাকে পণ্যটি দেন এবং অপরজনের কাছে সময় চান। বিক্রয় সহকারীদের তিক্ত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আছে মজার অভিজ্ঞতাও। সোবহানবাগে অবস্থিত কে ক্র্যাফটের শপ ম্যানেজার আল আমিন হায়দার বলছিলেন, ‘একবার এক ক্রেতা একটা করে পছন্দ করছিলেন। আমরা বলছিলাম, সরি স্যার, এটার সাইজ নেই। উনি তো রেগেমেগে শেষ! আসলে আমাদের অনেক প্রোডাক্ট ছিল, কিন্তু ওনার যেটা পছন্দ হচ্ছিল, সেটার সাইজই হচ্ছিল না। পরবর্তীতে উনি কিছু না কিনেই চলে যান।’
ট্রায়াল কক্ষে তুঘলকি
উৎসবের সময় বিক্রয় সহকারীদের ট্রায়াল কক্ষ সামাল দিতে খেতে হয় হিমশিম। দোকানগুলোতে সাধারণত চার থেকে ছয়টি ট্রায়াল কক্ষ থাকে। শেষ সময়ের কেনাকাটায় ট্রায়াল কক্ষের সামনে থাকে লম্বা সারি। অনেকে তাড়া দেখিয়ে আগে যেতে চান। অনেকে আবার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পোশাক দেখতে চলে যান। ফিরে এসে আগের জায়গা ফেরত চান। কেউ আবার ট্রায়াল করতে বেশি সময় লাগিয়ে ফেলেন। এসব নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে শুরু হয় ঝগড়া। কিছু ক্রেতা আবার ট্রায়ালের পোশাক পরে দীর্ঘ সময় আউটলেটের মধ্যে ঘোরাফেরা করেন। বিক্রয় সহকারীরা বাধা দিলে খারাপ আচরণও করেন। বিক্রয় সহকারীর মুখের ওপর কাপড় ছুড়ে মারার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা ঠান্ডা মাথায় সামলে যেতে হয় বিক্রয় সহকারীদের। ক্লাব হাউসের বিক্রয়কর্মী মো. মেহেদী হাসান বলছিলেন, ‘আমাদের কাজই এটা। খারাপ লাগে অনেক সময়। কিন্তু আমাদের পেশায় কাস্টমার ইজ অলয়েজ রাইট।’
ব্যাগ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা
আড়ং–এ কেনাকাটায় এখন শপিং ব্যাগ কিনে নিতে হয়। পরিবেশ রক্ষায় ব্যাগের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এটি নিয়ে ক্রেতাদের অনেকের আছে অসন্তোষ। বিক্রয় সহকারীদের সঙ্গে কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন বাগ্বিতণ্ডায়। আড়ং–এর একটি শাখার বিক্রয় সহকারী রাবেয়া হোসেন মাইশা বলছিলেন, ‘আমরা ধৈর্য নিয়ে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে অনেকেই খুব বাজে ব্যবহার করে। তখন মন খারাপ হয়। ব্যাগ নিয়ে ঘটে মজার ঘটনাও।’ মাইশা বলছিলেন, “এক ক্রেতা একবার বললেন, টাকা দিয়ে কেন লোগোসহ ব্যাগ কিনব?” তো আমাদের লোগো ছাড়াও একটা ব্যাগ আছে। তখন আমরা তাকে সেটা দিই। উনি তখন লোগোসহ ব্যাগটাই চেয়ে নেন।’ ক্রেতার বাইরেও অনেকে আবার আসেন ‘ভাইরাল ভিডিও’ বানানোর উদ্দেশে। চেষ্টা করেন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করতে। বিক্রয় সহকারীরা তাঁদের সামলাতে সাহায্য নেন ঊর্ধ্বতনদের।
শিশুদের পোশাক
ফ্যাশন আউটলেটগুলোতে যাঁরা নিয়মিত কেনাকাটা করেন, তাঁদের দাম নিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা থাকে। তবে একেবারে প্রথমবারের মতো কিছু ক্রেতা আসেন। তাঁরা অনেক সময় দাম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিক্রয় সহকারীরা হাসিমুখে সেসবের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন।
শিশুদের পোশাকের অংশে অভিভাবকদের মধ্যে সমস্যা তৈরি হয়। মাঝেমধ্যে দুটি শিশু একই পোশাক নেওয়ার জন্য বায়না শুরু করে। সেটার স্টক বা সাইজ না থাকলে উভয় অভিভাবকই সেটা নিতে চান। এটাকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়ে যায় উত্তেজনা। এসব সমস্যা মেটাতে পারলে ক্রেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্বও তৈরি হয় বিক্রয় সহকারীদের। সারা লাইফস্টাইলের সেলস এক্সিকিউটিভ নাদিয়া ইসলাম বলছিলেন, ‘যখন নতুন ছিলাম, তখন খুব ঘাবড়ে যেতাম। এখন ওরকম হয় না। কিছু ক্রেতা আছেন, ব্যবহার খুবই ভালো, পরিবারের সদস্যদের মতো ব্যবহার করেন।’
মানসিক চাপ মেনে নিতে হয়
ক্রেতাদের খারাপ ব্যবহার বিক্রয় সহকারীদের ওপর মানসিক চাপও তৈরি করে। তাঁরা জানাচ্ছিলেন, অনেক সময় এর প্রভাব পড়ে তাঁদের পরিবারের ওপর। ফ্যাশন আউটলেটগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর আবেগ নিয়ন্ত্রণে বিক্রয় সহকারীদের নিয়ে আলোচনায় বসে। কিছু দোকানে বিক্রয় সহকারীদের জন্য আছে উত্তেজিত ক্রেতার মুখোমুখি হওয়ার পর কিছুটা একান্তে সময় কাটানোর ব্যবস্থা। যাঁরা পেশাদার বিক্রয় সহকারী, তাঁরা অনেকটাই এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তবে কিছু বিক্রয় সহকারী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসেন, সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ দিন। তাঁদের বলা হয় ‘প্যাকেজ’। সেসব বিক্রয় সহকারীদের ওপর এ ধরনের পরিস্থিতি বেশি মানসিক চাপ তৈরি করে।