কেবল গান বা অভিনয়ে নয়, ডলি পার্টন বেঁচে থাকবেন ৩০ কোটি বইয়ের পাতায়
ডলি পার্টনকে বলা হয় ‘কুইন অব কান্ট্রি’, অর্থাৎ কান্ট্রি মিউজিকের রানি। গান গেয়ে পেয়েছেন বিশ্বজোড়া খ্যাতি। কিন্তু পৃথিবীকে দিয়ে যাওয়া তাঁর সবচেয়ে সুন্দর স্মারক কেবল গান নয়, বইও। তা–ও একটি–দুটি নয়, ৩০ কোটি! ১৯৯৫ সালে নিজের এলাকার শিশুদের বই উপহার দেওয়ার উদ্যোগটি শুরু করেছিলেন ডলি। এখন পর্যন্ত এ উদ্যোগের মাধ্যমে ৩০ কোটি বই উপহার পেয়েছে শিশুরা। এসব বই প্রতি মাসে পৌঁছে যায় একেকটি শিশুর কাছে। এর মধ্য দিয়ে শিশুদের সামনে খুলে যায় কল্পনা, স্বপ্ন এবং অন্য এক পৃথিবী আবিষ্কারের জানালা। তাই ডলি পার্টন কেবল ‘গানওয়ালা’ হিসেবে নন, হাজারো শিশুর স্মৃতিতে থাকবেন একজন ‘বইওয়ালা’ হিসেবেও।
গত ২৫ আগস্ট ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন মার্কিন গায়িকা, গীতিকার, অভিনেত্রী ও মানবহিতৈষী ডলি পার্টন। মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে, ২১ আগস্ট নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে এক ভিডিও বার্তায় শেষবারের মতো দেখা যায় তাঁকে।
সেদিন বলেছিলেন, জীবনসঙ্গী কার্ল ডিনের অসুস্থতা ও মৃত্যু নিয়ে তিনি ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন; মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছেন। ফলে নিজের শারীরিক সমস্যাগুলোর দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেননি।
তবে অসুস্থতা ডলি পার্টনকে কাজ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। আরও জানিয়েছিলেন, তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন (তখন কে জানত আয়ু আর মাত্র চার দিন!)। আর যত দিন সম্ভব কাজ করে যেতে চান। তাঁর ভাষায়, জীবনে তিনি এত স্বপ্ন দেখেছেন যে এখনো বেশির ভাগই বাস্তবে রূপ দেওয়া বাকি।
প্রেম ও বিয়ে মিলিয়ে একসঙ্গে প্রায় ছয় দশক কাটিয়েছেন ডলি ও কার্ল। ২০২৫ সালের ৩ মার্চ কার্ল ডিনের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন ডলি। তীব্র শোকে এলোমেলো হয়ে যায় তাঁর প্রায় সবই। স্বামীকে উৎসর্গ করে প্রকাশ করেন ‘ইফ ইউ হ্যাড নট বিন দেয়ার’ গানটি।
কার্ল বরাবরই পাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরে থেকেছেন; কিন্তু ডলির পাশে ছিলেন ছায়ার মতো এবং স্ত্রীর ক্যারিয়ারের জন্যও নিজের সবটুকু করার চেষ্টা করেছেন।
ক্ষুধা থেকে বাঁচতে ৬ বছরেই গান
১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির পিটম্যান সেন্টারে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম ডলির। ১২ ভাইবোন নিয়ে মা–বাবার বিশাল পরিবার, অর্থকষ্ট ছিল প্রবল। ছোটবেলায় কখনো কখনো পর্যাপ্ত খাবারও জুটত না।
মূলত ক্ষুধার কষ্ট থেকে বাঁচতেই মাত্র ছয় বছর বয়সে ডলি গির্জায় গিটার বাজিয়ে গান গাইতে শুরু করেন। আর তার পরপরই নিজেই গান লিখে, সুর করে গাইতে থাকেন।
‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’
হাইস্কুল শেষ করে ১৯৬৪ সালে ন্যাশভিলে পাড়ি জমান ডলি। সেখানে ক্লাবে গান গাওয়ার পাশাপাশি অন্য শিল্পীদের জন্য গান লিখতেন। তাঁর নিজের ভাষায়, গানই তাঁকে পাহাড়ি এলাকা থেকে বের করে তাঁর স্বপ্নের পৃথিবীতে নিয়ে গিয়েছিল।
ডলির বড় সুযোগ আসে সংগীতশিল্পী পোর্টার ওয়াগনারের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর। প্রথম দিকে তাঁর সাফল্যের বড় অংশই ছিল ওয়াগনারের সঙ্গে দ্বৈত গান।
তবে ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠানটি ছেড়ে নিজের একক ক্যারিয়ারে মন দেন। ওয়াগনারকে বিদায় জানিয়ে লেখেন বিখ্যাত গান ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। পরে ১৯৯২ সালে আরেক বিখ্যাত গায়িকা হুইটনি হিউস্টন গানটি নতুনভাবে গেয়ে এটিকে অমরত্ব দেন।
ডলির নিজেরও ছিল একের পর এক হিট গান। তাঁর ক্যারিয়ারে এসেছে ১৬ কোটির বেশি অ্যালবাম বিক্রির রেকর্ড। হাতে উঠেছে ১১টি গ্র্যামি, একাধিক এমি ও কান্ট্রি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড। ১৯৯৯ সালে কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমে এবং ২০২২ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে উঠে আসে তাঁর নাম।
গানের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের জায়গা তৈরি করেন ডলি। ১৯৮০ সালের ‘নাইন টু ফাইভ’ সিনেমায় জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে অভিনয় তাঁর সিনেমার ক্যারিয়ারের বড় সাফল্য এনে দেয়। পরেও বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করে অভিনেত্রী হিসেবে নিজের নাম পাকাপোক্ত করেন।
একে একে ৩০ কোটি বই
কেবল গায়িকা, নায়িকা বা শিল্পী নন, ডলি পার্টন মানবহিতৈষী হিসেবেও অনেক বড়। মানুষের জন্য কাজ করা ছিল তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডলির প্রতিষ্ঠিত ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের বিনা মূল্যে বই দেওয়া হয়। এ উদ্যোগের পেছনে আছে ডলির নিজের বাবার গল্প।
ডলির বাবা দারিদ্র্যের কারণে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। ডলি মনে করতেন, জীবনে শিক্ষার এই ঘাটতি তাঁর বাবার অনেক স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাবার পড়তে বা লিখতে না পারাই শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার তাড়না জুগিয়েছিল ডলির ভেতরে।
১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে নিজের জন্মস্থানে এ উদ্যোগ শুরু করেন ডলি পার্টন। উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করা।
এরপর ধীরে ধীরে কর্মসূচিটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডেও চালু হয়। ২০২৫ সালে কর্মসূচিটির ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার সময় পর্যন্ত ৩০ কোটির বেশি বই শিশুদের কাছে পৌঁছে গেছে।
বর্তমানে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী ৩০ লাখের বেশি শিশু এ কর্মসূচির আওতায় প্রতি মাসে একটি করে বই পায়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে ডলি প্রতিষ্ঠা করেন জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ‘ডলিউড’।
তাঁদের কথা
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের এক মা হ্যারিয়েট অ্যানসকম্বের অভিজ্ঞতা শুনুন। মেয়ের বয়স যখন মাত্র তিন মাস, তখন তিনি তাকে ডলি পার্টনের ইমাজিনেশন লাইব্রেরিতে যুক্ত করেন। এখন মেয়ের বয়স চার বছর।
প্রতি মাসে বাড়িতে বই আসার কারণে শিশুটির ভেতরে খুব ছোটবেলা থেকেই গল্প পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। মায়ের মতে, এ বইগুলো না এলে হয়তো দুই বছর বয়সের আগে তিনি মেয়েকে নিয়মিত গল্প পড়ে শোনানোর অভ্যাস তৈরি করতে পারতেন না।
ব্রিটিশ লেখক সেলিনা ব্রাউনের বইও এ কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। তাঁর বইয়ের প্রায় ১৪ হাজার কপি যুক্তরাজ্যের শিশুদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই লেখক বলেন, ‘একটি পরিবারের কাছে খাবার, বিদ্যুৎ বা গ্যাসের মতো মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে বই কেনার প্রতিযোগিতা হলে বই টিকবে না। কিন্তু ইমাজিনেশন লাইব্রেরি সেই সমস্যা দূর করে, শিশুর হাতে বই তুলে দেয়। এই ৩০ লাখ শিশু ভাগ্যবান! আমরা পৃথিবীর সব শিশুকে এ উদ্যোগের অধীন আনতে চাই।’
তাই কেবল গান বা সিনেমা নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের শিশুদের কল্পনা ও স্বপ্নের ভেতর থাকবেন ডলি। পৃথিবীতে একটু সুন্দর করে বাঁচার সংগ্রামে আশার আলো হয়ে বেঁচে থাকবেন একজন ডলি পার্টন!
সূত্র: বিবিসি ও পিপল