এই দক্ষতা ছাড়া ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হবে
আগামীর দুনিয়ায় যে দক্ষতাগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যে একটি হলো ক্রিটিক্যাল থিংকিং। অর্থাৎ যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, কোনো বিষয় গভীরভাবে বিশ্লেষণ। শিক্ষাজীবনে তো বটেই, পেশাজীবনে সফলতার জন্যও এই চর্চা খুব প্রয়োজন। কীভাবে রপ্ত করবেন ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের দক্ষতা? লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক খালেদ মাহমুদ
সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, কিংবা জটিল সমস্যার গভীরে পৌঁছানোর জন্য ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা। বাংলায় আমরা বলতে পারি ‘যৌক্তিক চিন্তাভাবনা’। এ প্রসঙ্গে রলফ ডাবেলির একটা বিখ্যাত বই আছে—দ্য আর্ট অব থিংকিং ক্লিয়ারলি। আপনি শিক্ষার্থীই হন, কিংবা পেশাজীবী, ‘চিন্তা করার’ চর্চা আপনাকে করতেই হবে।
ক্রিটিক্যাল থিংকিং অনুশীলনের জন্য কয়েকটি বিষয় আমি ক্লাসে আমার শিক্ষার্থীদের সব সময় বলি। এসব পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।
প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন করুন
যেকোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বাস করবেন না। রলফ ডাবেলি দেখিয়েছেন যে আমরা প্রায়ই ‘কনফার্মেশন বায়াসের’ শিকার হই। অর্থাৎ কেবল সেই তথ্য বা কথা গ্রহণ করি, যা আমার বর্তমান বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে। তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন, আমি কেন কোন কথা বিশ্বাস করছি? এর বিপরীত কোনো প্রমাণ কি আছে? হয়তো বাসে বা গাড়িতে বসে আছেন, লম্বা কোনো যাত্রায় আছেন, এ সময়ে বসে বসে চর্চাটা করতে পারেন।
ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজুন
আমরা অনেক সময় দুটি ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক দেখে মনে করি একটি অন্যটির কারণ। কোনো একটি ঘটনা ঘটার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, গভীরভাবে তা বিশ্লেষণ করুন, ভাসা ভাসা তথ্যের ওপর নির্ভর করবেন না। ক্লাসে পড়ার সময় কোনো একটা কেস স্টাডি ভালো করে বিশ্লেষণ করে দেখুন।
কনফার্মেশন বায়াস এড়িয়ে চলুন
নিজের মতামতের সপক্ষে প্রমাণ না খুঁজে বরং নিজের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করুন। যখন আপনি নিজের ভুলগুলো ধরতে পারবেন, তখনই আপনার চিন্তাভাবনা আরও ধারালো হবে। এটি সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর সবচেয়ে ভালো উপায়। যেকোনো একটি পডকাস্ট শুনে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে দেখতে পারেন। নিজেই নিজের চিন্তার পাল্টা যুক্তি দাঁড় করান, অন্যের জুতায় পা গলিয়ে কোনো একটা পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা করুন।
ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসুন
আমরা কোনো একটা কিছুর পেছনে অনেক পরিশ্রম, সময় বা টাকা বিনিয়োগ করে ফেললে, সেটি কাজ না করলেও কেবল মায়ার কারণে আঁকড়ে ধরে রাখি। একে বলা হয় ‘সাংক কস্ট ফ্যালাসি’। ক্রিটিক্যাল থিংকার হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, কোনো কিছু কাজ না করলে তা ছেড়ে দেওয়ার সাহস রাখা।
সামাজিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবেন না
সবাই যে কাজ করছে তা-ই সঠিক, এমন ভাবা ভুল। ভিড়ের অংশ না হয়ে নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করুন। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো অনেক সময় ভুল হতে পারে, তাই নিজের যুক্তিকে প্রাধান্য দিন। ক্লাসের কোনো লেকচারকে ভিন্নভাবে বন্ধুর কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করুন। যুক্তি দিয়ে কোনো বিষয়কে প্রশ্ন করুন।
অতিসরলীকরণ বর্জন করুন
জটিল সমস্যার সহজ সমাধান সব সময় সঠিক হয় না। আমরা প্রায়ই স্টোরি বায়াসে আক্রান্ত হই। সবকিছুকে একটি সহজ গল্পের মাধ্যমে বুঝতে চাই। বাস্তব পরিস্থিতি অনেক সময় জটিল ও বহুমুখী হয়। প্রতিটি দিক আলাদাভাবে বিচার করার অভ্যাস করুন। আজকের দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতার কোনো শিরোনামকে নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করুন। ভাবুন, শিরোনামটা এ রকম না হয়ে আর কী কী হতে পারত, কেন এমন হলো…
তথ্যের উৎস যাচাই করুন
বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাব প্রকট। কোনো তথ্য পাওয়ার পর তার উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, পরীক্ষা করুন। তথ্যের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট মহলের স্বার্থ কাজ করছে কি না, তা-ও খেয়াল রাখুন। আজ অনলাইনে যে ভাইরাল পোস্ট পড়েছেন, তার সূত্র কোথায়, খুঁজে বের করুন। কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদের শিরোনাম দেখেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাবেন না। পুরো খবর পড়ুন। কোথাও খটকা লাগলে অন্যান্য সোর্স থেকে যাচাই করুন।
বিকল্প চিন্তার অভ্যাস
যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিকল্প চিন্তা করুন। কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’তে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও কী কী সম্ভাবনা থাকতে পারে, ভাবুন। বিকল্প চিন্তা আমাদের মস্তিষ্কের জড়তা কাটিয়ে দেয়। মাঝেমধ্যে ভিন্ন বিষয়ের কোনো সেমিনারে অংশ নিতে পারেন। বাংলা একাডেমি কিংবা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নানা ধরনের সেমিনার হয়। অংশ নিয়ে দেখুন, অন্যরা কী ভাবছেন। যাঁরা আপনার মতো নন, কিংবা যাঁদের সঙ্গে আপনার মতামতের ভিন্নতা আছে, তাঁদের কথাও মন দিয়ে শুনুন।
আবেগের ওপর যুক্তির নিয়ন্ত্রণ
আবেগ মানুষের সহজাত, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আবেগ অনেক সময় আমাদের অন্ধ করে দেয়। কোনো বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে কিছুটা সময় নিন। শান্ত মাথায় যুক্তি দিয়ে বিষয়টি বিচার করার চেষ্টা করুন।