চূর্ণ পাথর আর বালুর ওপর দিয়ে পর্বতে উঠতে উঠতে মনে হলো, এ পথে হেঁটে নামব কী করে?

আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত কিলিমানজারোতে গিয়েছিলেন ইফতেখারুল ইসলাম। পর্বত আরোহণ ছাড়াও তানজানিয়ায় জাতীয় উদ্যানে সাফারি করেছেন তিনি। এ সফরের গল্প নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন। আজ পড়ুন অষ্টম কিস্তি।

বারাফু ক্যাম্পের পথে লেখকছবি: ইফতেখারুল ইসলামের সৌজন্যে

কারাঙ্গা ক্যাম্পের রাতটা সহজ ছিল না। ঠান্ডা তো বেড়েছেই। রাতে তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের নিচে। সেই সঙ্গে আছে ঝোড়ো হাওয়া। তাঁবুর ভেতরে শুয়ে মনে হচ্ছিল যেকোনো সময় তাঁবুটা ঝোড়ো বাতাসে উড়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় ঘুমাব কী করে? সকালের আরোহণ আর সারা দিনের ট্রেকের ক্লান্তি ঠিকই একসময় ঘুম এনে দেয়। এমনিতেই রাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙে যায় আমার। তখন প্রথমেই বুঝে নিই, মাথার ওপর তাঁবু ঠিকঠাক আছে কি না। ভোরে যখন উঠি তখন চারদিক শান্ত। বাতাস হয়েছে মৃদু।

ট্রেকের ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ ৩ আগস্ট আমরা বারাফু ক্যাম্পের দিকে যাত্রা করি। সকালে কারাঙ্গা ক্যাম্প থেকে রওনা হয়ে দুপুরের মধ্যেই চলে আসি বারাফু ক্যাম্পে। ৪ হাজার ৬৭৩ মিটার উচ্চতায়। বারাফু শব্দের অর্থ বরফ। তার মানে একসময় এ অঞ্চল বরফে ঢাকা ছিল। এখন তুষারপাত কমেছে। কিলিমানজারোর তুষার গলে গলে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।

এটাও আলপাইন ডেজার্ট এরিয়া। যে জায়গাটায় আমাদের তাঁবু বসানো হয়েছে, তা খুবই উঁচু-নিচু। পায়ের নিচে শুকনো মাটি ও চূর্ণ পাথর। ডাইনিং তাঁবু থেকে নিজের তাঁবুতে যাওয়া মানে একটা কঠিন ট্রেক। মনে হলো দুহাতে ট্রেকিং পোল থাকলে সুবিধা হতো।

এখান থেকেই রাতে সামিট পুশ করব আমরা। তাই যত তাড়াতাড়ি এই ক্যাম্পে এসে বিশ্রাম নেওয়া যায়, ততই মঙ্গল। এত দিন সব সময় আমাদের দিনের বেলা শুতে বা ঘুমাতে নিষেধ করা হয়েছে। আজ বলা হলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খেয়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে নিতে। বিকেলে কেউ কেউ আরও একটু ওপরের দিকে হেঁটে এল। বিকেলের আলোয় জাকির বেশ কিছু ছবি আর ভিডিও করে। দিনের আলো যত কমে আসে ঠান্ডায় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তত কঠিন হয়ে যায়। সন্ধ্যায় ডিনারের পর ঘুমিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চাইলেই কি আর অসময়ে ঘুমিয়ে পড়া যায়? তা–ও আবার এই উচ্চতায়। ঘুম না এলেও স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকি। কিছুটা বিশ্রাম নিলে হয়তো সামিট পুশ করার শক্তি পাওয়া যাবে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাইড ডেকে দিল। ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে সামিটের পোশাক পরে সন্ধ্যার পর থেকেই তৈরি ছিলাম। তবু আবার সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না, চেক করে তাঁবু থেকে বেরোলাম।
এত ঠান্ডা বাতাসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। পাহাড়ের ওপর হাঁটব কী করে? ভাবতে ভাবতেই ডাইনিং টেন্টে চলে গেলাম। সবাই এক বাটি স্যুপ আর এক টুকরো রুটি খেয়ে একে একে বেরোলাম তাঁবু থেকে। সবার সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি আছে কি না, সেটাও চেক করে নিল আমাদের গাইড। আমি সামিট প্যান্ট বা ডাউন প্যান্ট পরিনি। ট্রেকিং প্যান্টের নিচে পরেছি তিনটা লেয়ার। গায়ে পর্যাপ্ত লেয়ার এবং ডাউন জ্যাকেট আছে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে মনে হয় সেসব কিছুই যথেষ্ট নয়। হাতে ও পায়ে প্রচন্ড ঠান্ডা লাগছে। বারবার দেখছি, আমার হাতের গ্লাভস আর তার ভেতরের লাইনার ঠিকমতো কাজ করছে কি না। এরপর একে একে হেডল্যাম্পের মৃদু আলোয় ঠিক মধ্যরাতে হাঁটা শুরু হলো আমাদের।

আকাশে চাঁদ আছে। আছে অনেক তারা। কিছু কিছু নক্ষত্রমণ্ডলী বেশ কাছে মনে হয়। পরে দেখি তারারা নড়ছে। তা কী করে হয়? এখান থেকে দূরের পাহাড় ঘন কালো দেখায়। সেই কৃষ্ণবর্ণের ওপর সারিবদ্ধ হয়ে পর্বতে আরোহণ করছেন আরও অনেক অভিযাত্রী, যাঁরা আমাদের অনেক আগেই বের হয়েছেন। তাঁদের কপালে বাঁধা আলোগুলো সারিবদ্ধ হয়ে একটু একটু করে ওপরে উঠছে। তাঁদের অনেক পেছনে আমরাও চলছি। মাথায় আলো জ্বালিয়ে খোলা আকাশের নিচে। পথ চলছি তো চলছিই। বড় বড় পাথর ডিঙিয়ে অনেকটা খাড়া চড়াই ধরে উঠতে হয়। আমাদের কয়েকজন যাঁরা একটু দ্রুত হাঁটেন, তাঁরা বেশ এগিয়ে গেলেন। কয়েকজন রয়ে গেলেন অনেকটা পেছনে। নিচে থেকে অন্যরা হয়তো এখন আমাদের কপালের আলোটাকেও আকাশের গায়ে নক্ষত্র বলে ভাবছেন।
আমাদের গাইড হাফিজের সঙ্গে হাঁটছিলাম আমরা কয়েকজন। এক ঘণ্টা যায়, দুই ঘণ্টা যায়। খুব বেশি দূর এগোতে পেরেছি বলে মনে হয় না। আমাদের কারও কারও হেডল্যাম্পের ব্যাটারি বদলাতে হয়। আমার নিজের আলো দুর্বল হয়ে এসেছে। কতক্ষণ হয়েছে? প্রচন্ড ঠান্ডায় ফোন বের করে দেখার উপায় নেই। চাঁদের আলো যথেষ্ট নয়। একটা পর্যায়ে নিজের হেডল্যাম্প বাদ দিয়ে গাইডের হেডল্যাম্পের আলোয় চলতে শুরু করি।
মাথার ওপর আকাশটাকে ছাদের মতো লাগে। যত ওপরে উঠছি ততই ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি। থামলে আরও বেশি ঠান্ডা লাগে। আবার একটানা একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে উঠি। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিসের জন্য পর্বতের ডাক শুনে এ রকম অন্ধকারে হিম ঠান্ডায় পাথর ডিঙিয়ে ওপরে উঠছি? তার চেয়ে ঘরে শুয়ে বসে অন্য অভিযাত্রীদের ফেসবুক লাইভ দেখা আর লাভ রিঅ্যাক্ট দেওয়া অনেক আরামের। বড়জোর হয়তো বলতাম, আমাকে জানালে আমিও যেতাম...!

রাত শেষে কিলিমানজারোর ওপর থেকে দেখা আলোকিত আকাশ
ছবি: ইফতেখারুল ইসলাম

চাঁদ ও তারারা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে। একসময় পুবের আকাশে একটু একটু করে আগুন ধরে যায়। আবিরের রং ছড়িয়ে পড়ে। একটু পরেই আমাদের মাথার ওপর আকাশ আলোয় ভরে ওঠে। নিচে সাদা মেঘের সমুদ্র। ঠিক যেমন দূরগামী বিমানের জানালা দিয়ে দেখা যায়। মনে হলো আমরা প্রায় জেট বিমানের উচ্চতায় উঠে এসেছি। ঠান্ডা এখানে আরও বেশি কিন্তু ক্রমাগত হাঁটছি বলে শরীর উষ্ণ হয়েছে। ঠান্ডা কিছুটা সহনীয় হয়ে এসেছে। গ্লাভস খুলে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ছবি তুলি। তারপর আবার শুরু করি আরোহণ।
রেবমান আর রাতজেল এই দুটো গ্লেসিয়ারের মাঝখান দিয়ে হেঁটে আমরা কিবো শিখরের কাছাকাছি এসে গিয়েছি। কিলিমানজারোতে যে অল্প কয়েকটা হিমবাহ এখনো টিকে আছে তার মধ্যে এই দুটি অন্যতম। খাড়া চড়াই ধরে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে হেঁটে চলেছি। অনেকটা জায়গাজুড়ে পায়ের নিচে কেবলই চূর্ণ পাথর ও বালু। এর ওপর দিয়ে হেঁটে পর্বতারোহণ খুবই ক্লান্তিকর। উঠতে তবু পারছি। তবে এ পথে নামব কী করে? গাইডরা যথাসাধ্য উত্সাহ দিয়ে চলে। বলে, এই তো আর একটুখানি পথ বাকি। পোলে পোলে...।

বারাফু ক্যাম্পে লেখক
ছবি: ইফতেখারুল ইসলামের সৌজন্যে

ক্লান্ত আমরা সবাই। একটু পরপর বিরতি নিতে হয়। কেউ কেউ একটু বেশি বিরতি নিতে চান। হাফিজ বা তৌহিদ জিজ্ঞেস করে, ‘আর ইউ অলরাইট?’
কে যেন বলল, ‘নো, আই এম স্লিপি অ্যান্ড টায়ার্ড’।
কেউ একটু ঘুমিয়ে নিতে চান। এটা বেশ ভয়ের কথা। গাইড অবশ্যই তা করতে দেবে না। হাফিজ বলে, ‘নো ওয়ারিজ, ইউ আর ডুইং ফাইন’।
ইতিমধ্যে আমাদের দলের দু–একজন উচ্চতাজনিত সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁদের দ্রুত নিচে নেমে যেতেই হয়। আরও কয়েকজন সঙ্গী বেশ পিছিয়ে পড়েছেন। ভোরের নরম আলোয় ওপরের দিকটা দেখতে পাচ্ছি। নবীন ও প্রবীণ মিলে বেশ কজন সামনে আছেন। অণু, আতিফ, ওয়াসিক, জাকির ও মাহবুব ভাই। ক্লান্ত হলেও দৃঢ়পায়ে এগিয়ে চলেছেন। আর আমরা অল্প কয়েকজন—আমিন ভাই, মাহফুজা মিষ্টি, আনিস ভাই আর আমি সামনের দলটার কাছাকাছি। (চলবে)

আরও পড়ুন