আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতে তৈরি হয়েছে ৩০০ ফুট উঁচু ‘লাভা টাওয়ার’

আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত কিলিমানজারোতে গিয়েছিলেন ইফতেখারুল ইসলাম। পর্বত আরোহণ ছাড়াও তানজানিয়ায় জাতীয় উদ্যানে সাফারি করেছেন তিনি। এ সফরের গল্প নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন। আজ পড়ুন ষষ্ঠ কিস্তি।

লাভা টাওয়ারছবি: ইফতেখারুল ইসলাম

আগস্টের ১ তারিখ আমাদের ট্রেকের চতুর্থ দিন। এদিন আমাদের লক্ষ্য বারাংকো ক্যাম্প। প্রথমে শিরা প্লাটুতে হেঁটে তারপর শৈলশিরা ধরে ট্রেক করে আমরা পূর্ব দিকে এগিয়ে যাই। কিবো চূড়ার দিকের পথের জংশন পার হয়ে আমরা চলি লাভা টাওয়ারের দিকে, ৪ হাজার ৬৫০ মিটার উচ্চতায়। নাম থেকেই বোঝা যায় প্রাচীনকালে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাতের ফলে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে এই লাভা টাওয়ার। শুধু এই বিশাল পাথরের টুকরাটি ৯০ মিটার বা প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু। আমরা ৪ হাজার ৬৫০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে টাওয়ার দেখি। একই দিনে ট্রেক করে এত উঁচুতে আরোহণ করে তারপর অনেকটা নিচে নেমে ক্যাম্পে যেতে হয় বলে এটা পর্বতারোহণে বিশেষভাবে সহায়ক। এর নাম এক্লাইমেটাইজেশন।

টাওয়ারের গোড়ায় একটা উঁচু চত্বরে খুবই অস্থায়ীভাবে বসানো হয়েছে আমাদের মেস টেন্ট। লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা কয়েকজন প্রথম ব্যাচে লাঞ্চ করে এখান থেকে নিচের দিকে নেমে যাই। পরে যে যখন পৌঁছাতে পারবেন, তখনই লাঞ্চ করে ক্যাম্পের দিকে যাবেন। নিচের দিকে যাওয়ার সময় অনেকটা পথ প্রায় সমতল। অঞ্চলটি আধা মরুভূমি। চারদিকে চূর্ণ পাথর আর শুকনা মাটি। কিন্তু কিছু অংশে বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে নিচে নামতে হয়। ও রকম পাথরের স্তূপে ঠিক ঠিক পথ খুঁজে পাওয়া আর নিরাপদে পা ফেলে গড়িয়ে না পড়ে নিচে নামতে পারা রীতিমতো কঠিন। অল্প কয়েক ঘণ্টায় মোট ৭৫০ মিটার নেমে যাওয়ার জন্য এ রকম বেশ কিছু খাড়া উতরাই পার হতে হয়।

বারাংকো ক্যাম্প ৩ হাজার ৯০০ মিটারে। এদিন রাস্তা যেন শেষই হতে চায় না। সকালে লাভা টাওয়ারের দিকে চলার সময় একটা চড়াই পার করে ভেবেছি এই বুঝি গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। কিন্তু তারপরই সামনে আরেকটা দিগন্তছোঁয়া পাহাড় এসে সামনে দাঁড়ায়। বিকেলে লাভা টাওয়ার থেকে নামার সময়ও এ রকম। অনেক কষ্টে সাবধানে পা ফেলে একটা খাড়া উতরাই পার হয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। দূরে কোথাও আমাদের তাঁবুর চিহ্ন দেখতে চেষ্টা করি। একটু পরেই আসে আর একটা পাথরের পাহাড়। ট্রেকিং পোল তুলে রেখে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে পা ফেলে সাবধানে নামি। এই করে করে শেষ বিকেলে গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছাই।

জায়ান্ট গ্রাউন্ডসেল
ছবি: ইফতেখারুল ইসলাম

ক্যাম্পে পৌঁছানোর ঠিক আগে একটা জায়গাতে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ফুলের অরণ্য দেখতে পাই। ছোট ছোট গাছে সাদা ও নানা রঙের ফুল। এখানে এই মরুভূমির ভেতরে এমন স্বর্গোদ্যান কীভাবে তৈরি হলো? এত যত্নে কে ফোটাল এত ফুল? ফুলবাগানের অন্য পাশে দেখি অনেকগুলো জায়ান্ট গ্রাউন্ডসেল। আগের দিন পথের পাশে কয়েকটা গাছ দেখেছিলাম, এগুলো তার চেয়েও বড়। সংখ্যায় অনেক বেশি। সতেজ সবুজ পাতা। তার মানে কাছেই কোথাও জলের উত্স আছে। একটু এদিক–ওদিক খুঁজতেই পেয়ে গেলাম শীর্ণ একটা ঝরনার ধারা। এখানে এই মরুর বুকে স্বর্গোদ্যান কীভাবে এল, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলাম।  

এ কাহিনির শুরুতেই লিখেছি ওই দিন গোধূলির আলোয় সোনালি কিলিমানজারোর সামনে ছায়াঢাকা বারাংকো ওয়াল দেখে দুশ্চিন্তা হয়। কীভাবে ওই দেয়াল পার হয়ে যাব? একই সঙ্গে উজ্জীবিত হই এই ভেবে যে এ রকম বাধা ডিঙিয়ে যাওয়ার নামই তো অ্যাডভেঞ্চার। একটু আগে অপরূপ উদ্যান দেখে এলাম। সেটা যেমন পথচলাকে আনন্দময় করে তোলে তেমনি একটা বাধা ডিঙিয়ে যেতে পারলেও যাত্রা সার্থক হয়। লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেয়ে পথচলার আনন্দ কম নয়।

সন্ধ্যায় আমরা মেস টেন্টে বসে আড্ডা জমাই গরম চা-কফি নিয়ে। আর সঙ্গে থাকে নানা রকম স্ন্যাকস। আমাদের সঙ্গীদের কেউ কেউ সেসব নিয়ে এসেছেন। কাঁচা মরিচ নিয়ে এসেছি আমরা কয়েকজন। সোয়াহিলি ভাষায় এরা মরিচকে বলে পিলিপিলি। রান্নার তাঁবু থেকে টমেটো ও পেঁয়াজ খুঁজে আনা হয়। টমেটো, পিলিপিলি ও পেঁয়াজ সহযোগে আনিস ভাইয়ের মেক্সিকো থেকে বয়ে আনা শর্ষের তেল দিয়ে মাখা হয় ওমান থেকে ডাক্তার অপুর আনা চানাচুর। কী অসম্ভব ঝাল আর কী অপূর্ব স্বাদ।
পরদিন ২ অগাস্ট সকালে নাশতা সেরে সবাই যার যার ব্যাগ গুছিয়ে যথারীতি যাত্রা শুরু করি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ ওপরে উঠে এসেছি আমরা। এমনিতেই ঠান্ডা বেড়েছে। তার ওপর বাতাসের ঝাপটা বেশ কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ক্যাম্পের কাছেই একটা ঝিরি পেরোতে গিয়ে দেখি তখনো ঘাসের গায়ে বরফ জমে আছে। পথে তেমন কোনো গাছ নেই। তবে বড় বড় পাথরের পাশে চারপাশ আলো করে ফুটে আছে সাদা ও হলুদ রঙের এভারলাস্টিং ফ্লাওয়ার।

মেঘের ওপর তাঁবুবাস
ছবি: ইফতেখারুল ইসলাম

আমাদের যাত্রা শুরুর আগেই বলে দেওয়া হয়, আজ দল বেঁধে চলা যাবে না। সারিবদ্ধ হয়ে এক লাইনে সবাইকে পথ চলতে হবে। বারাংকো ওয়ালে ওঠার সময় পাথরের গা বেয়ে একজন একজন করে উঠতে হবে। আমরা ঠিক করে নিই সামনে থেকে পেছন পর্যন্ত কে কোথায় থাকব। আরোহণের সময় হাত ব্যবহার করতে হয়। ট্রেকিং পোল ভাঁজ করে রাখতে হয়। আমাদের সবার ব্যাকপ্যাক দিয়ে দিতে হয় পোর্টারদের কাছে। পুরোপুরি তৈরি হয়ে আমরা পাথরের খাঁজে পা ফেলে ওপরে উঠতে শুরু করি। প্রয়োজনে দুহাতে পাথর ধরে রাখতে হয়। কোনো কোনো জায়গায় ঝুলন্ত পাথরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য মাথা নিচু করে চলতে হয়। আর মাঝখানে এক সময় বিখ্যাত কিসিং স্টোনের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত ছড়িয়ে পাথরটা ধরে তারপর অন্য পাশে চলে যাই। কোনো কোনো জায়গাতে পাথর একটু নড়বড়ে। সামনে এক পা ফেলার পর পেছনের পা ওঠানোর আগে বুঝে নিতে হয় সামনের পা দৃঢ়ভাবে পড়েছে কি না। মাঝেমধ্যে পা কাঁপে। হাওয়া পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলে ডোন্ট শেক, ইউ আর ফাইন, ট্রাস্ট ইউর লেগস।

এই দেয়াল পার হয়ে ওপরে ওঠার পর স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে মেতে উঠি আমরা সবাই। আমাদের গাইডদের দল যেকোনো সুযোগেই হইহই করে নেচেগেয়ে ওদের আনন্দ প্রকাশ করে। আমাদের উত্সাহ দিতে চেষ্টা করে। গান একটাই। সেটাকে নানাভাবে গায় ওরা। জাম্বো জাম্বো, জাম্বো বোয়ানা, হাবারি গানি, মুজুরি সানা। ওয়াগেনি, মোয়াকারিবিশ্ব। কিলিমানজারো হাকুনা মাতাতা। তেমবিয়া পোলে পোলে, হাকুনা মাতাতা। (অতিথিরা এখানে স্বাগত...ধীরে ধীরে হেঁটে পৌঁছে যাও কিলিমানজারো...সমস্যা নেই।)

সোয়াহিলি ভাষায় ও সুরে যেন আমার চোখের সামনে দুলে ওঠে রবীন্দ্রনাথের আফ্রিকা। সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী। আমাদের তানজানিয়ান গাইড, পোর্টার ও অন্য সঙ্গীরা নাচে। সেই সুর দোলা দেয় আমাদেরও শরীরে ও মনে। হাওয়া টেনে নেয় জুই, মিষ্টি, লিজা ও তিন্নিকে।  

অবাক হয়ে দেখি বারাংকো ওয়াল পার হয়েও আসলে খুব একটা উঁচুতে উঠিনি আমরা। সামনে আরও অনেক চড়াই–উতরাই বাকি। কিলিমানজারো এখনও অনেক দূরে রয়ে গেছে। আমরা কারাঙ্গা ভ্যালি নামের একটা উপত্যকায় এসে পৌঁছেছি। তারপর একটা মোড় যেখানে এসে মিশেছে মুয়েকা ট্রেইলের পথ। এদিনটা ট্রেকের পঞ্চম দিন। পাঁচ কিলোমিটার পথ পার হয়ে মাত্র ৫০ মিটার উচ্চতা গেইন করি আমরা। শুকনা রুক্ষ মাটি। এটা আলপাইন ডেজার্ট এরিয়া।
দ্রুত পা চালিয়ে আনিস ভাই, শাহাব ভাই, মাহফুজা মিষ্টি ও আমি সেদিন বেশ অল্প সময়ে কারাঙ্গা ক্যাম্পে ৪ হাজার ৫০ মিটার উচ্চতায় পৌঁছে গেলাম। চার ঘণ্টায় ট্রেক শেষ। পৌঁছেই প্রতিদিনের মতো সাইনবোর্ডের কাছে গিয়ে ছবি তুলে নিলাম। কারাঙ্গা ক্যাম্পটাও এক্লেমাটাইজেশনের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা আমাদের হাঁটার গতি অনুযায়ী তিন-চারটা দলে বিভক্ত থাকি। বেশির ভাগ দিনই আমরা দ্বিতীয় দলে। অণু, ওয়াসিক, আতিফ ও মাহবুব ভাই খুব দ্রুত হাঁটেন। তাই তাঁরা প্রথম দলেই থাকেন বরাবর। মাহফুজা মিষ্টি ভালো গতিতে স্বচ্ছন্দ্যে হাঁটবে এটাই স্বাভাবিক। মাহবুব ভাইয়ের ট্রেকিং ও আরোহণের গতি আমাকে অবাক করে। আর অবাক হই আনিস ভাই, শাহাব ভাই এ দুই বন্ধু ও ঢাকা থেকে যাওয়া আমিন ভাইয়ের ধীর কিন্তু অবিচল হেঁটে চলা দেখে। (চলবে)

আরও পড়ুন