বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া না এলে রবীন্দ্র–ভক্তদের দর্শনীয় জায়গা হয়ে উঠত না এই বাড়ি
কালিম্পংয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত গৌরীপুর হাউস দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে পাকদণ্ডী বেয়ে নেমে আসার পর প্রথমে রেলিখোলা নদী, তিস্তা, গেইল খোলা, রিয়ং আর রাম্বি বাজার ছাড়িয়ে শিলিগুড়ি রোড থেকে বেরিয়ে গেলে পাইন বনের ভেতর দিয়ে শুরু হয় চড়াই। কেবল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতেই যে কালিম্পং যাওয়া, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়, গৌরীপুর হাউস দেখাই ছিল মুখ্য। আবহাওয়া ভালো থাকলে আজকাল বাংলাদেশের উত্তর প্রান্তের কোনো কোনো জায়গা থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। ততক্ষণে আমরা কালিম্পং জেলা ছেড়ে ঢুকে পড়েছি দার্জিলিং জেলার মংপুতে। এখানেই আরেক রবীন্দ্রস্মৃতি, মৈত্রেয়ী দেবীর বাড়ি, বর্তমানে জাদুঘর।
দীর্ঘদেহী পাইনের ছায়াঢাকা সর্পিল পথ ধরে চলতে চলতে মনে পড়ছিল, এই পথে একাধিকবার আসা–যাওয়া করেছেন রবীন্দ্রনাথ। একবার আসার পথে পাহাড়ের মোড় ঘোরার সময় কবির গাড়িটা একটু টাল খায়। মৈত্রেয়ী দেবী সঙ্গেই ছিলেন। কবিকে তাঁদের ছোট গাড়িতে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বেঁকে বসেন, গাড়ি বদলালে তাঁকে বহনকারী গাড়িটির চালক অপমানিত বোধ করবেন।
সর্পিল চড়াই বেয়ে বাড়িটির সামনে এসে যখন পৌঁছাই, তখন ভরদুপুর। গেটে একটা গুমটিঘর আছে, কিন্তু কেউ নেই। ভেতরে ঢুকলেই বিশাল গাছের ওপর ঝকঝকে একটা ট্রি হাউস। এটা রবীন্দ্রনাথের মংপুবাসের সময় ছিল না। গেট পেরিয়ে রঙিন টাইলস বিছানো দীর্ঘ ঢালু পথ, সেই পথের শেষে গাছের ছায়ায় টেবিল পেতে বসে টিকিট বিক্রি করছেন একজন। সামনে হাতের বাঁয়ে সরকারি ভবনের মতো ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের ভবনটির গায়ে উৎকীর্ণ, ‘রবীন্দ্রস্মৃতি আদর্শ শ্রমিক কল্যাণ কেন্দ্র, ১৯৬৩’। ডানের রুচিস্নিগ্ধ একতলা বাংলো বাড়িটির সঙ্গে পুরোপুরি বেমানান।
কয়েক ঘণ্টা আগে কালিম্পংয়ে হানাবাড়ির মতো রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবাহী গৌরীপুর হাউস নামের যে বাড়িটা দেখে এসেছি, সেটার সঙ্গে মংপুর এই বাড়িটার আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বিশাল সেই বাড়িটি এখন প্রায় ভুতুড়ে।
বাংলাদেশে যদি ম্যালেরিয়া না আসত, মংপুর এই বাড়িটি কখনোই রবীন্দ্র–ভক্ত বাঙালির ভ্রমণসূচিতে স্থান পেত না। সে সময় কলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রধান হয়ে এসেছিলেন স্কটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী টমাস অ্যান্ডারসন। তিনিই প্রথমে ম্যালেরিয়ার ওষুধ কুইনাইন তৈরির উপাদান সিনকোনাগাছের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছিলেন মংপুতে, তারপর বাণিজ্যিকভাবে। এখানকার কুইনাইন তৈরির কারখানার প্রধান কুইনোলজিস্ট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মনমোহন সেন। তাঁর সঙ্গেই মৈত্রেয়ী দেবীর বিয়ে হয় ১৯৩৪ সালে। চার বছর আগে মির্চা এলিয়াদের (ন হন্যতে) সঙ্গে ভগ্নপ্রেমের ক্ষতও তত দিনে কাটিয়ে উঠেছেন মৈত্রেয়ী। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া না এলে মংপুর এই বাড়িটা যেমন থাকত না, মির্চা এলিয়াদের সঙ্গে মৈত্রেয়ীর প্রেমটা সফল হলেও রবীন্দ্র–ভক্তদের দর্শনীয় জায়গা হয়ে উঠত না এই বাড়ি।
রবীন্দ্রনাথের জন্য প্রথমে বরাদ্দ করা হয়েছিল তিন কিলোমিটার দূরের সুরেল বাংলো। পায়ে হেঁটে নিজেই কবির জন্য সেখানে খাবার নিয়ে যেতেন মৈত্রেয়ী দেবী। জায়গাটা ভালো লাগলেও ভীষণ নির্জন, কবি তাই মৈত্রেয়ীর স্বামীর সরকারি বাংলোতে গিয়ে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন একাধিকবার। কিন্তু সুরেলের তুলনায় তাঁদের বাড়িটি ছোট বলে মৈত্রেয়ী দোনোমনা করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে সেই বাড়িতে থাকবেন বলে একসময় জেদ ধরে বসেন রবীন্দ্রনাথ। শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজেদের কোয়ার্টারে নিয়ে আসেন মৈত্রেয়ী। এ বাড়িতে এসে মুগ্ধ কবি বলেছিলেন, ‘এত চমৎকার বাড়ি!...কী সুন্দর এই সামনের ঢালু পাহাড়টি, আকাশের কোল থেকে সবুজ বন্যা নেমে এসেছে। এই সামনের মাঠটিও তোমার ভালো, আমি মাটির কাছাকাছিই থাকতে চাই,...এ চৌকিতে সকালবেলা বসব আর রোদ্দুর এসে পড়বে কাচের ভেতর দিয়ে।—তোমার ঐ বনস্পতির পাতার ফাঁক দিয়ে শতধারায় ঝরে পড়বে সকালবেলার আলো, ভোরের সেই রৌদ্রস্নানটি আমার কত সুন্দর হবে।’
সর্বমোট চারবার মংপু এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সে সময়েও বাড়িটি ঠিক এ রকমই ছিল। বাড়ির পাশে ধবধবে সাদা রং করা কাঠের যে গোল ঘরটা আছে, সেটি বানানো হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের অনুরোধেই। চারদিকে গাছপালার শ্যামলিমা, রঙিন ফুলের উদ্ভাস, দূর পাহাড়ের হাতছানির মধ্যে বাংলোটির স্নিগ্ধতায় মাখা উদার প্রাকৃতিক পরিবেশে মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছালেই কানে আসে ভেতর থেকে ভেসে আসা রবীন্দ্রসংগীতের সুর। ভেতরে ঢুকলে প্রশস্ত বারান্দা, সেখানে চাদরঢাকা চেয়ারের ওপর ফুলের মালা পরানো রবীন্দ্রনাথের ছবি, ওটার সামনে মেঝের ওপর ফুলদানিতে রাখা ফ্লুরোসেন্ট বাল্বের মতো সাদা একটা হিমচাঁপা ফুলের কুঁড়ির অর্ঘ্য, সুগন্ধি ধূপের ঘ্রাণে একটা পবিত্র পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ প্রতিদিন ভোরে ধ্যানে বসতেন, দেখতেন সূর্যের প্রথম আলোর ছটা।
বারান্দার বাঁয়ে কাচের দরজার ভেতর যে ঘরটি ছিল রবীন্দ্রনাথের পড়ার ঘর, সেটিতে ঢোকার ব্যবস্থা নেই, বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া যায়, একটা কাঠের টেবিল, সামনে চেয়ার, তার পেছনে একটা ইজেল দাঁড় করানো। মৈত্রেয়ী দেবীর বইয়ে পাওয়া যায়, বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সে সময়। ইজেলের পাশে কাচের বাক্সে কৌটোয় ছবি আঁকার রং, তুলি, কবির ব্যবহার করা ওষুধপত্রের বোতল সাজিয়ে রাখা। পড়ার ঘরের বন্ধ দরজার ডানে শোবার ঘর। তোশক, বিছানাসহ একটা সিঙ্গেল খাট। বিছানার ওপর রবীন্দ্রনাথের একটা আবক্ষ মূর্তি বসানো। ওটা ছিল কবির ব্যবহার করা খাট। ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া বাথরুম। সেখানে সিমেন্টের তৈরি বাথটাব, রেড অক্সাইড দিয়ে লাল রং করা।
ভেতরের অন্য ঘরগুলোতে রবীন্দ্রনাথের নানা সময়ের অনেক ছবি বর্ণনাসহ ফ্রেমে বাঁধিয়ে সাজানো। সেসব ছবিতে ফুটে উঠেছে তাঁর জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়, এককথায় পুরো জীবনালেখ্য। ফ্রেমে বাঁধানো তাঁর আঁকা অনেকগুলো পেইন্টিংয়ের প্রিন্ট। রয়েছে মংপুতে পৌঁছে গাড়ি থেকে নামার সময় বা লেখায় মগ্ন, কিংবা সামনের বাগানে বসা রবীন্দ্রনাথ, কোথাও তাঁর সঙ্গে মৈত্রেয়ী বা তাঁর বোনের ছবি। মংপুতে রবীন্দ্রনাথ বইয়ের মাধ্যমে চেনা মৈত্রেয়ী দেবীর বোন চিত্রিতা এবং মাসি সুব্রতা দেবীর ছবিও দেখা হলো প্রথমবারের মতো। সব কটি ঘরের মাঝখানে কাচঢাকা ক্যাবিনেটের মধ্যে পাণ্ডুলিপির পাতা, পেইন্টিং ইত্যাদি। আরও নাকি অনেক দুষ্প্রাপ্য স্মারক ছিল, খোয়া গেছে। তার মধ্যে কবিতার পাণ্ডুলিপি, কবির হোমিওচর্চার স্মারক কিছু ওষুধের বোতলও ছিল। রবীন্দ্রসংগীতের সম্মোহনী সুরের আবহে এসব ছবি কিছুক্ষণের জন্য আমাদের অন্য ভুবনে নিয়ে যায়। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, ছবি তোলা নিষেধ বলে ভেতরে সেলফিঅলাদের উৎপাত নেই।
ক্রমাগত বেজে চলা রবীন্দ্রসংগীতের সুরকে পেছনে ফেলে মংপুর বাড়িটি থেকে যখন বের হয়ে আসি, তখন জ্যৈষ্ঠের বিকেল, তবে সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর বলে সমতলের অসহ্য খরতাপ নেই। বের হওয়ার আগে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা মন্তব্যের খাতায় কিছু লিখে আসার সুযোগটা হাতছাড়া করিনি। বাড়িটির সামনের আঙিনার এক পাশে উদয়পদ্মগাছটির দিকে আরেকবার ভালো করে দেখি, সেখানে ফ্লুরোসেন্টের মতো ফুটে থাকা দুধসাদা হিমচাঁপা ফুলটিকে রবীন্দ্রনাথ বলতেন মোমফুল। কিছু দূরে অন্যদিকে ঝুলে আছে একরাশ রাজঘণ্টা। তার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল স্যালভিয়া।
‘...সামনের পাহাড়ের বুকে সবুজ বন্যা, ওই উদ্ধত গাছ, দূরের পথে পাহাড়িয়াদের যাতায়াত—সিঁড়ির টবের জিরেনিয়াম, সন্ধ্যেবেলা আলো জ্বেলে ইঙ্গিত সবই মনে পড়বে।...জানি মংপু আমার মনে থাকবে—সেই কথাটি কবি পড়বে তোমার মনে বর্ষামুখর রাতে ফাগুন সমীরণে।’
আমাদেরও মনে পড়বে মৈত্রেয়ী দেবীর সযত্ন উপস্থিতিতে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠা মংপুতে তাঁর সানন্দ অবস্থানের কথা। দুর্গাপুর হাউস দেখে যতখানি হতাশ হয়েছিলাম, মংপুর রবীন্দ্রভবন দেখে সেটুকু দূর হয়ে যায়।