‘বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করেছি’

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং ও ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড়—এই তিন পর্বের সমন্বয়ে হয় আয়রনম্যান প্রতিযোগিতা। গত মাসে ফ্রান্সে অর্ধদূরত্বের আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করার পর ৪ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানও শেষ করেছেন সাজিয়া সুলতানা। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসারের ট্রায়াথলন–ভুবনে জড়িয়ে পড়ার গল্প শুনলেন সজীব মিয়া

প্রথম আলো:

পরপর দুটি আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটা তো চাট্টিখানা কথা নয়?

সত্যি বলতে, এটি শরীর ও মন—দুটির জন্যই বড় পরীক্ষা ছিল। গত ১২ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের নিসে ৭ ঘণ্টা ৫১ মিনিট ৭ সেকেন্ডে ৭০.৩ আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করেছি। এর মাত্র তিন সপ্তাহ পর, ৪ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার গুর্যে কাউন্টিতে ১৫ ঘণ্টা ১৬ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করেছি। দুটি প্রতিযোগিতাই আমাকে নতুন করে শিখিয়েছে, শরীর যখন থেমে যেতে চায়, তখন মনোবলই আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

প্রথম আলো :

ট্রায়াথলন অঙ্গনের সবাই বলছেন, পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করা বাংলাদেশের প্রথম নারী আপনি...

জি, বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে আমি ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং ও ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড়, মোট ২২৬ কিলোমিটারের পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যান শেষ করেছি। এর আগে নিসে ৭০.৩ আয়রনম্যান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ করা প্রথম বাংলাদেশি নারীও আমি। তবে ‘প্রথম’ শব্দটি আমার কাছে শুধু রেকর্ড নয়, বরং একটি দায়িত্বও।

আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় ১৮০ কিলোমিটার সাইকেল চালাতে হয়
ছবি: সাজিয়া সুলতানার সৌজন্যে

প্রথম আলো :

প্রথম পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

এত দীর্ঘ দূরত্বের প্রতিযোগিতায় নামার আগে উত্তেজনা, প্রত্যাশা ও কিছুটা অনিশ্চয়তা—সবই কাজ করছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সাইক্লিংয়ের ৪০ থেকে ১০০ কিলোমিটার অংশে রাস্তা ছিল এবড়োখেবড়ো। কোথাও চড়াই, কোথাও উতরাই, আবার কোথাও পথ ছিল বেশ সংকীর্ণ। প্রায় ৪০ কিলোমিটার সাইক্লিংয়ের পর এমনই একটি এবড়োখেবড়ো পথে সামনের চাকা পিছলে যায়। মুহূর্তেই পড়ে যাই। বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ভেঙে যায়, হাঁটু ও হাত থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। মাথায়ও আঘাত পাই।

আমার অবস্থা দেখে একজন স্বেচ্ছাসেবক কাঁদছিলেন। তিনি অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি রাজি হইনি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তাঁকে বলেছিলাম, যা-ই হোক, চেষ্টা থামাব না। সেই মনোবলই আমাকে শেষ পর্যন্ত ফিনিশ লাইনে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।

প্রথম আলো:

সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড়ের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে কঠিন?

তিনটি পর্বই কঠিন। তবে প্রতিযোগিতার স্থান ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে চ্যালেঞ্জের ধরন বদলে যায়। ফ্রান্সের নিসে সাঁতার কাটতে হয়েছে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল পানিতে। এরপর সাইক্লিংয়ের পথে ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯০ ফুট উচ্চতার চড়াই। বিশেষ করে প্রথম ৩৬ কিলোমিটারের খাড়া পাহাড় ও একের পর এক বিপজ্জনক বাঁক সামলানো খুব কঠিন ছিল। দেশের পাহাড়ি এলাকায় সাইক্লিং করলেও ওই ধরনের পথে চালানোর অভিজ্ঞতা আমার ছিল না।

দক্ষিণ কোরিয়ার বরফশীতল পানিতে ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার কাটাও ছিল বড় পরীক্ষা। এরপর ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং শেষ করে যখন ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড় শুরু করি, তখন শরীর অনেকটাই ক্লান্ত। সেই অবস্থায় পুরো ম্যারাথন শেষ করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। এসব প্রতিযোগিতায় শুধু শারীরিকভাবে ফিট থাকলেই চলে না; অপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পরিস্থিতি বুঝে নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াও সমান জরুরি।

ফ্র্যান্সের নিসে আয়রনম্যান ৭০.৩ চ্যাম্পিয়নশিপে
ছবি: সাজিয়া সুলতানার সৌজন্যে

প্রথম আলো :

ট্রায়াথলনে আপনার যাত্রা কীভাবে শুরু হলো?

আমার খেলাধুলার শুরুটা একেবারেই আচমকা। অফিসে পুরুষ সহকর্মীদের ফুটবল ও ক্রিকেট দলের সংগঠক এবং ম্যানেজার ছিলাম। জুনিয়র সহকর্মীরা আমাকে ভরসা করত। মাঠে তাদের উৎসাহ দিতাম, তাদের সাফল্যে আমিও আনন্দ ভাগ করে নিতাম।

অন্যদিকে, অফিসের সহকর্মী ফারুক প্রায়ই তাঁর দৌড়ের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একদিন তাঁর দৌড় দেখতে গেলাম। সেখান থেকেই খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করি।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ধীরে ধীরে সাঁতার ও সাইক্লিংয়ের অনুশীলন শুরু করি। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে ২০২৬ সালের জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সপ্তম স্থান অর্জন করি। এভাবেই ট্রায়াথলনের পথে আসা।

গত ১৭ মে চীনের সাংহাইয়ের চংমিং দ্বীপে আয়রনম্যান ৭০.৩ শেষ করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাই।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

চাকরি, সংসার, অনুশীলন—এত কিছুর ভারসাম্য কীভাবে করেন?

আমি আইসিবির জ্যেষ্ঠ প্রিন্সিপাল অফিসার। মা–বাবা ও স্বামীর সহযোগিতার কারণেই চাকরি বা সংসার ছেড়ে নয়, বরং সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করে অ্যাথলেট হতে পেরেছি। তারপরও শুরুর দিকে সবকিছু সামলানো অনেক কঠিন ছিল। প্রশিক্ষণ, বাচ্চাদের স্কুল ও অফিস—সবকিছু সমন্বয় করতে হতো। খুব ভোরে উঠে সকাল ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত অনুশীলন করতাম। এরপর বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে সোজা অফিসে চলে যেতাম। অফিস শেষে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বাসায় ফিরতাম। রাত ১১টায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরও দুই ঘণ্টা সময় বের করে ইনডোর ট্রেনিং করতাম।

মাঝেমধ্যে বাচ্চারাও আমার সঙ্গে ইনডোর ট্রেনিং করত। আমরা খেলার ছলেই অনুশীলন করতাম। কখনো গান ছেড়ে দুই বাচ্চাকে নিয়ে আনন্দ করতে করতেই ট্রেনিং করতাম। ছুটির দিনে অনুশীলনের জন্য বেশি সময় রাখতাম।

পূর্ণ দূরত্বের আয়রনম্যানের মঞ্চে সাজিয়া সুলতানা
ছবি: সাজিয়া সুলতানার সৌজন্যে

প্রথম আলো :

আপনি ৪০-৪৪ বছর বয়স শ্রেণিতে প্রতিযোগিতা করেন। বয়সকে কখনো বাধা বলে মনে হয়েছে?

আমি মনে করি, বয়স বাধা নয়। অনেক নারী ভাবেন, ত্রিশ বা চল্লিশের পর তাঁদের সময় শেষ হয়ে গেছে। আমার গল্প সেই ধারণার বিপরীত। আমি দেখাতে চাই, ৩০-৪০ কিংবা তার পরেও নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকে।

এই বয়সে পরিকল্পনা, ধৈর্য ও নিজের প্রতি শৃঙ্খলা অনেক বেশি থাকে, যা আয়রনম্যানের মতো দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় বড় সুবিধা দেয়। তবে শরীরের যত্ন ও বিশ্রামের দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিতে হয়। বয়সকে বাধা না ভেবে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম আলো :

আপনার পরবর্তী লক্ষ্য কী?

প্রথম লক্ষ্য হলো, আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য যে ঋণ করেছি, সেগুলো পরিশোধ করা। পাশাপাশি নিজেকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, যাতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনতে পারি। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের একজন স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাট হতে চাই। পাশাপাশি দেশের মেয়েদের মধ্যে সুস্থ জীবনযাপনের সচেতনতা তৈরি করতে চাই, যাতে তারা নিজেদের শরীর ও মনের সক্ষমতা বুঝতে পারে।

আরও পড়ুন