দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া ১০৩ বছর বয়সী প্রবীণ জানালেন দীর্ঘ জীবনের রহস্য

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় স্বাস্থ্য ও লাইফস্টাইলভিত্তিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হেলদি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারের দিনও নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার কলম্বাসে ওয়াইএমসিএতে (ইয়াং মেনস ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন) সার্কিট ট্রেনিং শেষ করে হাসিমুখে বেরিয়েছিলেন ১০৩ বছর বয়সী জেমস স্নিড।

১০৩ বছর বয়সী জেমস স্নিড
ছবি: জেমস স্নিড/দ্য হেলদি

তাঁর বয়সের অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষ যেখানে সপ্তাহে দু-এক দিন শরীরচর্চা করেন, সেখানে জেমস সপ্তাহে তিন দিন ‘সিলভার স্নিকার্স’ ফিটনেস ক্লাসে অংশ নেন। বয়স্ক নাগরিকদের (সাধারণত ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী) জন্য ডিজাইন করা একটি জনপ্রিয় স্বাস্থ্য, ফিটনেস ও ওয়েলনেস প্রোগ্রাম হলো সিলভার স্নিকার্স। এখানেই জেমস স্নিড কার্ডিও, ওজন তোলা, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড ও সার্কিট ট্রেনিং—সবই করেন।

‘দ্য হেলদি’কে জেমস বলেন, ‘আমি ওদের মতো সবকিছু করতে পারি না। তবে যতটুকু পারি করি। আর প্রতিদিন একটু একটু করে ভালো করার চেষ্টা করি।’

এই মানসিকতার উৎস কী? উত্তরে জেমস জানান, ছোটবেলায় শেখা একটি ‘মন্ত্র’। শত বছরের বেশি সময় ধরে যে মন্ত্র তিনি জীবনে কাজে লাগিয়ে আসছেন।

আরও পড়ুন

ভালো, আরও ভালো, সবচেয়ে ভালো

ছোটবেলায় আলাবামায় এক শিক্ষকের কাছ থেকে একটি ছড়া শিখেছিলেন জেমস। আজও অনায়াসে বলতে পারেন, ‘গুড, বেটার, বেস্ট, নেভার লেট ইট রেস্ট। টিল দ্য গুড বিকাম বেটার অ্যান্ড বেটার বিকাম বেস্ট।’

১৯৩২ সালের দিকে শেখা এই মন্ত্রই যেন তাঁর জীবনদর্শন হয়ে উঠেছে। আর গবেষণাও বলছে, ইতিবাচক ও নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন বাক্য নিজেকে বারবার মনে করানো মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জেমসের এই মন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনের গভীর উদ্দেশ্য।

তবে জীবনের উদ্দেশ্য খুব বড় কিছু হতে হবে, এমন নয়। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে মাত্র এক ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজও বয়স্কদের জৈবিক বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

শারীরিক সক্রিয়তাও জেমসের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ৩৬ হাজারের বেশি মানুষকে নিয়ে ২০ বছরের এক গবেষণায় নিয়মিত সক্রিয় থাকা মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে শক্তিশালী পূর্বাভাসগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে।

ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম

শৈশবে জেমস মার্বেল ও বেসবল খেলতেন, বাড়ির বাগানে বেগুন চাষ করতেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। এরপর দাদি তাঁকে ও তাঁর দুই ছোট বোনকে বড় করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জেমস স্কুলপড়ুয়া। পার্ল হারবারে হামলার খবরের পর যুদ্ধে যোগ দেন। এর কয়েক মাস পরই, যেদিন তাঁর বয়স ১৮ হয়ে যায়, নাম লেখান সেনাবাহিনীতে।

সেনাবাহিনীর একটি পরীক্ষায় ১৫০-এর মধ্যে ১৩৫ নম্বর পেয়ে সর্বোচ্চ গ্রেডে জায়গা করে নেন। এরপর তাঁকে ট্যাংক চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। উত্তর আফ্রিকা ও ইতালিতে দায়িত্ব পালনের পর যুদ্ধের শেষ দিকে তাঁকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও পাঠানো হয়।

যুদ্ধের দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে জেমস বলেন, ‘কে ভয় পেত না? চারদিকে বিমান থেকে বোমা পড়ছে, সব সময় সাইরেন বাজছে। ঘুমানোরও সুযোগ নেই। তখন ওপরের সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারও দিকে তাকানোর ছিল না।’

যুদ্ধ শেষ, শুরু হলো পারিবারিক জীবন

যুদ্ধ শেষে আলাবামায় ফিরে মাত্র ৫০ থেকে ৭৫ সেন্ট দৈনিক আয় করেও নিজের হাতে পরিবারের জন্য বাড়ি তৈরি করেন জেমস। তাঁর পাঁচ সন্তানই কলেজে পড়াশোনা শেষ করেন। তাঁর স্ত্রী মিনিও পড়াশোনা করে শিক্ষকতা শুরু করেন। আর তাঁদের এলাকার শ্বেতাঙ্গ স্কুলে কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির পথিকৃৎদের একজন হন।

জেমস নিজেও নাগরিক অধিকার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আলাবামার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্টেট ট্রুপার নিয়োগের উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে বড় বাগান করতেন। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সবজি ফলাতেন, যাতে আশপাশের কেউ খাবারের অভাবে থাকলে তাঁকে দিতে পারেন। তাঁর এই দীর্ঘদিনের সামাজিক কাজের স্বীকৃতিও মিলেছে। তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আলাবামা সিনিয়র সিটিজেনস হল অব ফেমে।

আরও পড়ুন

১০৩ বছরেও থামেননি

জেমস বলেন, ‘আমি অনেক হতাশার মধ্য দিয়ে গেছি। কিন্তু সক্রিয় থাকি, শান্ত থাকি। আর ওপরওয়ালা যা করতে বলেন, তা-ই করি। তাই কোনো কিছুই আমাকে খুব বেশি বিচলিত করে না।’
ছবি: জেমস স্নিড/দ্য হেলদি

১০০ বছর বয়সে জেমসের মেয়ে জ্যানেট তাঁকে নিজের সঙ্গে জর্জিয়ার কলম্বাসে নিয়ে আসেন। তাঁর সক্রিয় জীবনযাপন যেন থেমে না যায়, সে জন্য তাঁকে ওয়াইএমসিতে (ইয়াং মেনস ক্রিশ্চিয়ান অ্যাসোসিয়েশন) নিয়ে যাওয়া শুরু করেন। এখন তিনি সেখানকার সবচেয়ে বয়স্ক সক্রিয় সদস্য।

জেমস বলেন, ‘আমি অনেক হতাশার মধ্য দিয়ে গেছি। কিন্তু সক্রিয় থাকি, শান্ত থাকি। আর ওপরওয়ালা যা করতে বলেন, তা-ই করি। তাই কোনো কিছুই আমাকে খুব বেশি বিচলিত করে না।’

জীবন সম্পর্কে অন্যদের জন্য তাঁর পরামর্শটিও সরল, ‘যতটা ভালো আপনি করতে পারেন, যত বেশি মানুষের জন্য করতে পারেন, যেখানেই পারেন—ভালো কিছু করে যান।’

সূত্র: দ্য হেলদি

আরও পড়ুন