যেখান থেকে ল্যাংট্যাং ট্রেক শুরু করেছিলাম, সেই সাব্রুবেসির ৫৫৯টি ভবনের ৪৩৩টিই ধ্বংস হয়ে গেছে

নেপালে ল্যাংট্যাং ট্রেকেছবি: ইফতেখারুল ইসলামের সৌজন্যে

মার্চের শেষে নেপালে ল্যাংট্যাং ট্রেকে গিয়েছিলাম। কথা ছিল ওই ট্রেকের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা, আনন্দের অভিজ্ঞতা আর রোমাঞ্চকর ঘটনা নিয়ে লিখব। কিছুটা লেখার পর দেখি, অভিযানের চেয়ে পাহাড়ি নদীর রূপ ও চঞ্চলতা নিয়েই লেখা হয়েছে বেশি। তখন লেখাটা ওখানেই থামিয়ে রেখে অন্য কিছু লেখালেখির কাজ শেষ করি। তারপর একটা দীর্ঘ ভ্রমণে চলে যাই আমেরিকা ও কানাডায়।

সেখানে বসেই নেপালের দুর্যোগের খবরটা পাই। খবরের সঙ্গে অথবা অন্যান্য মাধ্যমে যেসব ভিডিও ক্লিপ দেখি, তার পটভূমি, পর্বত, নদী ও তীরের জনপদ আমার মনে হয় চেনা। কিছু ভিডিওতে যা দেখি তা আগে কোনো দিন দেখা হয়নি। মনে হয় কৃত্রিম ও অবিশ্বাস্য। রাতে ঘুমাতে পারি না। ঘুমের মধ্যে ত্রিশূলী বা ল্যাংট্যাং নদীর গর্জন শুনে জেগে উঠি।

ট্রেকিংটা করেছিলাম গত বসন্তে, রডোডেনড্রন ফোটার সময়। অথচ পাহাড়ে তখন শীত ছিল। আকাশ পরিষ্কার থাকলে তুষারশৃঙ্গগুলো অসাধারণ উজ্জ্বল দেখাত। মনে হতো, এই পৃথিবীতে স্থিরতার কোনো চেহারা যদি থাকে, তবে তার নাম হিমালয়। এখন দেখছি, হিমালয়ের স্থিরতাও আসলে আমাদের দেখার বিভ্রম। আসলে পাহাড়ের ভেতরে সব সময় কিছু না কিছু ঘটছে। বরফ জমছে, বরফ গলছে। পাথর ভাঙছে। ঢাল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। হিমবাহ এগোচ্ছে, পেছাচ্ছে, বড় হচ্ছে অথবা গলে যাচ্ছে। নতুন পথ কাটছে নদী। পাহাড়ের শরীরের এই পরিবর্তন মানুষের জীবনের তুলনায় এত ধীর যে আমরা তাকে স্থিরতা বলে ভুল করি। তারপর কোনো একদিন সেই ধীর পরিবর্তন হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একটি বরফের অংশ ভেঙে পড়ে। একটি পাথরের ঢাল নড়ে যায়। একটি নদী বাধা পায়। তৈরি হয় জলাধার। তারপর সেই জলাধার ভেঙে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বহু বছরের পরিচিত ভূগোল বদলে যায়।

সাব্রুবেসি—আগে, পরে
ছবি: সংগৃহীত
নদী ও পাহাড়ের দিকে মুখ করে থাকা একলা চেয়ার, সেলস-গার্ল, মেয়েটির বাবা, তিব্বতি প্রবীণার মুখের ভাঁজ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—সবকিছু মিশে থাকে আমার দুচোখ থেকে নেমে আসা দুই ফোঁটা জলে।

২৬ আগস্ট ঠিক এমনই এক ভয়াবহ রূপ আমরা দেখলাম।

খবরের ছবিতে ধ্বংস দেখা যায়। ধ্বংসের আগের জীবন দেখা যায় না। একটি বাড়ি ভেঙে গেল। সেই বাড়ির রান্নাঘরের গন্ধ মুছে যায়। দেয়ালে ঝোলানো ছবি? শিশুর বই? কাঠের দরজায় বছরের পর বছর হাতের ছাপ? বিকেলে বসে চা খাওয়ার জায়গা? এগুলো কোনো স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় না। একটি লজ ভেসে গেলে আমরা দেখি তার টিনের চাল, কাঠ, মাটি ও পাথর। একজন ট্রেকারের কাছে সেই লজ হয়তো ছিল একটি রাতের আশ্রয়। লজ–মালিকের কাছে সেটিই ছিল সংসার। যে লজগুলো আমার ভ্রমণকাহিনির চরিত্র হয়ে উঠেছিল, সেগুলো এখন আমার কাছে মানুষ হয়ে উঠেছে। আমি লিখতে শুরু করেছিলাম—

‘লজের বারান্দায় ভেজা কাপড় শুকাতে দিই। পাশের দেশের অভিযাত্রীর সঙ্গে গল্প করি। শেখর বললেন, ল্যাংট্যাং উপত্যকা এভারেস্ট বেজক্যাম্পের চেয়েও বেশি সুন্দর। ওর কথা সত্য কি না জানি না।’

আমি লিখি—

‘নদীর পাশে ছোট্ট একটি লজে রাত কাটালাম।’

এখন সেই বাক্য লিখতে গিয়ে থমকে থাকি। ভাবি, কোন লজ? কোন নদী? কোথায় ছিল সেটি? এখনো আছে কি? খবর দেখতে চাই না, তবু রয়টার্সের খবর থেকে জেনেছি, রাসুয়া জেলার যে এলাকা থেকে ল্যাংট্যাং ট্রেক শুরু হয়, সেই সাব্রুবেসির ৫৫৯টি ভবনের ৪৩৩টিই ধ্বংস হয়ে গেছে। ২৬ আগস্ট সকাল থেকেই কয়েকবার আমার গাইড তেজ, নির্মল ও সন্তোষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। অনেকটা সময় অচেতনের মতো হয়ে থাকি। জেগে উঠে আবার মার্চের ছবিগুলো খুলে বসি।

আরও পড়ুন
সাব্রুবেসিতে লেখক। পেছনের এই ভবনটি এখন হয়তো আর টিকে নেই
ছবি: ইফতেখারুল ইসলামের সৌজন্যে

একটি ছবিতে পাহাড়ের ঢালে কয়েকটি বাড়ি। লামা হোটেল থেকে ফিরে আসার সময় নদীর কিনারে যে গেস্টহাউসটায় থেকেছিলাম, সেখানকার কোনো ছবি নেই। তবে নদীর ছবি আছে। সেতু আছে। পথের ধারে লজের বেঞ্চিতে বসে আছে অচেনা কোনো মানুষ। তখন ছবি তুলেছিলাম দৃশ্যের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে। সেই ছবিগুলোই এখন অন্য ভাবনা নিয়ে আসে। ছবির পেছনে যে পর্বতটি দেখা যাচ্ছে, সেটি থেকেই ধসে পড়েছে হিমবাহের টুকরা। ছবির নিচ দিয়ে যে নদী বয়ে গেছে, সেটিই এখন অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী। একটি সেতু, যার ওপর দিয়ে আমি হেঁটেছিলাম, তা এখন আর নেই। এভাবেই পুরোনো ছবি বদলে যায়।

স্থির ছবি অনেক কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে। ভিডিও পারে না। সেখানে পাহাড় নড়ে। জলধারা এগিয়ে আসে। পাথর গড়িয়ে আসে। মানুষ দৌড়ায়। কেউ চিৎকার করে। ক্যামেরা কেঁপে যায়। একটি মুহূর্তের মধ্যে বোঝা যায়, প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে যে দূরত্বটাকে আমরা নিরাপদ ভেবেছিলাম, তা আসলে ছিল খুবই সামান্য। কিছু ভিডিওতে ধ্বংসের গতি দেখে মনে হয়, পৃথিবী যেন কয়েক মিনিটের জন্য তার স্বাভাবিক নিয়ম ভুলে গেছে। আসলে পৃথিবী কোনো নিয়ম ভুলে যায়নি। আমরাই হয়তো তার নিয়মকে খুব সরল করে বুঝেছিলাম। ভেবেছিলাম পাহাড় মানেই নিরাপদ। নদী মানেই পথ। হিমবাহ মানেই বরফে ঢাকা সৌন্দর্য। আমরা বিপদের আশঙ্কাকে দৃশ্যের সৌন্দর্যের পেছনে সরিয়ে রেখেছিলাম।

২৬ আগস্ট পাথুরে শান্ত নদীটির ভিন্ন রূপ দেখেছে নেপালের মানুষ
ছবি: ইফতেখারুল ইসলাম

পাঁচ–ছয় বছর পরপর একটি করে দুর্যোগ আসে, আর থমকে দাঁড়ায় নেপালের পর্যটনশিল্প। নতুন করে বিপর্যস্ত হয় আমাদের পরিচিত এজেন্সি, শেরপা ও গাইডদের জীবন। এবারের খবরের কোনো কোনো দৃশ্য ও কিছু তথ্য অবিশ্বাস্য লাগে। তেজকে আবার জিজ্ঞেস করি, ওরা সবাই কেমন আছে। কেমন আছেন লজ-দিদি, যিনি আমাকে উপত্যকা থেকে বিদায় জানানোর জন্য উত্তরীয় পরিয়ে দিয়েছিলেন। এমনটি আর কেউ করেননি কখনো। আর তারপর খুব ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি সাব্রুবেসির খবর কি সত্য? কতটা ক্ষতি হয়েছে?

‘ইয়েস, সাব্রুবেসি কমপ্লিটলি কলাপসড,’ তেজের উত্তর শুনে আমার শরীর ও মন অবশ হয়ে যায়। আমি চুপ করে বসে থাকি। নদী ও পাহাড়ের দিকে মুখ করে থাকা একলা চেয়ার, সেলস-গার্ল, মেয়েটির বাবা, তিব্বতি প্রবীণার মুখের ভাঁজ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প—সবকিছু মিশে থাকে আমার দুচোখ থেকে নেমে আসা দুই ফোঁটা জলে।

আরও পড়ুন