একা ঘুরতে শেখো প্রিয়
কঠিন। বাংলাদেশে একা ঘোরা এখনো কঠিন। দেশে ৫ মিনিট একা বসে থাকার জায়গারই বড্ড অভাব। সেখানে একা ঘুরতে যাওয়া? যেন কল্পনার অতীত। কিন্তু মন যার একবার ঘর ছেড়েছে, তার কাছে অসম্ভব নয় কিছুই।
প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘জনতার মাঝেই আছে নির্জনতা।’ সেই নির্জনতা খুঁজে পেতে কিছু বিষয় মানিয়ে নিতে হবে, কিছু ক্ষেত্রে শক্ত কণ্ঠে ‘না’ বলা শিখতে হবে। ভয় সরিয়ে মনে জায়গা দিতে হবে কৌতূহল। ‘যদি কিছু হয়!’—এই প্রশ্ন সরিয়ে যেদিন ভাবতে পারবেন, দেখি না কী হয়! সেই দিনই বুঝবেন, আপনি একা ঘুরতে প্রস্তুত।
কেন একা ঘোরে মানুষ
যদি সবার সঙ্গে কিছু দেখতে চান, দলেবলে যান। যদি নিজেকে খুঁজতে চান, বুঝতে চান, ভালোবাসতে চান, তাহলে একা ঘুরতে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চেকইনের এই সময়ে নিজের সঙ্গে সময় কাটানো কঠিন। এমন এক অদ্ভুত সময়ে আমরা বাস করি, যেখানে আমরা কী দেখব, কী শুনব, কী করব—সবই দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল পর্দায়।
আমরা যেন বেঁচে আছি অন্যের চোখে, অন্য কারও জীবনে। একদিন হাতের ফোনটা নষ্ট হয়ে গেলে বুঝে উঠতে পারি না কী করব, কী ভাবব, কার সঙ্গে ভালো সময় কাটবে। ধীরে ধীরে নিজের কাছে নিজের পরিচয়টাই যেন অস্পষ্ট হয়ে আসে।
নিজের কাছে নিজেকে স্পষ্ট করে তোলার অসাধারণ একটা প্রক্রিয়ার নাম একা ঘোরা বা সলো ট্রাভেলিং। কথায় বলে, একজন ব্যক্তিকে চেনার সেরা উপায় তিনটি। অর্থ লেনদেন করা, ভ্রমণ করা এবং কিছুকাল একসঙ্গে বাস করা। এই তিনটিই সম্ভব একা ট্রাভেলে।
আপনি কেমন বাজেট করতে পারেন? ভ্রমণকালের ঝুঁকি, আনন্দ, মেলামেশা, নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে আপনার দক্ষতা কেমন? সবচেয়ে বড় কথা, যখন আশপাশে পরিচিত কেউ থাকবে না, সে সময় নিজেকে কী কাজ বা ভাবনায় ব্যস্ত রাখেন?
নিজের সঙ্গ কি আপনি নিজে উপভোগ করেন? এই প্রশ্নগুলোর জট খুলে নিজের সত্য সত্তাকে আবিষ্কারের অসাধারণ উপায় হতে পারে একা ঘোরা। একবার একা ঘুরে এলেই আপনি জানবেন, নিজের জীবন, মন ও মানসিকতার কোন বিষয়টিতে কাজ করা এখনো বাকি আছে।
আরেকটা বড় সুবিধা হলো জীবনের মূল ‘কারেন্সি’—সময় বণ্টনে। মনে করুন, বগা লেকে যাবেন বলে বের হয়েছেন। বান্দরবান পৌঁছে মনে হলো, একটা দিন শহরটাই দেখি। বা নিরিবিলি আলসে গড়াই একটা দিন। নিজেই চলে গেলেন রুমা বাজার।
বৃহস্পতিবার ওখানে হাট বসে। স্থানীয় পাহাড়িরা ওই দিন পুরো পাহাড়টাই বাজারে উঠিয়ে নিয়ে আসেন। দেখলেন, কিছু দরদাম করলেন। অথবা চুপচাপ একটা দোকানে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে হরেক রকম মানুষ দেখলেন।
অথবা সাঙ্গুপাড়ে বসে রইলেন সূর্যাস্তের সময়। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, ঘড়ির কাঁটার শাসন নেই। নিজের সময়, নিজের ভাবনা, নিজের জীবনের ছোট ছোট কিছু মুহূর্ত থাকুক না কেবল নিজের কাছে।
নিরাপত্তা, সে কোথায়?
আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় সেই মানুষগুলোই, যারা কখনোই আমাদের কষ্ট দেবে না বলে ভাবি। সমস্যাটা বিশ্বাসে। একা ট্রাভেলে ওই বিশ্বাসটা না থাকার কারণেই আপনি শতগুণ বেশি সতর্ক থাকবেন। নিজেকে রক্ষা করা মানুষের সবচেয়ে আদিম প্রবৃত্তির অংশ। একা ঘুরতে গেলেই আপনার জেনেটিক কোডিং কীভাবে আপনাকে সচেতন করে তুলবে, টেরও পাবেন না।
একা মানুষ যেভাবে সবার ভিড়ে মিশে যেতে পারে, এটা বড় সুবিধাই বটে। তবে মিশে যাওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়। নিজের উপস্থিতি ঢেকে রাখা আর নিজের বোধ হারিয়ে ফেলা এক কথা নয়।
আপনি কারও চোখে অতিরিক্ত কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠবেন না, আবার এমনও নয় যে নিজের সমস্ত সত্তা গুটিয়ে নিয়ে হাঁটবেন। সলো ট্রাভেলিংয়ের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো দেখবেন সব, বলবেন কম, শুনবেন বেশি, বুঝবেন তারও বেশি।
নিরাপত্তা একটা অভ্যাস। যেমন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে দরজা বন্ধ করেছেন কি না দেখে নেওয়া, তেমনই বেড়াতে বের হওয়ার আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা। কোথায় যাচ্ছেন, কীভাবে যাচ্ছেন, কোথায় থাকবেন, কার নম্বর কাছে আছে, ফোনে চার্জ আছে কি না, নেটওয়ার্ক থাকবে কি না, সবই নিরাপত্তার অংশ। অনেকে ভাবেন, সাহস মানে কিছু না ভেবে বেরিয়ে পড়া। এটার নাম সাহস নয়, সাহস হলো ভয়কে সঙ্গে নিয়েও বুদ্ধিমান থাকা।
প্রস্তুতি: অর্ধেক পথ এখানেই শেষ
একা ঘোরার প্রস্তুতি শুরু হয় ব্যাগ গোছানোর আগেই। আগে গন্তব্য চেনা দরকার। জায়গাটার রাস্তা কেমন, শেষ গাড়ি কয়টায়, লোকাল পরিবহন নিরাপদ কি না, থাকার জায়গা বাজার বা মূল রাস্তা থেকে কত দূরে, জরুরি হাসপাতাল বা থানার অবস্থান কোথায়; এসব জানা রোমান্টিক নয়, কিন্তু জরুরি।
পাহাড়, সমুদ্র, বন, নদী—সব জায়গার আলাদা চরিত্র। সব জায়গা একই নিয়মে চলে না। যে নিয়ম সাজেকের জন্য ঠিক, সেটা সেন্ট মার্টিনে অপ্রয়োজনীয় হতে পারে। যে সাবধানতা রাতারগুলে দরকার, সেটা পাহাড়ি ট্রেইলে যথেষ্ট না–ও হতে পারে।
প্রথম সলো ট্রিপের জন্য খুব দূরের, খুব দুর্গম, খুব অচেনা জায়গা বেছে নেওয়ার দরকার নেই। শুরুটা হতে পারে কাছের কোনো জেলা, পরিচিত কোনো শহর, নিরাপদ কোনো রিসোর্ট বা এমন কোনো জায়গা, যেখানে আপনি আগেও গেছেন।
মানুষ যেমন হাঁটতে শেখে দাঁড়িয়ে, দৌড়ে নয়; সলো ট্রাভেলিংও তেমন। প্রথমেই নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে পাহাড়ের গভীর ট্রেইলে হারিয়ে যাওয়ার কোনো মানে নেই। আগে শিখুন একা বাসে উঠতে, একা হোটেলে চেক-ইন করতে, একা রেস্তোরাঁয় বসে খেতে, একা রাস্তা জিজ্ঞেস করতে। এই ছোট ছোট কাজগুলোই আপনাকে বড় পথে নিয়ে যাবে।
ব্যাগে কী থাকবে
ব্যাগ হালকা রাখুন, কিন্তু মাথা হালকা রাখবেন না। একা ঘুরতে গেলে ব্যাগের প্রতিটি জিনিসের একটা কাজ থাকা উচিত। জামাকাপড় যত কম নেওয়া যায় তত ভালো।
কিন্তু চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যানিটারি পণ্য, ছোট্ট একটা ছুরি, টর্চ, অতিরিক্ত টাকা, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, জরুরি নম্বর লেখা ছোট কাগজের মতো জিনিস বাদ দেওয়া যাবে না। ফোন হারিয়ে গেলে যেন পুরো পৃথিবী হারিয়ে না যায়, সেই প্রস্তুতি রাখুন।
টাকা কখনো এক জায়গায় রাখবেন না। কিছু ওয়ালেটে, কিছু ব্যাগের গোপন পকেটে, কিছু মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। কার্ড থাকলে ভালো, না থাকলে অন্তত এমন ব্যবস্থা রাখুন, যেন জরুরি মুহূর্তে কেউ টাকা পাঠাতে পারে। আমরা অনেক সময় ভাবি, ‘আরে, কী আর হবে!’ এই ‘কী আর হবে’ কথাটাই ভ্রমণের সবচেয়ে বিপজ্জনক অলসতা। কিছু না-ও হতে পারে। কিন্তু কিছু হলে আপনার প্রস্তুতিটুকুই আপনাকে বাঁচাবে।
ফোন, নেটওয়ার্ক আর লোকেশন
একা ভ্রমণে ফোন শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়। ফোন আপনার মানচিত্র, টিকিট কাউন্টার, ব্যাংক, টর্চলাইট, পরিচয়পত্র, সব। তাই ফোনের চার্জকে অবহেলা করবেন না। অবশ্যই পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখুন। গন্তব্যে নেটওয়ার্ক কোন অপারেটরের ভালো, আগে জানার চেষ্টা করুন।
পরিবারের কাউকে বা বিশ্বস্ত বন্ধুকে মোটামুটি রুট জানিয়ে রাখুন। কোথায় থাকছেন, কোন গাড়িতে উঠলেন, কোথায় পৌঁছালেন, তার লাইভ আপডেট দিতে হবে না সব সময়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো জানিয়ে রাখা ভালো।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব রিয়াল টাইমে দিয়ে দেবেন না। আপনি এখন কোথায়, কোন হোটেলে, একা আছেন কি না—এসব তথ্য পৃথিবীর সবার জানার দরকার নেই। ছবি দিন, গল্প দিন, কিন্তু সময় বুঝে দিন। কিছু আনন্দ দেরিতে শেয়ার করলেও তার রং ফিকে হয় না। বরং নিরাপদ থাকে।
‘না’ বলার বিদ্যা
একা ঘুরতে গেলে ‘না’ বলতে জানতে হবে। এটা রূঢ়তা নয়, আত্মরক্ষা। কেউ খুব বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে হাসিমুখে উত্তর এড়িয়ে যেতে পারেন। কেউ জানতে চাইল, একা এসেছেন কি না; সব সময় সত্যি বলার দায় আপনার নেই। ছোট ‘সাদা মিথ্যা’ কখনো কখনো নিরাপত্তার অংশ।
সবাই খারাপ নয়। আবার সবাই ভালোও নয়। এই মাঝামাঝি সত্যটা বুঝে চলাই ভ্রমণের জ্ঞান। অনেক মানুষ পথে সাহায্য করবে, পানি দেবে, রাস্তা দেখাবে, চা খাওয়াবে। আবার কেউ কেউ অকারণ কৌতূহলী হবে, অস্বস্তিকর হবে, সুযোগ নিতে চাইবে।
মানুষ চেনার কোনো নির্ভুল মিটার নেই, কিন্তু অস্বস্তি চেনার একটা ভেতরের সিগন্যাল আছে। সেই সিগন্যালকে গুরুত্ব দিন। কোনো জায়গা, কোনো মানুষ, কোনো গাড়ি, কোনো কথোপকথন যদি অস্বস্তিকর লাগে, নির্দ্বিধায় সরে আসুন। ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার নেই।
রাতের ঘুমও ভ্রমণের অংশ
ভালো থাকার জায়গা মানে দামি হোটেল নয়। ভালো থাকার জায়গা মানে নিরাপদ, পরিষ্কার, লোকেশন ভালো, স্টাফ পেশাদার, দরজার লক ঠিকঠাক, আশপাশে মানুষের চলাচল আছে। একা ঘুরতে গেলে খুব নির্জন, খুব সস্তা, খুব অজানা থাকার জায়গায় না যাওয়াই ভালো। বিশেষ করে প্রথম কয়েকটা সলো ট্রিপে।
চেক-ইন করার সময় চারপাশটা লক্ষ করুন। রুমে ঢুকে দরজা, জানালা, বাথরুম, লক সব দেখে নিন। রিসেপশনের নম্বর সেভ করে রাখুন। রাতের পর অপ্রয়োজনীয় বের হওয়া কমান। ভ্রমণ মানে রাত জেগে অ্যাডভেঞ্চার করা—এই ধারণা অনেক সময় সিনেমা থেকে আসে। বাস্তব ভ্রমণে ভালো ঘুম, নিরাপদ ঘুম, শান্ত ঘুম, এসবও খুব জরুরি।
খাওয়া, পানি, শরীর
ভ্রমণে শরীরকে অবহেলা করলে মনও ভেঙে যায়। একা গেলে অসুস্থ হওয়ার ঝামেলা দ্বিগুণ। তাই খাবার নিয়ে একটু সাবধান থাকুন। স্ট্রিটফুড অবশ্যই খাবেন; কিন্তু সবকিছু নয়, সব সময় নয়। পানি বোতলজাত হলে ভালো।
খুব বেশি চা-কফি, খুব কম পানি, খুব কম ঘুম—এসব মিলেই শরীরকে ক্লান্ত করে দেয়। আর ক্লান্ত শরীর ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।
পাহাড়ে গেলে হাঁটার জুতা জরুরি, সমুদ্রে গেলে শুকনা কাপড়, বনে গেলে মশারোধী উপকরণ। শহরে গেলে গুগল ম্যাপ জরুরি। কোথায় যাচ্ছেন, সে অনুযায়ী শরীরের প্রস্তুতিও বদলাবে। আপনি নিজের শরীরকে যত ভালো চিনবেন, ভ্রমণ তত সুন্দর হবে। নিজের ক্ষুধা, ক্লান্তি, ভয়, উত্তেজনা, একটু কষ্ট করে হলেও পড়তে শিখুন, বুঝুন।
স্বাধীনতার আরেক নাম হিসাব
একা ঘোরার সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা হলো টাকা সামলানো। দল থাকলে অনেক সময় খরচ ভাগ হয়ে যায়, কেউ না কেউ দরদাম করে, কেউ না কেউ হিসাব রাখে। একা গেলে সব আপনার। বাসভাড়া, খাবার, থাকা, টিকিট, গাইড, নৌকা, অতিরিক্ত চা, হঠাৎ কেনা একটা শাল—সবই।
খরচের একটা মোটামুটি হিসাব আগে করে নিন। তারপর সেটার ওপর অন্তত ২০-৩০ শতাংশ জরুরি টাকা রাখুন। কারণ, ভ্রমণে সব পরিকল্পনা মেনে হয় না। গাড়ি মিস হতে পারে, এক রাত বেশি থাকতে হতে পারে, হঠাৎ অসুস্থ হতে পারেন বা কোনো জায়গা এত ভালো লেগে যেতে পারে যে ফিরতেই মন চাইবে না। স্বাধীনতা ভালো, কিন্তু স্বাধীনতারও খরচা আছে। সেই খরচের জন্য প্রস্তুত থাকুন।
একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা এক জিনিস নয়
একা ঘুরতে গেলে একটা সময় আসবেই, যখন মনে হবে, আহারে, এমন মুহূর্তটা ভাগ করে নেওয়ার কেউ নেই! সুন্দর সূর্যাস্ত দেখছেন, পাশে কেউ নেই। একটা অসাধারণ খাবার খেলেন, কেউ ভাগ করে খাচ্ছে না। বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে আছেন, পরিচিত কারও কাঁধ নেই। তখন একটু মন খারাপ হতেই পারে; সেটা ব্যর্থতা নয়।
নিঃসঙ্গতা মানে শূন্যতা নয়। কখনো কখনো নিঃসঙ্গতা একটা আয়না। সেখানে আপনি নিজেকে দেখেন, নিজের অস্থিরতা দেখেন, নিজের অভিমান দেখেন। বুঝতে পারেন, আপনি আদতে কতটা অন্যের স্বীকৃতিতে বাঁচেন, কতটা নিজের ভেতরের শব্দ শুনতে পারেন। সলো ট্রাভেল আপনাকে সব সময় আনন্দ দেবে না। কিন্তু আপনাকে সত্য উপহার দেবে।
মানুষের সঙ্গে মেশা, কিন্তু মাপ রেখে
একা ঘোরা মানে কারও সঙ্গে কথা বলবেন না, এমন নয়। বরং একা গেলে অনেক সময় মানুষের সঙ্গে সত্যিকারের কথাবার্তা হয়। দোকানদার, নৌকার মাঝি, হোটেলের কর্মী, পাহাড়ি নারী, পাশের সিটের যাত্রী, চায়ের দোকানের কিশোর—সবাই একেকটা চলমান বই। দল থাকলে আমরা নিজেদের কথাতেই ব্যস্ত থাকি। একা গেলে পৃথিবীর কথাও শুনতে পাই।
তবে মেলামেশার একটা মাপ থাকা দরকার। খুব দ্রুত খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হবেন না। নিজের থাকার জায়গা, পুরো রুট, আর্থিক অবস্থা, একা থাকার তথ্য অকারণে কাউকে জানাবেন না। হাসিমুখে কথা বলা আর জরুরি তথ্য দিয়ে দেওয়া এক কথা নয়। ভদ্রতা রাখুন, দূরত্ব রাখুন, নিজের সীমারেখা রাখুন।
ফিরে আসার পর
সলো ট্রিপ শেষ হয় না বাসায় ফেরার পরও। আপনি ফিরবেন, কাপড় ধুবেন, ছবি দেখবেন, খরচের হিসাব মেলাবেন। কিন্তু আসল হিসাবটা হবে ভেতরে। কোথায় ভয় পেয়েছিলেন, কোথায় ভালো লেগেছিল, কোথায় ভুল করেছিলেন, কোথায় নিজেকে নিয়ে গর্ব হয়েছে, এসব লিখে রাখুন। একটা ছোট ট্রাভেল জার্নাল রাখলে ভালো বা একটা স্কেচবুক। সবকিছু যে শব্দে প্রকাশ হয় না!
প্রথম সলো ট্রিপ আপনাকে বদলে দেবে, এমন দাবি করছি না। কোনো পাহাড়ে উঠে, কোনো সমুদ্রে দাঁড়িয়ে, কোনো জঙ্গলে হাঁটলেই মানুষ হঠাৎ জ্ঞানী বা অন্য রকম হয়ে যায় না। কিন্তু একটা ছোট পরিবর্তন হয়। আপনি জানবেন, আপনি একা একটা জায়গায় গেছেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ভুল করেছেন, সামলেছেন, ফিরেছেন। এই জানাটুকুই শক্তি। এই শক্তি পরে জীবনের অন্য জায়গায়ও কাজে লাগে।
সম্পর্ক ভাঙলে, চাকরি বদলালে, শহর বদলালে, জীবনের দিক পাল্টালে আপনি মনে করতে পারবেন, ‘আমি পারি। আমি আগেও একা পথ চিনেছি।’