রুম থেকেই দেখা যাচ্ছিল পিরামিড
পিরামিড! কত যে নাম শুনেছি আর ছবি দেখেছি সেই স্কুলজীবন থেকে, যদিও কল্পনা করিনি বাস্তবে কখনো এর দেখা পাব।
কায়রো এয়ারপোর্ট থেকে অন অ্যারাইভাল ভিসা নিতে আমাদের প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগল। যদিও ইজিপ্ট এয়ারের টিকিটের সুবাদে আমাদের ‘ওকে টু বোর্ড’ করা ছিল। বাইরে এসে গাইডের দেখা পেলাম, বাংলাদেশি ছোট ভাই কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র—বিশেষ অনুরোধে আমাদের সাহায্য করছেন। আমাদের ১৬ সদস্যের দলের জন্য হোটেল ঠিক করা ছিল গিজাতে। পড়ন্ত বিকেলে দুপুরের খাবার শেষে হোটেলে পৌঁছে বিশ্রাম নিলাম। রুম থেকেই মিউজিয়ামের সুবিশাল স্থাপনা আর রাতের পিরামিড দেখা যাচ্ছিল।
ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে কায়রোর রাতের তাপমাত্রা অনেক কম হলেও উজ্জ্বল রোদের ঝলমলে সকালে প্রত্যেকের জন্য ৭০০ মিসরীয় পাউন্ডের টিকিট কেটে পিরামিড কমপ্লেক্সে ঢুকে পড়লাম। শুরুতেই মডেল পিরামিড কমপ্লেক্স আর এর নির্মাণশৈলীর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সঙ্গে আছে নির্মাণে ব্যবহার করা কিছু যন্ত্রপাতি। সাধারণ এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে এত বিশাল স্থাপনা তৈরি যে কী বিশাল কর্মযজ্ঞ, তা অনুমান করাই দুঃসাধ্য।
গিজা নেক্রোপোলিস নামে পরিচিত বিশাল এই কমপ্লেক্সে প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার জন্য শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসের ব্যবস্থা আছে। চাইলে সবগুলোতে যেতে পারবেন, অথবা যেটা আপনার পছন্দ শুধু সেখানেও যেতে পারবেন। এই কমপ্লেক্স সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে বিকেল চারটার পর আর প্রবেশ করা যায় না।
৩টি পিরামিডের মধ্যে মাঝের ৪৪৮ ফুট উচ্চতার কাফ্রের পিরামিডের ওপরের দিকেই শুধু এখনো লাইমস্টোনের আস্তরের দেখা পাওয়া যায়। এখানে বলে রাখা দরকার, কয়েকটি অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে বাবা খুফুর চেয়ে ছেলে কাফ্রের পিরামিড উঁচু দেখায়। প্রতিটি পিরামিডের ভেতরে ঢুকতে গিজা কমপ্লেক্সের ৭০০ মিসরীয় পাউন্ডের টিকিটের বাইরে আলাদা করে টিকিট কাটতে হয়, যা কুফু, কাফ্রে আর মেনকাউরের জন্য যথাক্রমে ১ হাজার ৫০০, ২৮০ আর ২০০ মিসরীয় পাউন্ড।
সবশেষে আমরা গেলাম স্ফিংস ঘুরে দেখতে। একটি পাথরখণ্ডে তৈরি মানুষের মাথা আর সিংহের মতো দেহে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে তাকিয়ে থাকা বিশালকায় মূর্তি। কথিত আছে যে পিরামিডের সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে নির্মিত এই স্ফিংসের নাক নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পিরামিড কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে পড়ন্ত বিকেলে দুপুরের খাবার শেষে নীল নদে নৌভ্রমণে গেলাম। পৃথিবীর দীর্ঘতম ৬ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের এই নদ ১১টি দেশ অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরে মিশেছে। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই নদী কৃষি, সেচ ও যোগাযোগব্যবস্থায় প্রধান ভূমিকা রেখেছে। সন্ধ্যার পর আবার গেলাম পিরামিড কমপ্লেক্সে, এক হাজার মিসরীয় পাউন্ডের টিকিট কেটে পিরামিডের লাইট আর সাউন্ড শো দেখতে। হাড় হিম করা ঠান্ডায় স্ফিংসের সামনে দর্শকসারিতে বসে আলোকসজ্জিত পিরামিড কমপ্লেক্সের ইতিহাস বর্ণনা উপভোগ করলাম। বিভিন্ন দেশে দেখা লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোর অভিজ্ঞতায় মনে হলো, পিরামিডকে সামনে রেখে গিজার এই আয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও আকর্ষণীয় করার সুযোগ ছিল।