ওজন বাড়ার সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক কী

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ওবিসিটির হার বৃদ্ধির সঙ্গে এমএএসএলডি একটি নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।ছবি: এআই/প্রথম আলো

‘ফ্যাটি লিভার’ সমস্যাটির সঙ্গে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের নতুন ও বৈজ্ঞানিক নাম হলো এমএএসএলডি (মেটাবলিক ডিসফাংশন—অ্যাসোসিয়েটেড স্টেটোটিক লিভার ডিজিজ)। কারণ, এই রোগ মূলত মেটাবলিক বা বিপাকীয় একটি সমস্যা এবং এটি স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় ওবিসিটির হার বৃদ্ধির সঙ্গে এমএএসএলডি একটি নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

এমএএসএলডি কী?

এমএএসএলডি হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়। সঙ্গে নানা ধরনের মেটাবলিক সমস্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। যেমন—

  • ওবিসিটি

  • টাইপ ২ ডায়াবেটিস

  • ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স

  • উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড

আরও পড়ুন

এটি সাধারণত প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ সৃষ্টি করে না। তাই অনেক রোগী অজান্তেই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

ওবিসিটি কীভাবে এমএএসএলডি সৃষ্টি করে?

১. ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: ওবিসিটির কারণে শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায়। এর ফলে শরীর থেকে বেশি ফ্যাটি অ্যাসিড লিভারে জমা হয় এবং লিভার চর্বিযুক্ত হয়ে পড়ে।
২. পেটের চর্বি: পেটের চারপাশে জমা চর্বি সরাসরি লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়ায়। দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীতে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
৩. অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ: অতিরিক্ত খাবার, বিশেষ করে চর্বি ও চিনিসমৃদ্ধ খাদ্য লিভারে চর্বি জমাকে ত্বরান্বিত করে।
৪. দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ: ওবিসিটি শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা লিভারের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রোগকে গুরুতর করে তোলে।

কেন এমএএসএলডি গুরুতর সমস্যা?

অনেকে এটিকে সাধারণ সমস্যা মনে করলেও এমএএসএলডি দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—
১. প্রদাহ: এমএএসএলডি থেকে এমএএসএইচ (মেটাবলিক ডিসফাংশন—অ্যাসোসিয়েটেড স্টেটোহেপাটাইটিস) হতে পারে, যেখানে লিভারে প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি হয়।
২. লিভার সিরোসিস: দীর্ঘদিন থাকলে লিভার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সিরোসিস হতে পারে।
৩. লিভার ক্যানসার: এমএএসএলডি বর্তমানে লিভার ক্যানসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৪. ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি: এমএএসএলডি রোগীদের মধ্যে টাইপ–২ ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

আরও পড়ুন

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

  • স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তি

  • যাঁদের পেটের মাপ বেশি

  • ডায়াবেটিস রোগী

  • উচ্চ কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইড আছে

  • শারীরিক পরিশ্রম কম করেন

প্রতিরোধ ও করণীয়

১. ওজন কমানো: শরীরের ওজন ৭-১০% কমালে লিভারের চর্বি এবং প্রদাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
২. নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা ব্যায়াম করা উচিত।
৩. স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: কম চিনি, কম তেলযুক্ত খাবার, বেশি শাকসবজি, ফলমূল ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।
৪. ডায়াবেটিস ও লিপিড নিয়ন্ত্রণ: রক্তের সুগার ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
৫. নিয়মিত পরীক্ষা: ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের লিভার ফাংশন টেস্ট এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম করা উচিত।
৬. ওষুধ: বর্তমানে কিছু আধুনিক ওষুধও আশাব্যঞ্জক ফল দেখাচ্ছে। ওজন কমানোর ওষুধ জিএলপি–ওয়ান অ্যাগোনিস্ট যেমন সিমাগ্লুটাইড বা টারজিপিটাইড ওজন কমানোর পাশাপাশি লিভারের চর্বি হ্রাসে সহায়ক। এ ছাড়া নতুন কিছু ওষুধ লিভারের চর্বি, প্রদাহ ও ক্ষতি কমাতে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষ করে এমএএসএইচ রোগীদের ক্ষেত্রে।

শেষ কথা

ওবিসিটি ও ফ্যাটি লিভার একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অবহেলা করলে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। সময়মতো ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণই ফ্যাটি লিভার থেকে গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।

ডা. আহমাদ মনিরুল হক, কনসালট্যান্ট এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, এপিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চট্টগ্রাম

আরও পড়ুন