এই শহরে সমাহিত আছেন টাইটানিক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ১৫০ যাত্রী, ঘুরে ঘুরে দেখলাম সমাধিক্ষেত্রগুলো

১৯১২ সালে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জাহাজ টাইটানিকের নাম জড়িয়ে আছে কানাডার পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী হ্যালিফ্যাক্সের সঙ্গেও। গত মাসে হ্যালিফ্যাক্সে বেড়াতে গিয়ে টাইটানিকের সেই অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন এলিজা বিনতে এলাহী

মেরিটাইম মিউজিয়াম অব আটলান্টিকে লেখকছবি: এলিজা বিনতে এলাহীর সৌজন্যে

শান্ত, পরিচ্ছন্ন, সবুজ শহর হ্যালিফ্যাক্স। শহরজুড়ে বড় বড় ম্যাপেলগাছ, ফুল, পাখি, কবুতর আর গাংচিল। শহর ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়, বসতির চেয়ে নাগরিক উদ্যানই বেশি। পার্কের বেঞ্চিতে বসে কেউ বই পড়ছেন, কেউ ছবি আঁকছেন, কেউ ল্যাপটপে কাজ করছেন, কেউ নিজের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। শহরজুড়ে কোনো তাড়াহুড়া নেই, নেই শব্দদূষণ। মহাসাগর, উপসাগর, লেক নানা ধরনের জলাধার ঘিরে থাকা এই শহরে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি আর পুরোনো ঐতিহাসিক স্থাপনাও কম নয়।

তবে হ্যালিফ্যাক্সের সঙ্গে আমার পরিচয় শুধু এই শান্ত শহরটুকুতে আটকে থাকেনি। এই শহরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাইটানিক দুর্ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল ২ হাজারের বেশি যাত্রী ও ক্রু নিয়ে প্রথম যাত্রায় রওনা হয় আরএমএস টাইটানিক। চার দিন পর, ১৪ এপ্রিল মধ্যরাতের ঠিক আগে, উত্তর আটলান্টিকে একটি হিমশৈলের সঙ্গে ধাক্কা লাগে জাহাজটির। তিন ঘণ্টারও কম সময়ে ডুবে যায় টাইটানিক। প্রাণ হারান প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ। বেঁচে যাওয়া মানুষদের পরে কার্পাথিয়া জাহাজ উদ্ধার করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়।

দুর্ঘটনার পর মৃতদেহ উদ্ধারে হ্যালিফ্যাক্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনাস্থলের তুলনামূলক কাছাকাছি বড় বন্দর, রেল ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগের সুবিধা থাকায় উদ্ধার করা মৃতদেহগুলো এখানে আনা হয়। হোয়াইট স্টার লাইন চারটি কানাডীয় জাহাজ নিয়োগ করে মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য। এর মধ্যে হ্যালিফ্যাক্স থেকে রওনা হওয়া সিএস ম্যাকে-বেনেট ছিল প্রথম জাহাজ।

চারটি জাহাজ মিলে মোট ৩২৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। তাঁদের অনেককে সমুদ্রেই সমাহিত করা হয়। বাকিদের হ্যালিফ্যাক্সে নিয়ে আসা হয়। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়েছিল সঙ্গে পাওয়া পোশাক, গয়না, চিঠি ও অন্যান্য জিনিসের মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জনকে হ্যালিফ্যাক্সের তিনটি সমাধিক্ষেত্র ফেয়ারভিউ লন, মাউন্ট অলিভেট ও ব্যারন হির্শে সমাহিত করা হয়।

এই তিন সমাধিক্ষেত্র ঘুরে দেখার পর মনে হয়েছিল, হ্যালিফ্যাক্সে টাইটানিকের স্মৃতি বোধ হয় এতটুকুই। কিন্তু আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো।

সমাধিস্থলগুলো দেখার কয়েক দিন পর গেলাম শহরের মেরিটাইম মিউজিয়াম অব আটলান্টিকে। এখানেই টাইটানিকের সঙ্গে হ্যালিফ্যাক্সের সম্পর্কের আরেকটি বড় অধ্যায় অপেক্ষা করছিল।

জাদুঘরের স্থায়ী প্রদর্শনীর নাম ‘টাইটানিক: দ্য আনসিঙ্কেবল শিপ অ্যান্ড হ্যালিফ্যাক্স’। টাইটানিক কীভাবে তৈরি হয়েছিল, কীভাবে ডুবেছিল এবং দুর্ঘটনার পর হ্যালিফ্যাক্স কী ভূমিকা রেখেছিল এসবের পাশাপাশি এখানে রাখা হয়েছে জাহাজটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নানা নিদর্শন। প্রদর্শনীতে রয়েছে ৫০টির বেশি বস্তু, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ও নথি।

গ্যালারিতে ঢুকেই মনে হলো, এত দিন টাইটানিককে যেভাবে বইয়ের পাতা, ছবি আর সিনেমার পর্দায় দেখেছি, এবার যেন তার অনেকটা কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছি।

আসল ডেক চেয়ারের সামনে

টাইটানিকের আসল ডেক চেয়ারের একটি
ছবি: এলিজা বিনতে এলাহী

গ্যালারির মাঝামাঝি এসে একটি কাঠের চেয়ারের সামনে থমকে দাঁড়ালাম। এটি টাইটানিকের আসল ডেক চেয়ারের একটি। ১৯১২ সালে জাহাজটি ডুবে যাওয়ার পর উদ্ধার করা এই ডেক চেয়ারটি এখন জাদুঘরের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর একটি। এর পাশে রাখা আছে একটি পুনর্নির্মিত ডেক চেয়ার, যেখানে বসে দর্শনার্থীরা সেই সময়ের যাত্রীদের অভিজ্ঞতা কল্পনা করতে পারেন।

কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করলাম। ভাবছিলাম, এমনই কোনো চেয়ারে বসে হয়তো কেউ আটলান্টিকের ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করছিলেন সেই রাতে। তখনো তিনি জানতেন না, তাঁর যাত্রার শেষটা কতটা ভয়াবহ হতে যাচ্ছে।

এক জোড়া ছোট্ট জুতা

এক জোড়া ছোট চামড়ার জুতা
ছবি: এলিজা বিনতে এলাহী

এরপর চোখ আটকে গেল একটি কাচের বাক্সে রাখা এক জোড়া ছোট চামড়ার জুতায়।

এই জুতাজোড়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে টাইটানিকের ‘অজানা শিশু’র গল্প। ১৯১২ সালে ম্যাকে-বেনেট জাহাজের নাবিকেরা যে অজ্ঞাত শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছিলেন, তাকে ফেয়ারভিউ লন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। পরে ডিএনএ গবেষণায় শিশুটিকে ১৯ মাস বয়সী সিডনি লেসলি গুডউইন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, প্রদর্শিত জুতাজোড়াটি সেই শিশুটিরই বলে বিশ্বাস করা হয়।

ফেয়ারভিউ লনে যে ছোট্ট সমাধিটির সামনে দাঁড়িয়ে এসেছি, তার সঙ্গে এবার এই জুতাজোড়ার যোগসূত্র পেলাম। একই গল্পের দুই প্রান্ত যেন এসে মিলল।

আরও পড়ুন

সমুদ্র থেকে উঠে আসা কাঠ

দেয়ালজুড়ে সাজানো ছিল কাঠের নানা টুকরো
ছবি: এলিজা বিনতে এলাহী

দেয়ালজুড়ে সাজানো ছিল কাঠের নানা টুকরো। কোনোটি সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা, কোনো কোনো অংশে এখনো সোনালি প্রলেপের চিহ্ন দেখা যায়।

টাইটানিক ডুবে যাওয়ার পর সমুদ্রে ভেসে ওঠা এসব কাঠের অংশ স্থানীয় জেলে ও নাবিকেরা সংগ্রহ করেছিলেন। পরে বহু পরিবার সেগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের কাছে রেখে দেয়। সেসব নিদর্শনের অনেকগুলোই পরে জাদুঘরে দান করা হয়। আজ এগুলোই জাদুঘরের টাইটানিক সংগ্রহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ছবিতে টাইটানিকের জীবন

জাদুঘরের প্রদর্শনীতে রয়েছে টাইটানিকের ৫০টির বেশি বস্তু, ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ও নথি
ছবি: এলিজা বিনতে এলাহী

প্রদর্শনীতে শুধু দুর্ঘটনার গল্প নেই; আছে টাইটানিকে মানুষের জীবনযাত্রার ছবিও। প্রথম শ্রেণির বিলাসবহুল যাত্রী থেকে তৃতীয় শ্রেণির অভিবাসী, আবার বয়লার-কক্ষে কাজ করা নাবিক জাহাজটির ভেতরে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে।

একটি জাহাজের ভেতরে একই সময়ে কত রকমের জীবন চলছিল, এসব ছবি ও নিদর্শন তা বুঝিয়ে দেয়।

সিনেমার সঙ্গেও যোগ

টাইটানিকের এই সংগ্রহ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৯৭ সালের জেমস ক্যামেরনের টাইটানিক নির্মাণের সময় ক্যামেরন নিজে জাদুঘরের টাইটানিকের নিদর্শন দেখেছিলেন। চলচ্চিত্রটির গবেষণাতেও জাদুঘরের সংগ্রহ ও বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান কাজে লেগেছিল।

টাইটানিকের গল্প এত দিন বইয়ে পড়েছি, সিনেমায় দেখেছি। হ্যালিফ্যাক্সের তিনটি সমাধিক্ষেত্র ঘুরে সেই গল্পের মানুষগুলোর শেষ ঠিকানাও দেখেছি। কিন্তু মেরিটাইম মিউজিয়ামে এসে প্রথমবার মনে হলো, সেই গল্পের কিছু বস্তু যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।

একটি ডেক চেয়ার, এক জোড়া শিশুর জুতা, সমুদ্র থেকে উঠে আসা কাঠের টুকরো, পুরোনো আলোকচিত্র প্রতিটি নিদর্শন যেন ১৯১২ সালের সেই রাতের সঙ্গে বর্তমানকে একটি অদৃশ্য সুতায় বেঁধে রেখেছে।

আরও পড়ুন