কয়েকটা দিন আফ্রিকান অপরূপ অরণ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলাম

আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে উঁচু পর্বত কিলিমানজারোতে গিয়েছিলেন ইফতেখারুল ইসলাম। পর্বত আরোহণ ছাড়াও তানজানিয়ায় জাতীয় উদ্যানে সাফারি করেছেন তিনি। এ সফরের গল্প নিয়েই আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন। আজ পড়ুন নবম ও শেষ কিস্তি।

স্টেলা পয়েন্টে কিলিমানজারো অভিযাত্রীরাছবি: ইফতেখারুল ইসলামের সৌজন্যে

মাঝরাতে সামিট পুশে যাত্রা করার পর প্রথম দিকটায় অন্ধকারে কিছুটা একা ও দিকভ্রান্ত লাগছিল। দিনের আলো, গাইডদের উত্সাহ আর কাছাকাছি অন্য কয়েকজন সঙ্গীকে পেয়ে অনিশ্চয়তা কেটে যায়। তারপর আবার চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাঁটতে থাকি। কিছুক্ষণ পরপর একটু থামি। অন্য সবাই পাথরের ওপর বসে বিশ্রাম নেন। আমি বড় পাথর খুঁজে তাতে হেলান দিয়ে দাঁড়াই। এত উঁচুতে উঠে ক্লান্ত শরীরে ঠিকভাবে বসলে আমি চট করে উঠতে পারি না। তাই দাঁড়িয়েই বিশ্রাম নিই। তারপর আবার এগিয়ে চলা। ক্লান্ত পা টেনে টেনে চলার সময় ভাবছি, এ পথ বুঝি কোনো দিন শেষ হবে না। ঠিক তখনই অল্প দূরে কিছু মানুষের ছোট জটলা দেখতে পাই। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরাও সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। ৫ আগস্ট সকাল পৌনে নয়টায় আমি গিয়ে দাঁড়াই কিলিমানজারোর অন্যতম শিখর স্টেলা পয়েন্টে। এর উচ্চতা ৫ হাজার ৭৫৬ মিটার।  

আমাদের সবাই বেশ ক্লান্ত। কারও কারও খিদে পেয়েছে। অণু তারেক বলল, সে উহুরু পিক (৫ হাজার ৮৯৫ মিটার) পর্যন্ত যেতে আগ্রহী নয়।
আমি বললাম, সবাই যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই ঠিক। যদি একজনও বাকি ১০০ মিটার যেতে চান, তাহলে আমিও যাব। আমি যেতে পারব, তবে এই পথ ধরে নামতে কষ্ট হবে খুব। সবাই একমত হয়ে স্টেলা পয়েন্টে দাঁড়িয়ে গ্রুপ ছবি তুললাম। পায়ের কাছে সামান্য তুষার। সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। নিজেদের কাছে যা যা খাবার ছিল সব বের করে নিলাম। বাদাম, খেজুর, চকলেট, প্রোটিন বার ও বিস্কুট একটু একটু করে খেয়ে ফেরার জন্য তৈরি হই।

স্টেলা পয়েন্টে লেখক
ছবি: ইফতেখারুল ইসলামের সৌজন্যে

নামার সময় অন্যরা যত সহজে ওই কাঁকর ও ধুলার ওপর পা ফেলে নেমে যান, সেটা আমি পারি না। ধীরে নামছি। অল্প কিছুটা নেমে আসার পর জাকির জানতে চায়, যদি কেউ সাত মহাদেশের সাতটা শিখরে যাওয়ার রেকর্ড করতে চায় তাহলে আমাদের এটা কি শিখরে পৌঁছানো বলে গণ্য হবে। আমি বললাম, আমরা কিলিমানজারো শিখরে আরোহণের সার্টিফিকেট পাব। তবে সেভেন সামিট করতে হলে মনে হয় উহুরু পিক পর্যন্ত যেতে হবে। তখন জাকির বলল, ও উহুরুতে যাবে। এখন অন্য সবার আর ফেরার উপায় নেই। আমাদের একজন যাক। আমাদের গাইড হাওয়া তাকে সঙ্গ দেবে বলে সেও ফিরে যায়।

পাথরের গুঁড়া আর ধুলিময় পথে ৪৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে নেমে যাওয়া অসম্ভব কঠিন। বিশেষ করে শিখরের কাছের উতরাই সবচেয়ে কষ্টকর। এ সময় এরিক ও হাফিজ দুই পাশ থেকে আমাকে ধরে নামিয়ে দিয়েছে বেশ খানিকটা পথ। তারপর বাকি পথে কাঁকর, বালি ও পাথরের খাড়া উতরাই ধরে নিজের মতো করে নামি। বড় বড় পাথর ডিঙিয়ে নামি। চেষ্টা করেও কখনো কখনো ভারসাম্য রাখতে পারি না। দুবার পা হড়কে পড়ে গিয়ে হাতে ও পায়ে ব্যথা পাই। জামাকাপড়ের এতগুলো স্তর ভেদ করে কনুইয়ের কাছটা কেটে রক্ত বের হলো কীভাবে, তা বুঝতেই পারিনি। পরে জেনেছি আমাদের দলের অন্য কেউ কেউ ওই পথে নামার সময় কয়েকবার আছাড় খেয়েছেন। দুয়েকবার না পড়ে পর্বতারোহণ হয় না। কিছুটা নেমে আসার পর ব্যথা ও রক্তপাত সত্ত্বেও আমি আবার উদ্দীপনা ফিরে পাই। যত নিচে নামছি, ততই বেশি অক্সিজেন। শ্বাস সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে আসে।    

কিলিমানজারোর গায়ে সামান্য তুষার
ছবি: ইফতেখারুল ইসলামের সৌজন্যে

ছয় দিন ট্র্যাক করে যে পথ পাড়ি দিয়েছি, ফেরার সময় তা দুই দিনে পার হয়ে যাব কীভাবে? এখন এক দিনেই নামতে হবে অনেকটা পথ। ৫ হাজার ৭৫৬ মিটার থেকে নেমে একেবারে ৩ হাজার ৮২০ মিটারে মিলেনিয়াল ক্যাম্প। পথে লাঞ্চের জন্য থামি বারাফু ক্যাম্পে। সেখান থেকে মিলেনিয়াল ক্যাম্পে যাওয়ার বাকি পথ প্রায় সমতল। তবু সেখানে পৌঁছতে রাত হয়ে যায়। আগের রাত ১২টা থেকে পরের দিন রাত ৮টা পর্যন্ত ক্রমাগত হাঁটলাম। ১ হাজার ১০০ মিটার আরোহণের পর প্রায় দুই হাজার মিটার নিচে নেমে আসা। অ্যাপল ওয়াচের চার্জ শেষ হয়েছে সেই সকাল বেলাতেই। সুতরাং এই দিনটার স্টেপস বা কদম ফেলার সংখ্যা হিসাব তাতে রেকর্ড করা নেই। মুঠোফোনের স্টেপ-আপ অ্যাপ দেখাচ্ছে ৩৭ হাজার ২০০ স্টেপস।      
এখানেই শেষ নয়। পরের দিন পায়ের আঙুলে ক্ষত ও তীব্র ব্যথা নিয়ে যাত্রা শুরু। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বৃষ্টিভেজা পথে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটা। আবার নানা রঙের ফুল, নানা রকমের পাখির ডাক। সাদা রোমশ লেজ ঝুলিয়ে গাছের ওপরে বসে থাকা কলোবাস বানরের দল। এসব পার হয়ে গেটের কাছে পৌঁছাই। জাতীয় উদ্যানকে বিদায় জানিয়ে ট্রেকিং পোল দুটো ধুয়ে গুটিয়ে নিই। অফিসে গিয়ে ওদের খাতায় নাম লিখি। ১ হাজার ৬৮০ মিটার উচ্চতায় মুয়েকা গেট দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বাসে উঠি।
রাতে মোশির সেই হোটেলে ঢুকতেই রুমের চাবি এগিয়ে দেয় ওরা। কয়েকটা দিন কত অপরূপ আফ্রিকান অরণ্যের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলাম। কত রোমাঞ্চকর দিন ও রাত কাটিয়েছি কিলিমানজারোর পার্বত্য পথে। কত রূপে ও রঙে আমাদের চোখে ধরা দিয়েছে কিলিমানজারো। সব শেষে সেই সন্ধ্যায় হোটেলে ফেরার পর শাওয়ার নেওয়াটাও কম আনন্দের ব্যাপার ছিল না।

পরের চারটি দিন কেটেছে তানজানিয়ার তারাঙ্গিরি আর সেরেঙ্গেটি জাতীয় উদ্যানে আফ্রিকার বন্য প্রাণী ও পাখি দেখে দেখে। গোরংগোরো ক্রেইটার আর এক আশ্চর্য জগৎ। সাফারিতে আমাদের একজন সঙ্গী পাখিপ্রিয় ফটোগ্রাফার মিশু জানান, ১৭৫ প্রজাতির পাখির ছবি তুলেছেন ওই চার দিনে। সাফারি থেকে ফিরে আরুশা শহরে কাটাই আরও কয়েকটা দিন। মাসাইদের হাতে তৈরি কারুশিল্পের বাজারে মাসাইদের সঙ্গে গল্প করে অনেকটা সময় কাটে। সেদিন বিকেলে হোটেলে আমার হাতে তুলে দেওয়া হয় কিলিমানজারো আরোহণের সার্টিফিকেট।  

বুকের ভেতরে পর্বত

দেশে ফিরে আসার পর অনেক দিন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছুই লিখতে ইচ্ছা করে না। একটি বাক্যও তৈরি করতে পারি না। প্রিয় মানুষদের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটা আড্ডায় বসে কিলিমানজারোর কিছু ছবি দেখাই। অনেক প্রশ্ন সবার। করবী, ফরিদ, মিলা আপা, মোস্তফা কামাল, কামরুল হাসান, রেহানা আপা, ডলি আপা, মোনায়েম বিশ্বাস ও লুনা প্রশ্ন করেন। অন্যদের চেয়ে এ বিষয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের আগ্রহই যেন সবচেয়ে বেশি। সবার প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করি। কিন্তু ছবি ও কথায় কিছুতেই বোঝাতে পারি না নাম-পরিচয় হারিয়ে ফেলা আফ্রিকান মানুষের মর্মবেদনা। বোঝাতে পারি না আফ্রিকার সৌন্দর্য। আফ্রিকার আকাশের গায়ে কিলিমানজারোর বিষাদময় একলা দাঁড়িয়ে থাকা। এসব দৃশ্য ও স্মৃতি আমাকে আরও একা করে দেয়।
বুকের ভেতরে পর্বত, গিরিপথ ও হিমবাহের অজস্র ছবির সঙ্গে জমা হয়ে গিয়েছে তানজানিয়ার ঘাসের প্রান্তর, পাথুরে পথ আর দিনের বিভিন্ন সময়ে দেখা নানা রঙের কিলিমানজারো। এখনো রাতে মনে হয় খোলা আকাশ, মলিন মায়াময় চাঁদ ও মিটিমিটি করে জ্বলা নক্ষত্রদের নিচে দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপছি। গভীর রাতে মনে হয় তাঁবুর ভেতরে পাহাড়ের অসমতল মাটিতে পাতা বিছানায় শুয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। ঘুমের ভেতরে শুনি গান। জাম্বো বোয়ানা, পোলে পোলে, কিলিমানজারো... হাকুনা মাতাতা। (শেষ)

আরও পড়ুন