কনসার্ট ট্যুরিজম যেভাবে একটি দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে

অফিস থেকে মিলেছে ১০ দিনের ছুটি। এই কদিনেই দেশের বাইরে কোনো একটি শহর ঘুরে আসা যায়। কিন্তু কোথায় যাবেন? কী দেখবেন? পাহাড়, সমুদ্র, ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা বিখ্যাত কোনো খাবার—ভ্রমণের গন্তব্য ঠিক করার সময় এমন অনেক কিছুই মাথায় আসে। তবে এর সঙ্গে যোগ হতে পারে আরেকটি মজার উপলক্ষ—প্রিয় শিল্পীর কনসার্ট।

পছন্দের শিল্পীর কনসার্ট এখন অনেকের ভ্রমণের গন্তব্যছবি: ছবি: ইনস্টাগ্রাম

পছন্দের শিল্পীর কনসার্ট এখন অনেকের ভ্রমণের গন্তব্য। কনসার্ট দেখতে অন্য শহর বা দেশে পাড়ি দিয়ে সেখানকার পাহাড়, সমুদ্র, দর্শনীয় স্থান দেখা যায়, জেনে আসা যায় ইতিহাস-ঐতিহ্য। ভ্রমণের এই নতুন ধরনকেই বলা হচ্ছে ‘কনসার্ট ট্যুরিজম’।

সহজ করে বললে, প্রিয় শিল্পীর কনসার্ট কোথায় ও কবে হবে, সেই অনুযায়ী সেখানে গিয়ে কনসার্ট উপভোগ করার পাশাপাশি পুরো জায়গাটাও ঘুরে দেখা, এটাই কনসার্ট ট্যুরিজম।

এক টিকিটে দুই আনন্দ—কনসার্ট দেখা আর স্থানটি ঘোরা।
ছবি: পেক্সেলস

আগে হয়তো মানুষ কোনো শহরে ঘুরতে যেত, আর সেখানে কাকতালীয়ভাবে কোনো কনসার্ট হলে সেটিও দেখে আসত। এখন অনেকের পরিকল্পনাটা উল্টো। আগে কনসার্টের টিকিট, তারপর প্লেনের টিকিট! অর্থাৎ এক টিকিটে দুই আনন্দ—কনসার্ট দেখা আর স্থানটি ঘোরা।

আরও পড়ুন

ভক্ত যখন পর্যটক

২০২৬ সালে দীর্ঘ বিরতির পর পূর্ণাঙ্গ দল হিসেবে ফিরেছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএস। বিশ্বভ্রমণের অংশ হিসেবে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, জাকার্তাসহ এশিয়ার বিভিন্ন শহরে কনসার্ট করবে দলটি।

আর বিটিএসের ভক্তরা, যাঁরা নিজেদের ‘আর্মি’ নামে পরিচয় দেন, তাঁরা ইতিমধ্যে কনসার্ট ঘিরে ভ্রমণের পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন। ডিসেম্বরের ৩, ৫ ও ৬ তারিখ ব্যাংককে বিটিএসের কনসার্ট। এই কনসার্ট ঘিরে শহরের অনেক হোটেলেই এখন রুম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানেই কনসার্ট ট্যুরিজমের মজাটা। এখানে একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে ভক্ত ও পর্যটক।

সাধারণ পর্যটক কোনো শহরে গিয়ে হয়তো বিখ্যাত স্থাপনা, জাদুঘর বা খাবারের জায়গা খুঁজবেন। কিন্তু কনসার্ট পর্যটকের তালিকায় যোগ হয় আরও কিছু। কনসার্টের পাশাপাশি ঘুরে দেখা হয় প্রিয় শিল্পীর পারফরম্যান্সের ভেন্যু, পপ-আপ স্টোর, অ্যালবাম বা গানের সঙ্গে সম্পর্কিত জায়গা, ভক্তদের মিলনমেলা কিংবা বিশেষ কোনো প্রদর্শনী।

টেইলর সুইফটের দ্য ইরাস ট্যুর
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

অনেকে আবার একটি সফরেই একাধিক কনসার্ট দেখে ফেলেন। তখন এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে বেড়ানোও হয়ে ওঠে ভ্রমণের আলাদা আনন্দ। আজ লন্ডন, কাল প্যারিস, পরশু আমস্টারডাম—গন্তব্য বদলায়, কিন্তু ভ্রমণের মূল কারণ একই—প্রিয় শিল্পীর গান।

এর বড় উদাহরণ টেইলর সুইফটের দ্য ইরাস ট্যুর। ২০২৩ সালে শুরু হয়ে ২০২৪ সালে শেষ হওয়া এই গানের সফরে ৫ মহাদেশে ১৪৯টি কনসার্ট হয়। টেইলর সুইফটের ভক্তরা, যাঁরা নিজেদের ‘সুইফটিজ’ বলেন, প্রিয় শিল্পীর কনসার্ট দেখতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটেছেন। একই সফরে তাঁরা যেমন ছিলেন ভক্ত, তেমনি নতুন নতুন শহর ঘুরে দেখা পর্যটকও।

অর্থাৎ গন্তব্যের কারণ যখন গান, তখন ভ্রমণের গল্পটাও হয়ে যায় একটু আলাদা।

আরও পড়ুন

বদলে দেওয়া শহরের চেহারা

কনসার্টগুলো শুধু ভক্তদের প্রিয় শিল্পীকে দেখার, তাঁর গান শোনার ইচ্ছাকেই পূর্ণ করে না, একই সঙ্গে বদলে দেয় একটি শহরের অর্থনৈতিক চেহারা। কনসার্টগুলো শহরগুলোর অর্থ উপার্জনের জন্য বেশ ভালো একটি সময়।

টিকিট বিক্রির টাকা থেকে শুরু করে ভক্ত ও পর্যটকদের হোটেলে থাকা, দর্শনীয় স্থান দেখা, বিভিন্ন স্থানীয় খাবার খাওয়া—সব মিলিয়ে বিশাল পরিমাণ অর্থ আয় করা সম্ভব।

টিকিট বিক্রির টাকা থেকে শুরু করে ভক্ত ও পর্যটকদের হোটেলে থাকা, দর্শনীয় স্থান দেখা, বিভিন্ন স্থানীয় খাবার খাওয়া—সব মিলিয়ে বিশাল পরিমাণ অর্থ আয় করে আয়োজক দেশগুলো
ছবি: পেক্সেলস

টেইলর সুইফটের দ্য ইরাস ট্যুর কনসার্টের টিকিট বিক্রি থেকেই আয় হয়েছে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি। কোয়েশ্চেন প্রোর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সাল মিলিয়ে উত্তর আমেরিকায় ভোক্তা ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা দর্শকেরা ঘোরাফেরা, খাওয়াদাওয়া, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে খরচ করেছে এবং এর ফলে শহরগুলো ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

অর্থাৎ টেইলর সুইফট যখন কোনো শহরে গেছেন, তখন শুধু কনসার্ট ভেন্যু কানায় কানায় পূর্ণ হয়নি, ভরেছে হোটেলের রুম, রেস্তোরাঁর টেবিল, প্লেন, যানবাহন ও শহরের দোকানও। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্বস ম্যাগাজিন জানিয়েছিল, টেইলর সুইফটের দ্য ইরাস ট্যুরের শেষ তিনটি শোকে কেন্দ্র করে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের অর্থনীতিতে প্রায় ১৫৭ মিলিয়ন ডলারের প্রভাব পড়েছে।

আরও পড়ুন

কনসার্টের পরের গল্প

কনসার্ট শেষ, এবার শহর দেখার পালা। দর্শকেরা বেরিয়ে পড়েন শহরের অলিগলি, রাজপথ, পাহাড়, সমুদ্র কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে। এসব মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করে ছড়িয়ে দেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফলে কনসার্টের ছবি বা ভিডিওর পাশাপাশি জানা যায় সেই শহরের নানা জায়গা ও গল্পও।

বিশ্বভ্রমণের অংশ হিসেবে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর, জাকার্তাসহ এশিয়ার বিভিন্ন শহরে কনসার্ট করবে ব্যান্ড বিটিএস
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

এভাবে একজন ভক্তের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরেকজনের জন্য হয়ে ওঠে নতুন গন্তব্যের অনুপ্রেরণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে অনেকেই হয়তো সেই শহরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কেউ আবার নতুন কোনো ব্যান্ড বা শিল্পীর গান শুনতে শুরু করেন, হয়ে যান তাঁর ভক্ত। সেখান থেকেই তৈরি হয় পরবর্তী কনসার্ট ঘিরে নতুন ভ্রমণের পরিকল্পনা।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েট প্রেস, ফোর্বস, ক্লাব এলায়েন্স, কোয়েশ্চেন প্রো

আরও পড়ুন